প্রশ্ন: শরিয়তে ওসিয়তের কি কোনো নির্দিষ্ট রূপ বা বাধ্যতামূলক নমুনা রয়েছে? কুরআন-সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য আলেমদের ফতোয়ার আলোকে একটি শরিয়তসম্মত ওসিয়তের নমুনা জানতে চাই।
▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য এবং অগণিত দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রতি। অতঃপর— মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী; তাই প্রত্যেক মুসলিমের জন্য নিজের ওপর থাকা ঋণ, মানুষের অধিকার, আমানত, পাওনা ও অন্যান্য দায়-দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে লিখে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে, মৃত্যুর পর তার জানাযা-দাফন, ঋণ ও দায়-দেনা পরিশোধ এবং শরিয়তসম্মতভাবে অবশিষ্ট সম্পদ বণ্টনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা রেখে যাওয়া উত্তম।রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ওসিয়ত লিখে রাখার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «مَا حَقُّ امْرِئٍ مُسْلِمٍ لَهُ شَيْءٌ يُوصِي فِيهِ يَبِيتُ لَيْلَتَيْنِ إِلَّا وَوَصِيَّتُهُ مَكْتُوبَةٌ عِنْدَهُ» —“কোনো মুসলিম ব্যক্তির এমন কোনো বিষয় থাকলে, যাতে তার ওসিয়ত করার প্রয়োজন রয়েছে, তার জন্য লিখিত ওসিয়ত নিজের কাছে না রেখে দুই রাত অতিবাহিত করা উচিত নয়।”(সহীহ বুখারী হা/২৭৩৮; সহীহ মুসলিম হা/১৬২৭)।
.
হাদিসটির ব্যাখ্যায় শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেন:
فيه الْحَثّ عَلَى الْوَصِيَّة ، وَقَدْ أَجْمَعَ الْمُسْلِمُونَ عَلَى الْأَمْر بِهَا ، لَكِنَّ مَذْهَبنَا وَمَذْهَب الْجَمَاهِير أَنَّهَا مَنْدُوبَة لَا وَاجِبَة . وَقَالَ دَاوُدُ وَغَيْره مِنْ أَهْل الظَّاهِر : هِيَ وَاجِبَة ؛ لِهَذَا الْحَدِيث ، وَلَا دَلَالَة لَهُمْ فِيهِ ، فَلَيْسَ فِيهِ تَصْرِيح بِإِيجَابِهَا ، لَكِنْ إِنْ كَانَ عَلَى الْإِنْسَان دَيْن أَوْ حَقّ أَوْ عِنْده وَدِيعَة وَنَحْوهَا لَزِمَهُ الْإِيصَاء بِذَلِكَ . قَالَ الشَّافِعِيّ رَحِمَهُ اللَّه : مَعْنَى الْحَدِيث : مَا الْحَزْم وَالِاحْتِيَاط لِلْمُسْلِمِ إِلَّا أَنْ تَكُون وَصِيَّته مَكْتُوبَة عِنْده .وَيُسْتَحَبّ تَعْجِيلهَا ، وَأَنْ يَكْتُبهَا فِي صِحَّته ، وَيُشْهِد عَلَيْهِ فِيهَا ، وَيَكْتُب فِيهَا مَا يَحْتَاج إِلَيْهِ ، فَإِنْ تَجَدَّدَ لَهُ أَمْر يَحْتَاج إِلَى الْوَصِيَّة بِهِ أَلْحَقَهُ بِهَا . قَالُوا : وَلَا يُكَلَّف أَنْ يَكْتُب كُلّ يَوْم مُحَقَّرَات الْمُعَامَلَات وَجُزْئِيَّات الْأُمُور الْمُتَكَرِّرَة”
“এই হাদীসে ওসিয়তের প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। সবাই এ ব্যাপারে একমত যে, মুসলিমরা উক্ত বিষয়ে আদিষ্ট। কিন্তু আমাদের এবং অধিকাংশের মাযহাব হলো ওসিয়ত করা মুস্তাহাব; ওয়াজিব নয়। দাউদসহ কিছু যাহেরীর মত হলো ওসিয়ত করা উক্ত হাদীসের কারণে ওয়াজিব। এই হাদীসে তাদের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। হাদীসটিতে স্পষ্টত আবশ্যকতার কথা বলা হয়নি। কিন্তু যদি কোনো মানুষের ঋণ, অধিকার, আমানত বা অনুরূপ কিছু থাকে, তাহলে তার জন্য সে বিষয়ে ওসিয়ত করা আবশ্যক হয়ে যাবে। শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: হাদীসটির অর্থ: মুসলিমের বিচক্ষণতা ও নিরাপত্তার পরিচায়ক হলো তার কাছে নিজের ওসিয়ত লেখা থাকবে।ওসিয়ত আগেভাগে করে ফেলা মুস্তাহাব। সুস্থ অবস্থায় ওসিয়ত লিখবে। ওসিয়তের ব্যাপারে সাক্ষীও রাখবে। প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সেখানে লিখবে। নতুন কোনো বিষয়ে ওসিয়তের প্রয়োজন হলে সেটা সংযুক্ত করবে। তারা বলেন: প্রতিদিনের তুচ্ছ লেনদেন এবং বারংবার ঘটে যাওয়া ছোটখাট বিষয় লেখা দায়িত্ন নয়।” (শারহু সহীহ মুসলিম থেকে সমাপ্ত; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৬৯৮২৭)
.
(১).ওয়াজিব ওসিয়ত: ব্যক্তির দায়ে ও ব্যক্তির প্রাপ্য যে সকল অধিকার রয়েছে সেগুলোর বিবরণ সম্বলিত ওসিয়ত। যেমন: ঋণ, কর্জ, তার কাছে সঞ্চিত আমানত কিংবা মানুষের জিম্মায় তার থাকা কিছু অধিকার। এখানে নিজ সম্পদের সুরক্ষা ও নিজের দায় মুক্তির জন্য ওসিয়ত করা ওয়াজিব।
.
(২).মুস্তাহাব ওসিয়ত: এটা হলো নিছক দান। যেমন: ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ বা এর কম পরিমাণ ওয়ারিশ নয় এমন আত্মীয়ের জন্য বা অন্য কারো জন্য ওসিয়ত করা। অথবা দরিদ্র-মিসকীন কিংবা কল্যাণকর খাতে দান করার মত নেক কাজে ওসিয়ত করা।(দেখুন,ফাতাওয়াল লাজনাহ আদ-দাইমাহ;খণ্ড; ১৬;পৃষ্ঠা;২৬৪)]।
.
মানুষ তার পরিবারকে জানাযার সাথে সম্পৃক্ত কিছু বিষয়ে ওসিয়ত করতে পারে। যেমন: কে তাকে গোসল দিবে, কে তার জানাযা পড়াবে ইত্যাদি। তাদেরকে বিদাত পরিত্যাগের ওসিয়ত করতে পারে। এছাড়া বিলাপসহ অন্যান্য নিষিদ্ধ বিষয়াবলি থেকে বিরত থাকার ওসিয়তও করতে পারে। বিশেষতঃ যদি সে জেনে থাকে যে তারা হয়তো এমন কিছু কাজে লিপ্ত হবে।এর পক্ষে প্রমাণ হলো মুসলিমের হাদীস,আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু মুমূর্ষু অবস্থায় বলেন: (فَإِذَا أَنَا مُتُّ فَلَا تَصْحَبْنِي نَائِحَةٌ وَلَا نَارٌ)“আমি মারা যাওয়ার পর কোনো বিলাপকারিণী এবং (ধূপের) আগুন যেন আমার সঙ্গী না হয়।”(সহীহ মুসলিম হা/১২১)
.
অপর বর্ননায় ইমাম তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেন, হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:(إِذَا مِتُّ فَلَا تُؤْذِنُوا بِي ، إِنِّي أَخَافُ أَنْ يَكُونَ نَعْيًا ، فَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْهَى عَنْ النَّعْيِ)“আমি মারা গেলে তোমরা আমাকে নিয়ে কোনো ঘোষণা দিবে না। আমার আশঙ্কা হয় যে, এটা মৃত্যু সংবাদ প্রচার বলে ধরা হবে। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মৃত্যুসংবাদ প্রচারে নিষেধ করতে শুনেছি।”(তিরমিযী হা/৯৮৬; ও ইবনে মাজাহ হা/১৪৭৬; শাইখ আলবানী সহীহুত তিরমিযীতে হাদীসটিকে হাসান বলেছেন]।
.
ইমাম আহমদ বর্ণনা করেন, আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: আমি মারা যাওয়ার পর তোমরা আমার কবরে তাঁবু টানাবে না। (ধূপের) আগুন নিয়ে আমার পিছে পিছে আসবে না। আমাকে দ্রুত আমার রবের কাছে নিয়ে যাবে। কারণ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: “নেককার বান্দা বা ব্যক্তিকে খাটিয়ায় রাখার পর সে বলতে থাকে: “তোমরা আমাকে সামনে এগিয়ে দাও। তোমরা আমাকে সামনে এগিয়ে দাও।” আর বদকার হলে সে বলতে থাকে: “তোমাদের ধ্বংস হোক! তোমরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?” (মুসনাদে আহমদ হা/১০১৪১; শুয়াইব আরনাউত্ব মুসনাদ আহমদের তাহকীকে হাদীসটিকে হাসান বলেছেন]।
.
ইমাম হাকেম মুস্তাদরাক বইয়ে বর্ণনা করেন, কাইস ইবনে আসেম রাদিয়াল্লাহু আনহু মৃত্যুর সময় স্বজনদের ওসিয়ত করেন:(إذا أنا مت فلا تنوحوا علي فإن رسول الله صلى الله عليه وسلم لم ينح عليه) “আমি মারা যাওয়ার পর তোমরা আমাকে নিয়ে বিলাপ করবে না। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে বিলাপ করা হয়নি।”(হাকেম মুস্তাদরাক হা/১৪০৯; হাকেম বলেন: হাদীসটির সনদ সহীহ। তারা দু’জন (বুখারী ও মুসলিম) এটা বর্ণনা করেননি। যাহাবী তালখীস বইয়ে বলেন: হাদীসটি সহীহ।
.
এটি ছাড়া অন্যান্য হাদীস থেকেও প্রমাণিত হয় যে, জানাযার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়, বিলাপ থেকে সতর্ক করা কিংবা অনুরূপ বিষয়ে ওসিয়ত করা বৈধ। তবে শরিয়তে ওসিয়তের জন্য এমন কোনো নির্দিষ্ট ছক, ভাষা বা বাধ্যতামূলক নমুনা নির্ধারিত নেই, যা প্রত্যেক ব্যক্তিকে হুবহু অনুসরণ করতে হবে। বরং প্রত্যেক ব্যক্তি তার পারিবারিক অবস্থা, দায়-দায়িত্ব, পাওনা ও প্রাপ্য অধিকার এবং প্রয়োজনের বিবেচনায় কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী উপযুক্ত ওসিয়ত করবে। অতএব, ওসিয়তের কিছু নির্দিষ্ট বাক্যই শরিয়তনির্ধারিত—এমন বিশ্বাস করা উচিত নয়।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটি’ (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল-বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল-ইফতা)-এর আলিমগণকে ‘হাযিহি ওয়াসিয়্যাতি আশ-শার‘ইয়্যাহ’ পুস্তিকায় উল্লিখিত ওসিয়ত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। স্থায়ী কমিটির আলেমগন এর উত্তরে বলেন:
” بقراءة الوصية المذكورة لم يوجد فيها ما يخالف الشرع ، ولكن صياغتها بشكل وصية من كل فرد وتوزيعها على الناس يوهم أنه يستحب لكل شخص أن يوصي بما فيها أو يشتريها ويدفعها لمن يتولى شأنه بعد موته ، مع أنه لا داعي لذلك ؛ لأن أحكام الجنائز المذكورة فيها موجودة في كتب الفقه ، يراجعها من يحتاج إليها بدون إيصاء أو توزيع ، لا سيما وعمل المسلمين في هذه البلاد والحمد لله في أحكام الجنائز يتمشى على السنة “
“উল্লিখিত ওসিয়ত পাঠ করে শরীয়তের বিপরীত কিছু পাওয়া যায়নি। কিন্তু প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য এভাবে ওসিয়তের নমুনা প্রণয়ন করে মানুষের মাঝে বিতরণ করলে ভুল ধারণা তৈরি হবে যে, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য উক্ত নমুনা অনুযায়ী ওসিয়ত করা, এটা ক্রয় করা এবং মৃত্যুর পর যে তার সকল কিছুর দায়িত্ব নিবে তাকে এটা দেওয়া মুস্তাহাব। অথচ এর প্রয়োজন নেই। কেননা এতে উল্লিখিত বিধি-বিধান ফিকহের বইসমূহে রয়েছে। যার প্রয়োজন সে পড়ে নিবে। এর জন্য পরামর্শ দেওয়া এবং বিতরণ করার প্রয়োজন নেই। বিশেষতঃ যেহেতু আল্লাহর অনুগ্রহে এই অঞ্চলে জানাযার হুকুমের ক্ষেত্রে মুসলিমদের আমল সুন্নাহর অনুগামী।”(সমাপ্ত; ফাতাওয়াল-লাজনাহ আদ-দাইমাহ: খণ্ড: ১৬; পৃষ্ঠা: ২৮৯)।
.
.
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম, ইন্নাল হামদা লিল্লাহি নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসুলিহিল কারিম। আমি [নাম], সুস্থ মস্তিষ্কে, পূর্ণ জ্ঞান-বিবেচনায় এবং স্বেচ্ছায় আমার প্রিয় পরিবার-পরিজনের উদ্দেশে এই ওসিয়তনামা রেখে যাচ্ছি। আমার সর্বপ্রথম ওসিয়ত—তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে, ঈমানকে আঁকড়ে ধরবে এবং ইসলামের ওপর অটল থাকবে। নামাযের ব্যাপারে যত্নবান হবে, হালালকে গ্রহণ করবে, হারাম থেকে দূরে থাকবে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহকে পথনির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করবে। তোমরা পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, দয়া ও উত্তম আচরণ বজায় রাখবে; আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখবে এবং সুখে-দুঃখে একে অপরের পাশে দাঁড়াবে। মনে রেখো, দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী; একদিন আমাদের প্রত্যেককেই একা আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। তাই আমার মৃত্যুর পর আমার জন্য সবচেয়ে মূল্যবান উপহার হবে তোমাদের আন্তরিক দোয়া, তোমাদের নেক আমল এবং তোমাদের সুন্নাহসম্মত জীবন। আল্লাহ তাআলা বলেন: يَا بَنِيَّ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَىٰ لَكُمُ الدِّينَ فَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ—“হে আমার সন্তানগণ! নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্য এই দ্বীনকে মনোনীত করেছেন; সুতরাং তোমরা মুসলিম না হয়ে কখনো মৃত্যুবরণ করো না।”(সূরা আল-বাকারা, ২: ১৩২)।
.
আমার মৃত্যুর পর তোমাদের প্রতি বিশেষ ওসিয়ত হলো— তোমরা বিলাপ, মাতম, চিৎকার-চেঁচামেচি এবং জাহেলিয়াতের কোনো প্রথায় লিপ্ত হবে না। আমার সতর ও পর্দার বিধান যথাযথভাবে রক্ষা করবে এবং অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব না করে শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে আমার গোসল, কাফন, জানাযা ও দাফন সম্পন্ন করবে। আমার জানাযা ও কাফন-দাফনের প্রতিটি কার্যক্রম রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সহীহ সুন্নাহ অনুযায়ী সম্পন্ন করবে; কোনো বিদআত, কুসংস্কার বা শরিয়তবিরোধী রীতিনীতি পালন করবে না। আমার জানাযা পড়ানো বা গোসল দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার ইচ্ছা থাকলে [নাম]-এর নাম উল্লেখ করা যেতে পারে; তবে সবকিছু শরিয়তের বিধানের অধীনেই হবে। আমাকে দাফন করার পর কোনো নির্দিষ্ট দিন—তৃতীয়, সপ্তম, চল্লিশতম কিংবা অন্য কোনো দিন—নির্ধারণ করে ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা খাবারের আয়োজন করবে না। তবে সাধারণ সদকা হিসেবে যেকোনো সময় দরিদ্র-মিসকিনকে খাবার খাওয়াতে বা দান-সদকা করতে পারো। আমার রেখে যাওয়া সম্পদ সম্পর্কে প্রথমে শরিয়তসম্মত প্রয়োজনীয় কাফন-দাফনের ব্যয় নির্বাহ করবে; এরপর আমার ওপর থাকা ঋণ, কর্জ, মানুষের প্রাপ্য অধিকার, আমানত ও অন্যান্য দায়-দায়িত্ব যথাযথভাবে পরিশোধ করবে। এরপর আমার কোনো বৈধ ওসিয়ত থাকলে তা বাস্তবায়ন করবে—তবে তা এক-তৃতীয়াংশের বেশি হবে না এবং কোনো শরিয়তসম্মত ওয়ারিশের জন্য হবে না। এরপর অবশিষ্ট সম্পদ আল্লাহ তাআলা নির্ধারিত মিরাসের বিধান অনুযায়ী প্রত্যেক হকদার ওয়ারিশের মধ্যে ইনসাফের সঙ্গে বণ্টন করবে।
.
হে আমার প্রিয়জন! আমার কোনো ভুল-ত্রুটি, অবহেলা বা কষ্টদায়ক আচরণ তোমাদের হৃদয়ে থেকে থাকলে আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা, রহমত ও মাগফিরাতের দোয়া করো। আমার পক্ষ থেকে কোনো মানুষের হক নষ্ট হয়ে থাকলে তা যথাসম্ভব আদায় করে দিও। তোমরা স্বেচ্ছায় আমার পক্ষ থেকে সদকা করতে পারো এবং কোনো নেক আমল করে আল্লাহর কাছে আমার জন্য দোয়া করতে পারো। আমার এই ওসিয়তনামার বৈধ নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও বাস্তবায়ন করবে; অন্যায়ভাবে কোনো বৈধ ওসিয়ত গোপন, নষ্ট বা পরিবর্তন করবে না। তবে এই ওসিয়তনামার কোনো অংশ যদি শরিয়তের বিধানের পরিপন্থী হয়, তা কার্যকর হবে না; বরং কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর বিধানই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন: فَمَنۢ بَدَّلَهُۥ بَعْدَ مَا سَمِعَهُۥ فَإِنَّمَآ إِثْمُهُۥ عَلَى ٱلَّذِينَ يُبَدِّلُونَهُۥ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ—“অতঃপর যে ব্যক্তি তা শোনার পর পরিবর্তন করে, তার গুনাহ তাদের ওপরই বর্তাবে যারা তা পরিবর্তন করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” (সূরা আল-বাকারা, ২: ১৮১)।
.
ইতি, ওসিয়তকারীর নাম——————————
সাক্ষী (১)———— নাম: ————পিতা: —————-
সাক্ষী (২)————-নাম: ————পিতা: ————— তারিখঃ—————(স্বাক্ষর) ——————————
পরিশেষে, কবি আবুল ‘আতাহিয়াহ (মৃত: ২১৩ হি.) বলেন, নিশ্চয়ই শেষ বিচারের দিন বড়ই কঠিন দিন, সেদিন যালেমদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না’। ‘অতএব হে বিজয়ী! তুমি কবরে যাওয়ার পূর্বে এবং পুলসিরাতের ভয়াবহ দৃশ্য আসার পূর্বে পাথেয় সঞ্চয় কর’। হে আল্লাহ! আমাদের ঈমানকে অটুট রাখুন, আমাদের জীবনকে নেক আমলে পরিপূর্ণ করুন, আমাদের অন্তিম সময়কে ঈমান ও তাওহীদের ওপর করুন এবং আমাদের সবাইকে আপনার সন্তুষ্টি ও জান্নাতের অধিকারী করুন- আমীন! (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।