প্রশ্ন: তারাবি ও তাহাজ্জুদের মধ্যে পার্থক্য কি? রমাদান মাসে একই রাতে তারাবি ও তাহাজ্জুদ আদায়ের বিধান কি?
▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর:
.
.
রাত্রির বিশেষ নফল সালাত তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ নামে পরিচিত। আর এগুলো কিয়ামুল লাইলের অন্তর্ভুক্ত। রমাদানে এশার পর প্রথম রাতে পড়লে তাকে ‘তারাবীহ’ এবং রমাদান ও রমাদানের বাহিরে অন্যান্য সময়ে শেষরাতে পড়লে তাকে ‘তাহাজ্জুদ’ বলা হয়। রাত্রির সালাত বা সালাতুল লায়েল’ নফল হলেও তা খুবই ফযীলতপূর্ণ। যেমন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,أَفْضَلُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْفَرِيْضَةِ صَلَاةُ اللَّيْلِ “ফরয সালাতের পরে সর্বোত্তম সালাত হল রাত্রির (নফল) সালাত”।(সহীহ মুসলিম, হা/১১৬৩; মিশকাত, হা/২০৩৯)। তিনি আরও বলেন, “আমাদের পালনকর্তা মহান আল্লাহ প্রতি রাতের তৃতীয় প্রহরে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন, কে আছ আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছ আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব? কে আছ আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব? এভাবে তিনি ফজর স্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত আহ্বান করেন”। (সহীহ মুসলিম, হা/১৭৭৩; মিশকাত, হা/১২২৩)।সুতরাং তারাবি ও তাহাজ্জুদ এ দুইটি পৃথক কোন সালাত নয়, যেমনটি অনেক সাধারণ মানুষ ধারণা করে থাকেন। বরং রমজান মাসে যে ‘কিয়ামুল লাইল’ আদায় করা হয় সেটাকে‘সালাতুত তারাবী’বা বিরতিপূর্ণ নামায বলা হয়।কারণ সলফে সালেহীন (সাহাবী, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ীগণের প্রজন্ম) যখন এই সালাত আদায় করতেন তখন তাঁরা প্রতি দুই রাকাত বা চার রাকাত অন্তর বিরতি নিতেন। কেননা তাঁরা মহান মৌসুমকে কাজে লাগাতে ও রাসূলের হাদিস“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় রমজান মাসে কিয়ামুল লাইল পালন করে তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়”?সহীহ বুখারী হা/৩৬) এ বর্ণিত সওয়াব পাওয়ার আশায় নামাযকে দীর্ঘ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়তেন।আল্লাহ তা‘আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।(বিস্তারিত জানতে দেখুন ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-২৭৩০)
.
আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী হানাফী (রাহিমাহুল্লাহ) অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বলেন, تِلْكَ صَلَاةٌ وَاحِدَةٌ إِذَا تَقَدَّمَتْ سُمِّيَتْ بِاِسْمِ التَّرَاوِيْحِ إِذَا تَأَخَّرَتْ سُمِّيَتْ بِاِسْمِ التَّهَجُّدِ “এটা (তারবি ও তাহাজ্জুদ) একই সালাত; যখন রাতের প্রথমাংশে পড়া হবে, তখন তার নাম হবে তারাবীহ। আর যখন শেষাংশে পড়া হবে, তখন তার নাম হবে তাহাজ্জুদ’ (ফায়যুল বারী, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪২০)
.
আল-মাওসু‘আহ আল-ফিকহিয়্যাহ-এ বলা হয়েছে:” لا خلاف بين الفقهاء في سنية قيام ليالي رمضان ؛ لقوله صلى الله عليه وسلم : ( من قام رمضان إيمانا واحتسابا غفر له ما تقدم من ذنبه ) وقال الفقهاء : إن التراويح هي قيام رمضان ؛ ولذلك فالأفضل استيعاب أكثر الليل بها ; لأنها قيام الليل “রমজানের রাতগুলোতে কিয়াম করা সুন্নত।এ বিষয়ে ফকীহদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। কারণ রাসূল (ﷺ) বলেছেন:যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় রমজানে কিয়াম করবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। ফকীহগণ বলেছেন: তারাবীহই হলো রমজানের কিয়াম। তাই উত্তম হলো:এর মাধ্যমে রাতের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করা, কারণ এটি মূলত কিয়ামুল লাইল (রাতের নামাজ)”।(আল-মাওসু‘আহ আল-ফিকহিয়্যাহ; খণ্ড: ৩৪; পৃষ্ঠা: ১২৩)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন: তারাবিহ এবং কিয়ামের (তাহাজ্জুদ) মধ্যে কি কোনো পার্থক্য আছে? রমজানের শেষ দশকে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা (কিয়াম), দীর্ঘ রুকু এবং দীর্ঘ সেজদা করার কি বিশেষ কোনো দলিল আছে?
উত্তরে শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
الفرق بين التراويح والقيام والإطالة في العشر الأواخر
س: هل هناك فرق بين التراويح والقيام؟ وهل من دليلٍ على تخصيص العشر الأواخر بطول القيام والركوع والسجود؟
ج: الصلاة في رمضان كلها تُسمَّى قيامًا كما قال ﷺ: مَن قام رمضان إيمانًا واحتسابًا غُفر له ما تقدَّم من ذنبه[1]، فإذا قام ما تيسر منه مع الإمام سُمِّي قيامًا، ولكن في العشر الأخيرة يُستحب الإطالة؛ لأنه يُشرع إحياؤها بالصلاة والقراءة والدعاء؛ لأن الرسول عليه الصلاة والسلام كان يُحيي الليل كله في العشر الأخيرة، ولهذا شُرعت الإطالة فيها كما أطال النبي ﷺ فإنه قرأ في بعض الليالي بالبقرة والنساء وآل عمران في ركعةٍ واحدةٍ.فالمقصود أنه عليه الصلاة والسلام كان يُطيل في العشر الأخيرة ويُحييها؛ فلهذا شُرع للناس إحياؤها والإطالة فيها حتى يتأسّوا به ﷺ بخلاف العشرين الأول، فإنه ما كان النبي عليه الصلاة والسلام يُحييها، كان يقوم وينام عليه الصلاة والسلام كما جاء ذلك في الأحاديث، أما في العشر الأخيرة فكان عليه الصلاة والسلام يُحيي الليل كله، ويُوقظ أهله، ويشدّ المئزر عليه الصلاة والسلام ولأن فيها ليلةً مباركةً؛ ليلة القدر
“রমাদান মাসের নফল নামাজসমূহকে সামগ্রিকভাবে ‘কিয়াম’ বলা হয়। কারণ মুহাম্মদ (ﷺ) বলেছেন: “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় রমাদানে কিয়াম করবে, তার পূর্ববর্তী সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।”(সহীহ বুখারী হা/৩৭) অতএব,কেউ যদি ইমামের সঙ্গে যতটুকু সম্ভব সালাতে দাঁড়িয়ে থাকে, তাও তার জন্য কিয়াম হিসেবেই গণ্য হবে। তবে রমাদানের শেষ দশকে দীর্ঘ কিয়াম করা মুস্তাহাব। কেননা এই সময়কে সালাত, তিলাওয়াত ও দোয়ার মাধ্যমে জীবন্ত রাখা শরিয়তসম্মত আমল। রাসূল ﷺ নিজেও শেষ দশকে পুরো রাত ইবাদতে অতিবাহিত করতেন। এ কারণেই এ সময়ে দীর্ঘ কিয়ামের প্রতি বিশেষ উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।নবী (ﷺ) দীর্ঘ তিলাওয়াত করতেন এমনকি কোনো কোনো রাতে এক রাকাআতেই সূরা আল-বাকারা, আন-নিসা ও আলে-ইমরান তিলাওয়াত করেছেন। মূল উদ্দেশ্য হলো, তিনি শেষ দশকে দীর্ঘ কিয়াম ও রাত জাগরণের মাধ্যমে ইবাদতে অধিক মনোযোগ দিতেন; তাই উম্মতের জন্যও এই সময় ইবাদতে জাগ্রত থাকা ও কিয়াম দীর্ঘ করা সুন্নাহ হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে, যাতে তারা তাঁর অনুসরণ করতে পারে।রমজানের প্রথম বিশ রাতের অবস্থা ভিন্ন ছিল। তখন তিনি পুরো রাত জেগে থাকতেন না; বরং কিছু সময় নামাজ আদায় করতেন এবং কিছু সময় (ঘুমিয়ে) বিশ্রাম নিতেন যেমন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে;কিন্তু শেষ দশকে তিনি রাতভর ইবাদত করতেন, নিজের পরিবারকে জাগিয়ে দিতেন এবং কোমর শক্ত করে বেঁধে নিতেন (অর্থাৎ ইবাদতে সর্বোচ্চ চেষ্টা ও প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন)। আর এর বিশেষ কারণ হলো—এই দশকের মধ্যেই রয়েছে এক মহিমান্বিত ও বরকতময় রাত, লাইলাতুল কদর।”।(ইমাম বিন বায; মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১১; পৃষ্ঠা: ৩৩৮)
.
.
একই রাতে বিশেষত রমাদানের শেষ দশকে রাতের প্রথম অংশে তারাবি এবং শেষ তৃতীয়াংশে তাহাজ্জুদ আদায় করার বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাঁদের একদল এটিকে জায়েজ মনে করেন, আবার অপর একটি অংশ একে বিদআত বলে অভিহিত করেছেন।
.
যারা এমনটি করা বিদআত বলেছেন তাদের যুক্তি হল:
‘তারাবীহ’ ও ‘তাহাজ্জুদ’ মূলত একই সালাত। আর এ জন্যই মুহাদ্দিছগণ একই হাদীস ‘তাহাজ্জুদ’ অধ্যায়েও বর্ণনা করেছেন, ‘তারাবীহ’ অধ্যায়েও বর্ণনা করেছেন (সহীহ বুখারী, হা/২০১৩, ১/২৬৯ পৃ.হা/১১৪৭, ১/১৫৪, হা/৩৫৬৯, ১/৫০৪)।তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একই রাত্রে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ পড়েননি। প্রশ্নকারী আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-কে রমাদানের রাত্রির সালাত কেমন ছিল সে বিষয়েই জিজ্ঞেস করেছিলেন। আর তারই উত্তরে আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) ১১ রাক‘আতের কথা বলেন। এছাড়া উক্ত উদ্ভট দাবীকে চূর্ণ করেছেন প্রখ্যাত হানাফী বিদ্বান আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী (রাহিমাহুল্লাহ)। তিনি মা আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর হাদীছটি উল্লেখ করে বলেন, فِيْهِ تَصْرِيْحٌ أَنَّهُ حَالُ رَمَضَانَ فَإنَّ السَّائِلَ سَأَلَ عَنْ حَالِ رَمَضَانَ وَغَيْرِه ‘এতে পরিষ্কার ব্যাখ্যা রয়েছে যে, এটা রমাদানেরই অবস্থা। কারণ প্রশ্নকারী রামাযানসহ অন্যান্য অবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন’ (আল-আরফুশ শাযী শরহে তিরমিযী, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৬৬) অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তৃতীয় দিন ২৭-এর রাত্রে সাহারীর সময় পর্যন্ত তারাবীহর ছালাত দীর্ঘ করেছিলেন, যাতে সাহাবায়ে কেরাম সাহারী খাওয়া ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা করছিলেন। যেমন হাদীছে এসেছে, فَقَامَ بِنَا حَتَّى خَشِيْنَا أَنْ تَفُوْتَنَا الْفَلَاحُ ‘আমাদের নিয়ে তিনি এত দীর্ঘ সময় ধরে ছালাত পড়লেন, যাতে আমরা সাহারী খাওয়া ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা করছিলাম’ (আবু দাঊদ, হা/১৩৭৫, ১/১৯৫; তিরমিযী, হা/৮০৬, ১/১৬৬; মিশকাত, হা/১২৯৮)। তাহলে এই রাতে তাহাজ্জুদ কখন পড়লেন?
.
অনুরূপ সাহাবীদের যুগেও তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ একই সালাত বলে গণ্য হত। কারণ ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) যে হাদীছে ১১ রাক‘আত তারাবীহ পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন, ঐ হাদীসের শেষাংশে বলা হয়েছে, ‘ক্বিরাআত লম্বা হওয়ার কারণে (পরিশ্রান্ত হয়ে) আমরা লাঠির উপর ভর দিতাম এবং ফজরের সালাতের সময় হওয়ার উপক্রম হলে সালাত শেষ করে চলে আসতাম”।(সহীহ ইবনু খুযায়মাহ, ৪/১৮৬ পৃ.; মুওয়াত্ত্বা মালেক, ১/১১৫)।সুতরাং স্পষ্ট হল যে,রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবায়ে কেরাম একই রাত্রে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ পড়তেন না। অন্য আরেকটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, মা আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন,كَانَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّىْ مَا بَيْنَ أَنْ يَفْرُغَ مِنْ صَلَاةِ الْعِشَاءِ إِلَى الْفَجْرِ إِحْدَى عَشَرَةَ رَكْعَةً”নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এশার সালাত শেষ করার পর হতে ফজর পর্যন্ত মাত্র ১১ রাক‘আত ছালাত আদায় করতেন’ (সহীহ মুসলিম, হা/৭৩৬; ইবনু মাজাহ, হা/১৩৫৮)। উক্ত হাদীস থেকে আরো স্পষ্ট হল যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এশার সালাতের পর থেকে ফজর পর্যন্ত ১১ রাক‘আতের বেশী সালাত কখনো পড়তেন না।অনুরূপ ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর তারাবীহর জামা‘আত পুনরায় চালু করা সংক্রান্ত ছহীহ বুখারীতে যে হাদীছ বর্ণিত হয়েছে, তাতে একই সালাতের কথা প্রমাণিত হয়েছে। যেমন ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, وَالَّتِىْ يَنَامُوْنَ عَنْهَا أَفْضَلُ مِنْ الَّتِىْ يَقُوْمُوْنَ يُرِيْدُ آخِرَ اللَّيْلِ وَكَانَ النَّاسُ يَقُوْمُوْنَ أَوَّلَهُ ‘তবে তারা যা পড়ছে তার চেয়ে উত্তম সেটাই, যার জন্য তারা ঘুমাত অর্থাৎ শেষ রাত্রের ছালাত। তবে লোকেরা প্রথমাংশেই পড়ত’ (ছহীহ বুখারী, হা/২০১০; মিশকাত, হা/১৩০১, পৃ. ১১৫; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/১২২৭, ৩/১৫১-৫২)।
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: প্রশ্নকারী: হে আমাদপর শাইখ, বর্তমানে যা ঘটছে রমাদানেরশেষ দশকে তারা কিয়ামের (তাহাজ্জুদ/তারাবিহ) সালাতকে দুই ভাগে ভাগ করে নিচ্ছে; কিছু রাতের প্রথম অংশে এবং কিছু শেষ অংশে। আর এটা যেন একটি স্থায়ী নিয়মে পরিণত হয়েছে? জবাবে ইমাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
: بدعة, السائل : طيب كيف يكون, يعني لو أردنا أن نقيم السنة ونخفف على الناس, فكيف نفعل ؟
الشيخ : تؤخرون كما قال عمر: ” والتي يؤخرونها أفضل ” يعني هو أمر أبيّ بن كعب أن يقيم صلاة القيام بالناس بعد صلاة العشاء ففعل ولما خرج يتحسس قال: ” نعمة البدعة هذه والتي ينامون عنها أفضل ” .السائل : يعني يبقى الحال على ما هو قبل العشر ؟ الشيخ : أي نعم
“(এটি একটি) বিদআত। প্রশ্নকারী: তাহলে এর সঠিক পদ্ধতি কী হবে? অর্থাৎ, যদি আমরা সুন্নাহ কায়েম করতে চাই এবং মানুষের জন্য সহজও করতে চাই, তবে আমাদের কী করা উচিত?
শাইখ: তোমরা এটি বিলম্বিত করবে (রাতের শেষ অংশে পড়বে), যেমনটি ওমর (রা.) বলেছিলেন: “যেটি তারা বিলম্বিত করে আদায় করে, সেটিই উত্তম।” অর্থাৎ, তিনি উবাই ইবনে কাব (রা.)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন তিনি ইশার পর লোকদের নিয়ে কিয়ামুল লাইল আদায় করেন। তিনি তা-ই করলেন। এরপর ওমর (রা.) (বাইরে) বের হয়ে পরিস্থিতি দেখলেন এবং বললেন: “এটি কতই না উত্তম বিদআত! আর রাতের যে অংশে তারা ঘুমিয়ে থাকে (অর্থাৎ শেষ রাত), সেই সময়ের সালাতেই অধিক উত্তম।” প্রশ্নকারী: তার মানে কি শেষ দশকের আগের দিনগুলোতে যেভাবে চলত, তেমনই থাকবে?
শাইখ: হ্যাঁ, তাই থাকবে।”(ইমাম আলবানী; সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর, অডিয়ো ক্লিপ নং-৭১৯)
.
অপরদিকে যেসব আলেম একই রাতে বিশেষত রমাদানের শেষ দশকে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ উভয় সালাত আদায়কে জায়েজ বলেছেন, তাঁদের অভিমত হলো: রমাদানের রাতের নফল ইবাদত মূলত কিয়ামুল লাইলের অন্তর্ভুক্ত; আর কিয়ামুল লাইলকে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ—এই দুই ধাপে আদায় করা শরীয়তসম্মত। কারণ, তারাবীহর জন্য শরিয়তে নির্দিষ্ট কোনো রাকাতসংখ্যা নির্ধারিত হয়নি এবং ইশার পর থেকে ফজর পর্যন্ত পুরো রাতই ইবাদতের জন্য উন্মুক্ত সময়। অতএব, যেহেতু সমগ্র রাতই কিয়ামের সময়,তাই ইবাদতের মাঝে বিরতি দেওয়া যদি স্বতন্ত্র কোনো নতুন ইবাদত হিসেবে উদ্দেশ্য না হয়ে বরং মুসল্লিদের জন্য সহজতা সৃষ্টি, অধিক সওয়াব অর্জনের সুযোগ করে দেওয়া এবং রাতের শেষ তৃতীয়াংশের বিশেষ ফজিলত লাভের উদ্দেশ্যে হয়—যেমনটি বিশেষত রমজানের শেষ দশকে অনেক ইমাম করে থাকেন তাহলে তা শরীয়তসম্মত এবং নিষিদ্ধ নয়। যেমন: এশার পর জামাতের সাথে তারাবি আদায় করা, তারপর রাতের শেষ ভাগে পুনরায় মসজিদে ফিরে এসে কিয়াম করা। এ পদ্ধতি নিষিদ্ধ করার মতো কোনো সুস্পষ্ট দলিল নেই; বরং শেষ দশকে সামর্থ্য অনুযায়ী ইবাদতে অধিক প্রচেষ্টা করাই কাম্য।আর যদি কেউ নিজের রাতকে নামাজ, বিশ্রাম, ঘুম ও কুরআন তিলাওয়াতের মধ্যে ভাগ করে নেয়, তবে সে অবশ্যই উত্তম কাজই করলো। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায়ও দেখা যায়, মুসলিমরা সহজতা ও সহনীয়তার জন্য অনেক সময় ইবাদতকে এভাবেই ভাগ করে নিয়েছেন।পক্ষান্তরে, সমসাময়িক কিছু আলেম এই বিভাজন পদ্ধতিকে নিষিদ্ধ বলেছেন। তাঁদের প্রধান যুক্তি হলো—বিতরসহ এগারো রাকআতের বেশি আদায় করা বিদআত। তবে এ মতটি দুর্বল; কারণ এটি নবী ﷺ-এর সাধারণ (মুতলাক) নির্দেশনার পরিপন্থী এবং সাহাবা ও পরবর্তী যুগের আমলের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, সাহাবা ও তাবেঈনদের মধ্যে কেউ বিশ রাকআত, কেউ ঊনচল্লিশ রাকআত পর্যন্তও আদায় করেছেন। তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়: যারা রাতের প্রথমাংশে তারাবি আদায় করে পরে তাহাজ্জুদ পড়তে চান, তাদের জন্য উত্তম হলো প্রথম অংশে বিতির না পড়ে বরং রাতের শেষ ভাগে তাহাজ্জুদের পর বিতির আদায় করা যাতে সেটিই রাতের সর্বশেষ সালাত হয়।
আর এরই মতো: যদি কোনো ব্যক্তি ইমাম হিসেবে দুই মসজিদে বা দুই জামাতে সালাত পড়ান রাতের শুরুতে একবার এবং রাতের শেষে একবার; অথবা যদি এমন হয় যে, এক জামাতে তিনি মুক্তাদি হিসেবে সালাত পড়েন এবং অন্যটিতে ইমাম হিসেবে সালাত পড়ান—এর প্রতিটিই ইনশাআল্লাহ জায়েজ এবং এতে কোনো অসুবিধা নেই। দলিল হচ্ছে: ক্বায়িস ইবনু ত্বালক্ব (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, একদা রমাদান মাসে ত্বালক্ব ইবনু ‘আলী (রাঃ) আমাদের সাথে দেখা করতে এসে এখানে সন্ধ্যা অতিবাহিত করেন এবং এখানেই ইফতার করেন। অতঃপর রাতে আমাদেরকে নিয়ে তারাবীহ ও বিতর সালাত আদায় করেন। অতঃপর তিনি নিজেদের মাসজিদে গিয়ে তার সাথীদেরকে নিয়েও সালাতআদায় করেন। অতঃপর বিতর সালাতের জন্য এক ব্যক্তিকে সম্মুখে এগিয়ে দিয়ে বলেন, তোমার সাথীদেরকে বিতর পড়াও। কেননা আমি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনছি : একই রাতে দুইবার বিতর হয় না”।(সুনানে আবু দাউদ হা/১৪৩৯;তিরমিযী হা/৪৭০;নাসাঈ হা/১৬৭৯;মুসনাদে আহমদ হা/১৬২৯৬;এই হাদিসটিকে ইবনুিল মুলাককিন তাঁর “আল-বদরুল মুনীর” (৪/৩১৭) গ্রন্থে, একইভাবে হাফেজ ইবনে হাজার ফাতহুল বারী” (২/৪৮১) গ্রন্থে ‘হাসান’ বলেছেন। মুসনাদে আহমাদ-এর মুহাক্কিকগণও একে ‘হাসান’ বলেছেন এবং ইমাম আলবানী রাহিমাহুল্লাহ সুনানে আবু দাউদ”-এ হাদিসটি ‘সহীহ’ হিসেবে গণ্য করেছেন।
.
হাদিসটির ব্যাখায় আস-সিন্দী (রাহিমাহুলাহ) বলেন: فصلى بِأَصْحَابِهِ ) الظَّاهِر أَنه صلى بهم الْفَرْض وَالنَّفْل جَمِيعًا ، فَيكون اقْتِدَاء الْقَوْم بِهِ فِي الْفَرْض ، من اقْتِدَاء المفترض بالمتنفل) (অতঃপর তিনি তাঁর সাহাবীদের নিয়ে সালাত পড়লেন—এর বাহ্যিক অর্থ হলো তিনি তাঁদের নিয়ে ফরজ ও নফল উভয় সালাতই আদায় করেছেন। এমতাবস্থায় (সাহাবীগণের তথা) কওমের এই ইক্তিদা ছিল ‘নফল আদায়কারীর পেছনে ফরজ আদায়কারীর ইক্তিদা’ করার অন্তর্ভুক্ত।”[হাশিয়াতুস সিন্দী আলা সুনানিন নাসাঈ; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ২৩০)
ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহকে.)-কে সেই ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, যে রমাদান মাসে সালাত (তারাবীহ) আদায় করে এবং তাদের নিয়ে বিতর পড়ে, অথচ সে অন্য একদল মানুষের ইমামতি করারও ইচ্ছা রাখে? তিনি (রাহি.) উত্তরে বলেন:يشتغل بينهما بشيء ، بأكل أو شرب أو يجلس “সে যেন এই দুইয়ের মাঝে কোনো কিছুতে নিয়োজিত হয়; যেমন— পানাহার করা অথবা (কিছুক্ষণ) বসে থাকা।”
.
ইবনু কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وذلك لأنه يكره أن يوصل بوتره صلاة ، فيشتغل بينهم بشيء ، ليكون فصلا بين وتره وبين الصلاة الثانية ، وهذا إذا كان يصلي بهم في موضعه ، أما في موضع آخر فذهابه فصل ، ولا يعيد الوتر ثانية ( لا وتران في ليلة ) “এর কারণ হলো—তিনি (রাসূলুল্লাহ ﷺ) বিতর সালাতের সাথে (অন্য কোনো) সালাত সরাসরি জুড়ে দেওয়া অপছন্দ করতেন। তাই তিনি এ দুটির মাঝে কোনো কাজে মশগুল হতেন যেন বিতর এবং পরবর্তী সালাতের মধ্যে একটি ‘বিচ্ছেদ’ বা পার্থক্য তৈরি হয়। এটি তখনকার নিয়ম যখন কেউ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে (উভয়) সালাত আদায় করে। কিন্তু যদি অন্য স্থানে গিয়ে সালাত পড়ে, তবে তার সেই হেঁটে যাওয়াই একটি ‘বিচ্ছেদ’ হিসেবে গণ্য হবে। আর সে দ্বিতীয়বার বিতর পড়বে না; কেননা (এক রাতে দুইবার বিতর নেই)”।(ইবনু কাইয়ুৃম; বাদায়ে‘উল ফাওয়ায়েদ খন্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ১১১)
.
হাফিয ইবনু রজব আল-হাম্বালী আল-বাগদাদী রাহিমাহুল্লাহ [জন্ম: ৭৩৬ হি.মৃত:৭৯৫ হি:] বলেছেন,وروى المروذي، عن أحمد – في الرجل يصلي شهر رمضان، يقوم فيوتر بهم، وهو يريد يصلي بقوم آخرين -: يشتغل بينهما بشيء، يأكل أو يشرب أو يجلس.قال أبو حفص البرمكي: وذلك لأنه يكره أن يوصل بوتره صلاة، ويشتغل بينهما بشيء؛ ليكون فصلا بين وتره، وبين الصَّلاة الثانية. وهذا إذا كانَ يصلي بهم في موضعه، فإما إن كانَ موضع آخر، فذهابه فصل، ولا يعيد الوتر ثانية؛ لأنه لا وتران في ليلة. “আল-মারওয়াযী ইমাম আহমাদ (রাহি.) থেকে এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন—যে রমাদান মাসে লোকদের নিয়ে সালাত (তারাবি) পড়ে এবং তাদের নিয়ে বিতরও পড়ে ফেলে, অথচ সে এরপর অন্য একটি দলের সাথে সালাত আদায়ের ইচ্ছা রাখে—ইমাম আহমাদ বলেন: সে দুই সালাতের মাঝে কোনো কাজে লিপ্ত হবে; যেমন—কিছু খাবে বা পান করবে অথবা (কিছুক্ষণ) বসে থাকবে। আবু হাফস আল-বারমাকী বলেন: এটি এ কারণে যে, বিতরের সাথে সাথে (পরবর্তী) সালাত মিলিয়ে ফেলা মাকরূহ বা অপছন্দনীয়। তাই মাঝে কোনো কাজে লিপ্ত হবে যেন তার বিতর এবং দ্বিতীয় সালাতের মাঝে একটি ব্যবধান তৈরি হয়। এটি তখন প্রযোজ্য যখন সে একই স্থানে তাদের নিয়ে সালাত পড়ে। তবে যদি স্থান ভিন্ন হয়, তবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়াই ‘বিচ্ছেদ’ বা ব্যবধান হিসেবে গণ্য হবে। আর সে দ্বিতীয়বার বিতর পড়বে না; কারণ এক রাতে দুই বিতর নেই। (উদ্ধৃতি সমাপ্ত)।
.
তবে ইমাম আহমাদ থেকে এর বিপরীত বক্তব্যও বর্ণিত আছে: যেমন-সালিহ-এর বর্ণনায় ইমাম আহমাদ সেই ব্যক্তি সম্পর্কে—যে ইমামের সাথে বিতর পড়ে ঘরে ফিরে গেছে—বলেছেন: ‘আমার কাছে পছন্দনীয় হলো সে যেন (পুনরায় সালাত শুরুর আগে) একটু শুয়ে নেয় অথবা দীর্ঘ সময় কথাবার্তা বলে।’ রমাদান মাসে ‘তাকীব’ সম্পর্কে ইমাম আহমাদ থেকে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। ‘তাকীব’ হলো: লোকজন মসজিদে জামাতের সাথে সালাত (তারাবীহ ও বিতর) পড়ার পর বেরিয়ে যাবে, এরপর আবার মসজিদে ফিরে এসে রাতের শেষাংশে জামাতের সাথে সালাত আদায় করবে। আবু বকর আব্দুল আজিজ ইবনে জাফর এবং আমাদের (হাম্বলি মাযহাবের) অন্যান্য ফকিহগণ এভাবেই এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। মারওয়াযী ও অন্যান্যরা ইমাম আহমাদ থেকে বর্ণনা করেছেন যে: এতে কোনো অসুবিধা নেই। আনাস (রা.) থেকেও এ ব্যাপারে বর্ণনা রয়েছে। আবার ইবনুল হাকাম তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম আহমাদ বলেছেন: ‘আমি এটি অপছন্দ করি। আনাস (রা.) থেকেও বর্ণিত আছে যে তিনি এটি অপছন্দ করতেন। আবু মিজলায ও অন্যান্য থেকেও এর অপছন্দনীয়তার কথা বর্ণিত আছে। বরং তারা কিয়ামকে (সালাত) রাতের শেষাংশ পর্যন্ত বিলম্বিত করতেন, যেমনটি উমর (রা.) বলেছিলেন।’আবু বকর আব্দুল আজিজ বলেন: ‘ইবনে হাকামের বর্ণিত মতটি ইমাম আহমাদের পুরনো মত। বর্তমানে আমল হলো সেই বর্ণনার ওপর যা একদল ফকিহ বর্ণনা করেছেন যে, এতে কোনো অসুবিধা নেই।’ (উদ্ধৃতি সমাপ্ত)।
.
প্রখ্যাত তাবি‘ঈ, আমীরুল মু’মিনীন ফিল হাদীস, ইমাম সুফইয়ান আস-সাওরী (রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম:৯৭ হি: মৃত: ১৬১ হি] বলেন:التعقيب محدث. ومن أصحابنا من جزم بكراهيته، إلا أن يكون بعد رقدة، أو يؤخره إلى بعد نصف الليل، وشرطوا: أن يكون قد أوتروا جماعة في قيامهم الأول، وهذا قول ابن حامد والقاضي وأصحابه. ولم يشترط أحمد ذلك. وأكثر الفقهاء على أنه لا يكره بحالٍ…ونقل ابن المنصور، عن إسحاق بن راهويه، أنه إن أتم الإمام التراويح في أول الليل، كره له أن يصلي بهم في آخره جماعة أخرى؛ لما روي عن أنس وسعيد بن جبير من كراهته. وإن لم يتم بهم في أول الليل وآخر تمامها إلى آخر الليل لم يكره.”তাকীব (তারাবীহ শেষে পুনরায় জামাতে নফল পড়া) একটি নব-উদ্ভাবিত বিষয়। আমাদের (হাম্বলী মাজহাবের) একদল ফকীহ একে ‘মাকরূহ’ বলে সুনিশ্চিত মত দিয়েছেন—কিন্তু যদি তা সামান্য ঘুমের পর হয় অথবা রাতের মধ্যভাগের পরে বিলম্বিত করে পড়া হয়,তাহলে ভিন্ন কথা। তারা আরও শর্ত দিয়েছেন যে, মুসল্লিরা যেন তাদের প্রথম দফার কিয়ামেই (তারাবিহতে) জামাতের সাথে বিতর সম্পন্ন করে নেয়। এটি ইবনে হামিদ, কাজী আবু ইয়ালা ও তাঁর অনুসারীদের অভিমত। অবশ্য ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) এই (বিতর পড়ার) শর্তটি দেননি। অন্যদিকে অধিকাংশ ফকীহর মত হলো এটি কোনো অবস্থাতেই মাকরূহ নয়।…ইবনে মানসুর ইমাম ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ থেকে বর্ণনা করেছেন যে: যদি ইমাম রাতের প্রথম ভাগে তারাবিহ (পুরো ৮/২০ রাকাত বা নির্ধারিত অংশ) সম্পন্ন করে ফেলেন, তবে রাতের শেষ ভাগে মুসল্লিদের নিয়ে পুনরায় জামাতে সালাত পড়া মাকরূহ। কারণ আনাস (রা.) ও সাঈদ ইবনুল জুবাইর (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে এর অপছন্দনীয়তা বর্ণিত হয়েছে। তবে যদি তিনি রাতের প্রথম ভাগে সালাত পূর্ণ না করে তার কিছু অংশ রাতের শেষ ভাগ পর্যন্ত বিলম্বিত করেন, তবে তা মাকরূহ হবে না।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন ইবনু রজব; ‘ফাতহুল বারী’, ইবনে রজব; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ১৭৪)। আর এই ‘মাকরূহ’ হওয়াটা সেই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যখন ইমাম রাতের প্রথম ভাগে বিতর পড়ে ফেলেন এবং এরপর আবার জামাতে সালাত শুরু করেন। বর্তমানে কিছু মানুষ এমনটা করে থাকেন। তবে ইবনে রজব যেমনটি বলেছেন—অধিকাংশ ফকিহর মতে এটি মাকরূহ নয়। মূল কথা হলো, এই ‘ফাসল’ বা বিরতি দেওয়া একটি প্রাচীন বিষয় যা নিয়ে সালাফগণ (পূর্বসূরিরা) আলোচনা করেছেন।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] আশ-শারহুল মুমতি‘, আলা জাদিল মুস্তাকনির ব্যাখ্যায় বলেন:
قوله: لا التعقيب في جماعة ، أي: لا يُكره التَّعقيب بعد التَّراويح مع الوِتر، ومعنى التَّعقيب: أن يُصلِّيَ بعدها ، وبعد الوِتر ، في جماعة. وظاهرُ كلامه: ولو في المسجد.
مثال ذلك: صَلّوا التَّراويح والوتر في المسجد، وقالوا: احضروا في آخر الليل لنقيم جماعة، فهذا لا يُكره على ما قاله المؤلِّف.ولكن هذا القول ضعيف، لأنه مستندٌ إلى أثر عن أنس بن مالك رضي الله عنه أنَّه قال: لا بأس به، إنما يرجعون إلى خير يرجونه … أي: لا ترجعوا إلى الصَّلاة إلا لخير ترجونه.لكن هذا الأثر، إنْ صَحَّ عن أنس: فهو مُعَارِض لقوله صلّى الله عليه وسلّم: اجْعَلوا آخِرَ صَلاتِكم بالليل وِتْراً ؛ فإنَّ هؤلاء الجماعة صَلُّوا الوِتر، فلو عادوا للصَّلاة بعدها ، لم يكن آخرُ صلاتهم بالليل وِتراً. ولهذا كان القولُ الرَّاجحُ: أنَّ التَّعقيب المذكور مكروه، وهذا القول إحدى الرِّوايتين عن الإمام أحمد رحمه الله، وأطلق الروايتين في المقنع و الفروع و الفائق وغيرها، أي: أنَّ الروايتين متساويتان عن الإمام أحمد، لا يُرَجَّح إحداهما على الأخرى.لكن لو أنَّ هذا التَّعقيبَ جاء بعد التَّراويح، وقبل الوِتر، لكان القول بعدم الكراهة صحيحاً، وهو عمل النَّاس اليوم في العشر الأواخر من رمضان، يُصلِّي النَّاس التَّراويح في أول الليل، ثم يرجعون في آخر الليل، ويقومون يتهجَّدون”
লেখকের কথা—”জামাতে তাকীব নয়”অর্থাৎ তারাবি ও বিতর আদায়ের পর ‘তাকীব’ করা মাকরূহ (অপছন্দনীয়) নয়। ‘তাকীব’-এর অর্থ হলো: তারাবি ও বিতর শেষ করার পর পুনরায় জামাতের সাথে (নফল) সালাত আদায় করা। তাঁর (মূল লেখকের) বক্তব্যের বাহ্যিক মর্ম হলো: এটি মসজিদে হলেও (মাকরূহ হবে না)।
উদাহরণস্বরূপ: তারা মসজিদে তারাবীহ ও বিতর আদায় করল এবং বলল, ‘আপনারা রাতের শেষাংশে উপস্থিত হবেন, আমরা পুনরায় জামাত কায়েম করব’—লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী এটি মাকরূহ নয়। কিন্তু এই মতটি দুর্বল। কারণ, এটি আনাস ইবনে মালিক (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত একটি আছরের (উক্তির) ওপর ভিত্তি করে বলা হয়েছে, যেখানে তিনি বলেছিলেন: ‘এতে কোনো অসুবিধা নেই, তারা তো কেবল সেই কল্যাণের দিকেই ফিরে আসে যার তারা আশা রাখে…’ অর্থাৎ: তোমরা সালাতে ফিরে এসো না কেবল সেই কল্যাণ লাভের প্রত্যাশা ব্যতীত। তবে আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর এই আছরটি যদি বিশুদ্ধও হয়, তবুও তা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এই বাণীর পরিপন্থী: ‘তোমরা তোমাদের রাতের শেষ সালাতটিকে বিতর করো।’ কারণ, এই জামাতটি তো ইতিপূর্বেই বিতর পড়ে ফেলেছে। এমতাবস্থায় তারা যদি পুনরায় সালাতে ফিরে আসে, তবে তাদের রাতের শেষ সালাতটি আর বিতর থাকল না। এ কারণেই সঠিক মত (কওলু রাজেহ) হলো: উল্লিখিত এই ‘তাকীব’ মাকরূহ। এটি ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত দুটি বর্ণনার একটি। ‘আল-মুগনি’, ‘আল-ফুরু’ এবং ‘আল-ফাইক’ সহ অন্যান্য কিতাবে উভয় বর্ণনাকে (কোনোটি প্রাধান্য না দিয়ে) সমানভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ ইমাম আহমাদ থেকে বর্ণিত উভয় মতই সমপর্যায়ের, একটির ওপর অন্যটিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়নি। তবে, যদি এই ‘তাকীব’ (পুনরায় জামাত) তারাবীহর পরে কিন্তু বিতরের আগে হয়, তবে মাকরূহ না হওয়ার বিষয়টিই সঠিক হবে। আর রমাদানের শেষ দশকে বর্তমানে মানুষের আমলও এটিই—তারা রাতের প্রথম ভাগে তারাবি পড়ে, অতঃপর রাতের শেষ ভাগে ফিরে আসে এবং তাহাজ্জুদ (কিয়ামুল লাইল) আদায় করে (অতঃপর বিতর পড়ে)।”(ইমাম উসামীন আশ-শারহুল মুমতি‘, আলা জাদিল মুস্তাকনি খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৬৭)।
.
শায়খ আব্দুল্লাহ আবাত্বিন রাহিমাহুল্লাহ কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল;প্রশ্ন: রমজানের প্রথম বিশ দিনের তুলনায় শেষ দশকে নামাজের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়াকে কিছু মানুষ যে অস্বীকার বা আপত্তি করে, তার জবাব কী? জবাবে শাইখ বলেন:
مسألة في الجواب عما أنكره بعض الناس على من صلى في العشر الأواخر من رمضان زيادة على المعتاد في العشرين الأول ، وسبب إنكارها لذلك غلبة العادة ، والجهل بالسنة وما عليه الصحابة والتابعون وأئمة الإسلام . فنقول: قد وردت الأحاديث عن النبي صلى الله وعليه وسلم بالترغيب في قيام رمضان ، والحث عليه ، وتأكيد ذلك في عشره الأخير .إذا تبين أنه لا تحديد في عدد التراويح ، وأن وقتها عند جميع العلماء من بعد سنة العشاء إلى طلوع الفجر ، وأن إحياء العشر سنة مؤكدة ، وأن النبي صلى الله وعليه وسلم صلاها ليالي جماعة ، فكيف ينكر على من زاد في صلاة العشر الأواخر عما يفعلها أول الشهر ، فيصلي في العشر أول الليل ، كما يفعل في أول الشهر ، أو قليل ، أو كثير ، من غير أن يوتر ، وذلك لأجل الضعيف لمن يحب الاقتصار على ذلك ، ثم يزيد بعد ذلك ما يسره الله في الجماعة ، ويسمى الجميع قياماً وتراويح .وربما اغتر المنكر لذلك بقول كثير من الفقهاء : يستحب أن لا يزيد الإمام على ختمة ، إلا أن يؤثر المأمومون الزيادة ، وعللوا عدم استحباب الزيادة على ختمة بالمشقة على المأمومين ، لا كون الزيادة غير مشروعة ، ودل كلامهم على أنهم لو آثروا الزيادة على ختمة كان مستحباً ، وذلك مصرح به في قولهم : إلا أن يؤثر المأمومون الزيادة . وأما ما يجري على ألسنة العوام من تسميتهم ما يفعل أول الليل تراويح ، وما يصلي بعد ذلك قياماً ، فهو تفريق عامي ، بل الكل قيام وتراويح ، وإنما سمي قيام رمضان تراويح لأنهم كانوا يستريحون بعد كل أربع ركعات من أجل أنهم كانوا يطيلون الصلاة ، وسبب إنكار المنكر لذلك لمخالفته ما اعتاده من عادة أهل بلده وأكثر أهل الزمان ، ولجهله بالسنة والآثار ، وما عليه الصحابة والتابعون وأئمة الإسلام ، وما يظنه بعض الناس من أن صلاتنا في العشر هي صلاة التعقيب الذي كرهه بعض العلماء فليس كذلك ؛ لأن التعقيب هو التطوع جماعة بعد الفراغ من التراويح والوتر .
هذه عبارة جميع الفقهاء في تعريف التعقيب أنه التطوع جماعة بعد الوتر عقب التراويح، فكلامهم ظاهر في أن الصلاة جماعة قبل الوتر ليس هو التعقيب
“এটি রমাদানের শেষ দশকের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা; বিশেষ করে মাসের প্রথম বিশ দিনের স্বাভাবিক অভ্যাসের চেয়ে শেষ দশকে যারা বেশি সালাত আদায় করেন, তাদের প্রতি কিছু মানুষের আপত্তির জবাব প্রসঙ্গে। তাদের এই আপত্তির মূল কারণ হলো—প্রচলিত অভ্যাসের প্রাধান্য এবং সুন্নাহ, সাহাবী, তাবেঈন ও ইসলামের ইমামদের আমল সম্পর্কে অজ্ঞতা।আমরা বলি: নবী ﷺ থেকে রমজানের কিয়াম (রাতের নামাজ) সম্পর্কে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যেখানে এই ইবাদতের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে এবং শেষ দশকে এর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। যেহেতু এটি স্পষ্ট যে তারাবির রাকাআতের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারিত নয় এবং সকল আলেমের মতে এর সময় এশার সালাতের পর থেকে ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত; সেহেতু শেষ দশ রাত ইবাদতে জাগরণ করা ‘সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ’। নবী ﷺ নিজে কয়েক রাত জামাতে তা আদায় করেছেন। তাহলে সেই ব্যক্তির ওপর কেন আপত্তি করা হবে, যে মাসের শুরুতে যতটুকু সালাত পড়ত, শেষ দশকে তার চেয়ে বেশি পড়ে? অর্থাৎ, সে শেষ দশকে রাতের প্রথম অংশে মাসের শুরুর মতোই সালাত আদায় করল, কিন্তু তখন বিতর পড়ল না—যাতে দুর্বলরা বা যারা এইটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় তারা চলে যেতে পারে। এরপর ইমাম আবার জামাতে আল্লাহ যতটুকু তাওফিক দেন অতিরিক্ত সালাত আদায় করলেন; আর এসবকেই সমষ্টিগতভাবে ‘কিয়াম’ ও ‘তারাবি’ বলা হয়। সম্ভবত আপত্তিকারীরা অনেক ফকীহের এই বক্তব্যে বিভ্রান্ত হয়েছে যে: “ইমামের জন্য এক খতমের বেশি না করা মুস্তাহাব, যদি না মুসল্লিরা অতিরিক্তের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে।” ফকীহরা এক খতমের বেশি না করাকে মুস্তাহাব বলেছেন মুসল্লিদের কষ্টের আশঙ্কার কারণে; অতিরিক্ত পড়া শরিয়তসম্মত নয়—এই কারণে নয়। বরং তাদের বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, যদি মুসল্লিরা চায় তবে এক খতমের বেশি পড়াও মুস্তাহাব হবে। এটি তাদের কথাতেই স্পষ্ট: “যদি না মুসল্লিরা অতিরিক্তের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে।”সাধারণ মানুষের মুখে প্রচলিত রাতের প্রথম অংশের সালাতকে “তারাবি” এবং পরের অংশকে “কিয়াম” বলা—এটি তাদের তৈরি একটি কৃত্রিম পার্থক্য মাত্র। মূলত সবই ‘কিয়াম’ ও ‘তারাবি’। রমাদানের কিয়ামকে “তারাবীহ” বলা হয়েছে এই কারণে যে, তারা দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে সালাত পড়তেন এবং প্রতি চার রাকাআত পরপর বিশ্রাম (তারউয়িহ) নিতেন। এ বিষয়ে আপত্তিকারীর আপত্তির মূল কারণ হলো—নিজ এলাকার প্রচলিত রীতি ও অধিকাংশ মানুষের অভ্যাসের বিরোধিতা হওয়া এবং সুন্নাহ, সাহাবীদের আছার, তাবেঈন ও ইসলামের ইমামদের পথ সম্পর্কে অজ্ঞতা। আর কিছু মানুষ মনে করে শেষ দশকে এই অতিরিক্ত সালাতটি সেই “তা‘কীব”, যা কিছু আলেম অপছন্দ করেছেন; বিষয়টি আসলে তা নয়। কারণ সমস্ত ফকীহদের সংজ্ঞা অনুযায়ী “তা‘কীব” হলো—তারাবি ও বিতর শেষ করার পর পুনরায় জামাতে নফল সালাত আদায় করা। সুতরাং তাদের বক্তব্য স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, বিতরের আগে জামাতে অতিরিক্ত সালাত পড়া কোনোভাবেই “তা‘কীব” নয়।”(আদ-দুরার আস-সানিয়্যাহ; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৩৬৪)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন,
ولا بأس أن يزيد في عدد الركعات في العشر الأواخر عن عددها في العشرين الأول ويقسمها إلى قسمين قسما يصليه في أول الليل ويخففه على أنه تراويح كما في العشرين الأول ؛ وقسما يصليه في آخر الليل ويطيله على أنه تهجد ، فقد كان النبي صلى الله عليه وسلم يجتهد في العشر الأواخر ما لا يجتهد في غيرها ، وكان إذا دخلت العشر الأواخر شمر وشد المئزر وأحيا ليله وأيقظ أهله تحريا لليلة القدر ، فالذي يقول لا يزيد في آخر الشهر عما كان يصليه في أول الشهر مخالف لهدي النبي صلى الله عليه وسلم ومخالف لما كان عليه السلف الصالح من طول القيام في آخر الشهر في آخر الليل فالواجب اتباع سنته صلى الله عليه وسلم وسنة الخلفاء الراشدين من بعده وحث المسلمين على صلاة التراويح وصلاة القيام لا تخذيلهم عن ذلك وإلقاء الشبه التي تقلل من اهتمامهم بقيام رمضان .
وبالله التوفيق ، وصلى الله على نبينا محمد وآله وصحبه وسلم
“রমাদানের শেষ দশকে (রাতের) রাকাত সংখ্যা প্রথম বিশ দিনের তুলনায় বৃদ্ধি করাতে কোনো অসুবিধা নেই। এই রাকাতগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে: এক ভাগ রাতের প্রথম অংশে আদায় করা হবে এবং কিছুটা হালকা বা সংক্ষেপ করা হবে—যাকে প্রথম বিশ দিনের মতো ‘তারাবীহ’ হিসেবে গণ্য করা হবে। আর অন্য ভাগটি রাতের শেষ অংশে আদায় করা হবে এবং দীর্ঘ করা হবে—যাকে ‘তাহাজ্জুদ’ হিসেবে গণ্য করা হবে। কেননা, নবী করীম (সালাহুল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শেষ দশকে ইবাদতে যে পরিমাণ পরিশ্রম করতেন, তা অন্য সময়ে করতেন না। যখন শেষ দশক প্রবেশ করত, তখন তিনি কোমর বেঁধে নামতেন (তথা পূর্ণ প্রস্তুতি নিতেন), লুঙ্গি শক্ত করে বাঁধতেন, সারা রাত জেগে ইবাদত করতেন এবং লাইলাতুল কদরের সন্ধানে তাঁর পরিবারবর্গকেও জাগিয়ে তুলতেন।অতএব, যে ব্যক্তি বলে যে—মাসের শেষে রাকাত সংখ্যা বাড়ানো যাবে না যা মাসের শুরুতে পড়া হতো, তার এই কথা নবী (সালাহুল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আদর্শের পরিপন্থী। এটি সলফে সালেহীনদের (পুণ্যবান পূর্বসূরি) আমলেরও বিরোধী, কারণ তাঁরা মাসের শেষে রাতের শেষাংশে দীর্ঘ কিয়াম (সালাত) আদায় করতেন।কাজেই ওয়াজিব বা আবশ্যক হলো নবী (সালাহুল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এবং তাঁর পরবর্তী খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নতের অনুসরণ করা এবং মুসলমানদেরকে তারাবীহ ও কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদের ব্যাপারে উৎসাহিত করা। তাদেরকে এ থেকে নিরুৎসাহিত করা এবং এমন সংশয় ছড়ানো উচিত নয় যা রমজানের কিয়ামের প্রতি তাদের আগ্রহ কমিয়ে দেয়। আল্লাহই তাওফিক দানকারী। আমাদের নবী মুহাম্মদ (ﷺ) তাঁর পরিবার ও সাহাবীবর্গের ওপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৮২)
.
সৌদি ফতোয়া বোর্ড এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের প্রবীণ সদস্য, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম সালিহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫৪ হি./১৯৩৫ খ্রি.] তাঁর কিতাব ‘ইত্তিহাফু আহলিল ঈমান বি মাজালিসি শাহরি রমাজান’ এ বলেন:
وأما في العشر الأواخر من رمضان ، فإن المسلمين يزيدون من اجتهادهم في العبادة ، اقتداء بالنبي صلى الله عليه وسلم ، وطلباً لليلة القدر التي هي خير من ألف شهر ، فالذين يصلون ثلاثاً وعشرين ركعة في أول الشهر يقسمونها في العشر الأواخر ، فيصلون عشر ركعات في أول الليل ، يسمونها تراويح ، ويصلون عشراً في آخر الليل ، يطيلونها مع الوتر بثلاث ركعات ، ويسمونها قياماً ، وهذا اختلاف في التسمية فقط ، وإلا فكلها يجوز أن تسمى تراويح ، أو تسمى قياماً ، وأما من كان يصلى في أول الشهر إحدى عشرة أو ثلاث عشرة ركعة فإنه يضيف إليها في العشر الأواخر عشر ركعات ، يصليها في آخر الليل ، ويطيلها ، اغتناماً لفضل العشر الأواخر ، وزيادة اجتهاد في الخير ، وله سلف في ذلك من الصحابة وغيرهم ممن كانوا يصلون ثلاثاً وعشرين كما سبق ، فيكونون جمعوا بين القولين : القول بثلاث عشرة في العشرين الأول ، والقول بثلاث وعشرين في العشر الأواخر “
“আর রমজানের শেষ দশকের ব্যাপারে কথা হলো—নিশ্চয়ই মুসলিমগণ এই সময়ে ইবাদতে অধিকতর সচেষ্ট হন; যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ এবং লাইলাতুল কদরের সন্ধানে করা হয়, যা হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।সুতরাং যারা মাসের শুরুতে ২৩ রাকাত (তারাবীহ) পড়েন, তারা শেষ দশকে তা দু’ভাগে ভাগ করে নেন। রাতের প্রথম অংশে তারা ১০ রাকাত পড়েন যাকে তারা ‘তারাবীহ’ নামকরণ করেন; আর রাতের শেষ অংশে ৩ রাকাত বিতরসহ আরও ১০ রাকাত পড়েন যা তারা দীর্ঘ করেন এবং একে ‘কিয়াম’ (তাহাজ্জুদ) নামে অভিহিত করেন। মূলত এটি কেবল নামকরণের পার্থক্য মাত্র; অন্যথায় এই সবগুলোকে ‘তারাবীহ’ বা ‘কিয়াম’ উভয়ই বলা বৈধ।আর যারা মাসের শুরুতে ১১ বা ১৩ রাকাত পড়তেন, তারা শেষ দশকের ফযিলত অর্জন এবং নেক আমলে অধিকতর পরিশ্রমের উদ্দেশ্যে রাতের শেষভাগে আরও ১০ রাকাত বৃদ্ধি করে দীর্ঘ করে পড়েন। এ ক্ষেত্রে তাঁদের জন্য সাহাবায়ে কেরাম ও অন্যান্যদের আদর্শ (পূর্বসূরি) বিদ্যমান যারা ২৩ রাকাত পড়তেন—যেমনটি পূর্বে আলোচিত হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা মূলত উভয় মতের মধ্যেই সমন্বয় ঘটালেন: অর্থাৎ প্রথম বিশ রাতে ১৩ রাকাতের মত এবং শেষ দশকে ২৩ রাকাতের মত।”(ইত্তিহাফু আহলিল ঈমান বি মাজালিসি শাহরি রমাজান পুস্তিকা; আরও দেখুন ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১০৯৭৬৮)
.
পরিশেষে, উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে রাতের সকল নফল সালাতই কিয়ামুল লাইলের অন্তর্ভুক্ত। তাই রাতের প্রথম অংশ সংক্ষিপ্ত এবং শেষ অংশ দীর্ঘ করে কিয়ামুল লাইল আদায় করা বৈধ ও শরিয়তসম্মত। এমনকি কেউ একাধিক জামাতে ইমাম বা মুক্তাদি হিসেবে সালাত আদায় করলেও তা জায়েজ; তবে একই রাতে দুইবার বিতির আদায় করা শরিয়তে প্রমাণিত নয়। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।