প্রশ্ন: কেউ যদি ফজর হওয়ার আগে রাত বাকি আছে মনে করে অথবা সূর্যাস্ত হয়ে গেছে মনে করে ভুলবশত পানাহার করে তাহলে তার সিয়ামের বিধান কি?
▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর ফজর হওয়ার আগে রাত বাকি আছে মনে করে অথবা সূর্যাস্ত হয়ে গেছে মনে করে কেউ যদি ভুলবশত পানাহার করে এবং পরে তার ভুল ধরা পড়ে, তবে এ ক্ষেত্রে তার সিয়ামের বিধান কি হবে? সে বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
.
প্রথম মত: অধিকাংশ আলেমদের মতে, এতে রোজা ভেঙে যাবে এবং এর পরিবর্তে অন্য একদিন কাযা রোজা রাখা ওয়াজিব।
.
দ্বিতীয় মত: অন্যান্য আলেমদের মতে, তার রোজা সঠিক এবং সে রোজা পূর্ণ করবে, তাকে কোনো কাযা করতে হবে না। এটি তাবেয়ি মুজাহিদ ও হাসান বসরী রাহিমাহুল্লাহ’র মত এবং ইমাম আহমদের একটি বর্ণনা। শাফেয়ি মাযহাবের ইমাম মুযানী ও শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ এটি পছন্দ করেছেন এবং শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে সালিহ আল-উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) একে প্রধান্য দিয়েছেন।
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:
والذين قالوا لا يفطر في الجميع ( يعني : إذا أخطأ أو نسي في أول النهار أو آخره ) قالوا حجتنا أقوى ، ودلالة الكتاب والسنَّة على قولنا أظهر : فإن الله تعالى قال : ربنا لا تؤاخذنا إن نسينا أو أخطأنا ، فجمع بين النسيان والخطأ ؛ ولأن من فعل محظورات الحج والصلاة مخطئا كمن فعلها ناسيا ، وقد ثبت في الصحيح ” أنهم أفطروا على عهد النبي صلى الله عليه وسلم ثم طلعت الشمس ” ولم يذكروا في الحديث أنهم أُمروا بالقضاء ، ولكن هشام بن عروة قال : ” لا بدَّ من القضاء ” ، وأبوه أعلم منه وكان يقول : ” لا قضاء عليهم ” ، وثبت في الصحيحين ” أن طائفة من الصحابة كانوا يأكلون حتى يظهر لأحدهم الخيط الأبيض من الخيط الأسود ، وقال النبي صلى الله عليه وسلم لأحدهم إن وسادك لعريض ، إنما ذلك بياض النهار وسواد الليل ” ، ولم ينقل أنه أمرهم بقضاء ، وهؤلاء جهلوا الحكم فكانوا مخطئين ، وثبت عن عمر بن الخطاب أنه أفطر ثم تبين النهار فقال : ” لا نقضي فإنا لم نتجانف لإثم ” ، وروي عنه أنه قال : ” نقضي ” ، ولكن إسناد الأول أثبت ، وصح عنه أنه قال :” الخطْب يسير ” فتأول ذلك مَن تأوله على أنه أراد خفة أمر القضاء ، لكن اللفظ لا يدل على ذلك .وفى الجملة : فهذا القول أقوى أثراً ونظراً ، وأشبه بدلالة الكتاب والسنَّة والقياس
“যারা বলেন যে, কোনো অবস্থাতেই রোজা ভঙ্গ হবে না (অর্থাৎ দিনের শুরুতে বা শেষে যদি কেউ ভুলবশত বা অজ্ঞতাবশত সময় নির্ধারণে ভুল করে পানাহার করে), তাদের যুক্তিই অধিক শক্তিশালী এবং কুরআন ও সুন্নাহর দলিলসমূহ তাদের মতের পক্ষেই অধিক স্পষ্ট। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেন: “হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা যদি বিস্মৃত হই কিংবা ভুল করি, তবে আমাদের অপরাধী করবেন না।’ (সূরা বাকারা: ২৮৬) এখানে আল্লাহ তাআলা বিস্মৃতি (ভুলে যাওয়া) এবং ভুল করা (অজ্ঞতা) উভয়টিকে একত্রে উল্লেখ করেছেন। তাছাড়া, হজ্জ ও সালাতের নিষিদ্ধ কাজগুলো যে ব্যক্তি ভুলবশত (অজ্ঞতাবশত) করে ফেলে, সে ঐ ব্যক্তির মতো যে তা ভুলে গিয়ে করেছে (উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষমাযোগ্য)।সহিহ হাদিসে প্রমাণিত আছে যে, ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে সাহাবীগণ (মেঘলা দিনে সূর্য ডুবেছে মনে করে) ইফতার করেছিলেন, এরপর সূর্য দেখা গিয়েছিল’; কিন্তু হাদিসের কোথাও এটি উল্লেখ করা হয়নি যে তাঁদেরকে ঐদিনের রোজার কাযা আদায়ের আদেশ দেওয়া হয়েছিল। যদিও বর্ণনাকারী হিশাম ইবনে উরওয়াহ বলেছিলেন যে ‘কাজা করা আবশ্যক’, তবে তাঁর পিতা (উরওয়াহ ইবনে জুবায়ের) তাঁর চেয়ে অধিক জ্ঞানী ছিলেন এবং তিনি বলতেন: ‘তাঁদের ওপর কোনো কাজা নেই’। তদ্রূপ সহিহাইন (বুখারি ও মুসলিম)-এ বর্ণিত হয়েছে যে,সাহাবীদের একটি দল (আয়াত বুঝতে ভুল করে) ততক্ষণ পর্যন্ত (সাহরি) খেতেন যতক্ষণ না সাদা সুতা কালো সুতা থেকে স্পষ্ট হতো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের একজনকে বলেছিলেন: ‘তোমার বালিশ তো তাহলে অনেক চওড়া (যদি তার নিচে দুই সুতা থাকে), আসলে তা হলো দিনের শুভ্রতা ও রাতের অন্ধকার’; এমতাবস্থায় তিনি তাঁদের কাযা করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না।মূলত তাঁরা হুকুম বা বিধানটি জানতেন না, তাই তাঁরা অনিচ্ছাকৃত ভুলকারী (মুকতি) হিসেবে গণ্য ছিলেন। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকেও বর্ণিত আছে যে, তিনি একবার ইফতার করার পর সূর্য প্রকাশিত হয়ে পড়লে বলেছিলেন, ‘আমরা কাযা আদায় করব না, কারণ আমরা (স্বেচ্ছায়) পাপের দিকে ঝুঁকে পড়ার জন্য এমনটা করিনি’। যদিও তাঁর থেকে ‘কাযা আদায়ের স্বপক্ষেও বর্ণনা রয়েছে, তবে পূর্বোক্ত (কাযা না করার) বর্ণনাটির সনদ (সূত্র) অধিক শক্তিশালী। তাঁর থেকে এটিও সহিহ সূত্রে বর্ণিত যে তিনি (এ ভুল ইফতার প্রসঙ্গে) বলেছিলেন, ‘বিষয়টি সামান্য।’কেউ কেউ এর ব্যাখ্যা করেছেন যে—কাযা করা সহজ বিধায় তিনি এমনটি বলেছেন, কিন্তু শব্দের প্রয়োগ এই অর্থের দিকে নির্দেশ করে না (বরং এটি ভুলের গুরুত্বহীনতা বা ক্ষমা পাওয়ার দিকেই ইঙ্গিত করে)।
সারসংক্ষেপ হলো: এই মতটিই (কাযা না করা) বর্ণনাগত ও যুক্তিগতভাবে অধিক শক্তিশালী এবং কুরআন, সুন্নাহ ও কিয়াসের (যৌক্তিক তুলনা) প্রমাণের সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া; খণ্ড: ২০; পৃষ্ঠা: ৫৭২, ৫৭৩; ইবনু উসাইমীন; আশ-শারহুল মুমতি; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৪১১)
.
এছাড়াও অপর একটি হাদিস থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, ইসলামী শরিয়তে অনিচ্ছাকৃত ভুল বা বিস্মৃতিকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। এর একটি বড় প্রমাণ হলো রোজা অবস্থায় ভুলবশত পানাহার করা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি রোযা রাখার কথা ভুলে গিয়ে আহার ও পান করেছে; সে যেন তার রোযা পরিপূর্ণ করে। কেননা আল্লাহ্ই তাকে খাইয়েছেন এবং পান করিয়েছেন”।(সহিহ বুখারী হা/১৩৯৯; ও সহিহ মুসলিম হা/১১৫৫) এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, মানুষের অনিচ্ছাকৃত ভুল ইবাদতে কোনো ত্রুটি ঘটায় না। সুতরাং এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, এ অবস্থায় রোজা সঠিক হওয়ার এবং কাযা না করার দলিলগুলো অত্যন্ত জোরালো। তবুও কোনো মুসলিম যদি অধিক সতর্কতার খাতিরে সেই রোজার বদলে একদিন কাযা করে নেন তবে তা উত্তম হবে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
▬▬▬▬✿▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।