কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক বার্তা প্রচার করাই এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

যেসকল নেক আমল আখিরাতে দাঁড়িপাল্লাকে ভারী করবে

ভূমিকা: মানব জীবনে ইবাদতের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কেননা আল্লাহ মানুষকে তাঁর ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর ইবাদতের মাধ্যমে ইহকালীন জীবন যেমন সুন্দর ও সুচারুরূপে পরিচালিত হয়, পরকালীন জীবন তেমনি মঙ্গলময় হয়। আবার ইবাদত না করলে যেমন আল্লাহর নাফরমানী হয়, তেমনি রাসূল (ﷺ)-এর বিরোধিতা হয়। সেই সাথে পৃথিবীতে মানুষ প্রেরণের উদ্দেশ্য অপূর্ণ রয়ে যায়। তাই মানব জীবনে ইবাদত একটি যরূরী বিষয়। মানুষের ইহকালীন জীবনের আমল ইবাদত সমূহ পরকালে মীযানে (পাল্লায়) ওজন করা হবে। ঐসব আমলের মধ্যে কিছু পাল্লাকে ভারী করবে এবং কিছু হালকা করবে। এগুলো জেনে মুমিন আমল করতে পারলে অল্প আমলই তার নাজাতের কারণ হতে পারে।আজ আমরা যেসকল নেক আমল আখিরাতে দাঁড়িপাল্লাকে ভারী করবে সেগুলো জানার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ। যেমন:

(১). কালেমায়ে তাওহীদ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’: তাওহীদের স্বীকৃতি প্রদানকারী কালেমা পরকালে পাল্লাকে ভারী করবে। আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আছ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তাআলা ক্বিয়ামত দিবসে আমার উম্মতের একজনকে সমস্ত সৃষ্টির সামনে আলাদা করে এনে উপস্থিত করবেন। তিনি তার সামনে নিরানব্বইটি আমলনামার খাতা খুলে ধরবেন। প্রতিটি খাতা দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। তারপর তিনি প্রশ্ন করবেন, তুমি কি এগুলো হতে কোন একটি (গুনাহ) অস্বীকার করতে পারো? আমার লেখক ফেরেশতারা কি তোমার উপর যুলুম করেছে? সে বলবে- না, হে প্রভু!তিনি আবার প্রশ্ন করবেন, তোমার কোন অভিযোগ আছে কি? সে বলবে- না, হে আমার প্রভু! তিনি বলবেন, আমার নিকট তোমার একটি সওয়াব আছে। আজ তোমার উপর এতটুকু যুলুমও করা হবে না। তখন ছোট একটি কাগজের টুকরা বের করা হবে। তাতে লিখা থাকবে, ‘আমি সাক্ষ্য প্রদান করি যে, আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কোন প্রভু নেই।’ আমি আরো সাক্ষ্য দেই যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। তিনি তাকে বলবেন, দাঁড়িপাল্লার সামনে যাও। সে বলবে, হে প্রভু! এতগুলো খাতার বিপরীতে এই সামান্য কাগজটুকুর কি আর ওজন হবে? তিনি বলবেন, তোমার উপর কোন রকম যুলুম করা হবে না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, তারপর খাতাগুলো এক পাল্লায় রাখা হবে এবং উক্ত টুকরাটি আরেক পাল্লায় রাখা হবে। ওযনে খাতাগুলোর পাল্লা হালকা হবে এবং কাগজের টুকরার পাল্লা ভারী হবে। আর আল্লাহ তাআলার নামের বিপরীতে কোন কিছুই ভারী হতে পারে না। (তিরমিযী হা/২৬৩৯; ইবনু মাজাহ হা/৪৩০০; মিশকাত হা/৫৫৫৯; সহীহাহ হা/২৫৬৩, আরো দেখুন- আহমাদ হা/৬৫৮৩, ৭১০১; হাকিম হা/১৫৪; সহীহাহ হা/৬২৯৫)
.
(২). সুবহানাল্লাহ, আল-হামদুল্লিাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার বলা: ঈমানদার ব্যক্তি নির্দিষ্ট পরিমাণে তাসবীহ, তাহলীল ও যিকর করলে পরকালে নেকীর পাল্লা ভারী হবে। এমর্মে হাদীসে এসেছে, আবু হুরায়রাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম (ﷺ) বলেছেন, দু’টি কালিমাহ আছে, যেগুলো দয়াময়ের কাছে অতি প্রিয়, মুখে উচ্চারণ করা খুবই সহজ, দাঁড়িপাল্লায় অত্যন্ত ভারী। (কালিমা দু’টি হচ্ছে), সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী সুবহান্নাল্লাহিল আযীম। অর্থ: ‘আমরা আল্লাহর প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করছি, মহান আল্লাহ (যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে) অতি পবিত্র।'(বুখারী হা/৭৫৬৩, ৬৪০৬; মুসলিম হা/২৬৯৪; মিশকাত হা/২২৯৮, আরো দেখুন- মুসলিম হা/২২৩; তিরমিযী হা/৩৫১৭; ইবনু মাজাহ হা/২৮০ মুসলিম হা/২৭২৬, ‘দো‘আ ও যিকর’ অধ্যায়, ‘দিনের প্রথম প্রহরে তাসবীহ পাঠ’, অনুচ্ছেদ; তিরমিযী হা/৩৫৫৫; নাসাঈ হা/১৩৫১; ইবনু মাজাহ হা/৩৮০৮)

(৩). উত্তম চরিত্র: মানুষ উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে দুনিয়াতে যেমন সম্মানিত ও সমাদৃত হয়, পরকালেও তেমনি অশেষ সওয়াবের অধিকারী হবে। আর এ বৈশিষ্ট্য তার নেকীর পাল্লাকে ভারী করবে। আবুদ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, مَا شَىْءٌ أَثْقَلُ فِىْ مِيزَانِ الْمُؤْمِنِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ خُلُقٍ حَسَنٍ وَإِنَّ اللهَ لَيَبْغَضُ الْفَاحِشَ الْبَذِىءَ. ‘ক্বিয়ামত দিবসে মুমিনের দাঁড়িপাল্লায় সচ্চরিত্র ও সদাচারের চেয়ে অধিক ওযনের আর কোন জিনিস হবে না। কেননা আল্লাহ তা‘আলা অশ্লীল ও কটুভাষীর প্রতি রাগান্বিত হন। (তিরমিযী হা/২০০২; সিলসিলা সহীহাহ হা/৮৭৬)

(৪). জানাযা ও দাফনে অংশগ্রহণ করা: মানুষ মারা গেলে তার জানাযায় অংশগ্রহণ করা মুমিনের ছয়টি হকের অন্যতম। এর মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী বহু সওয়াবের অধিকারী হয়। যা পরকালে তার নেকীর পাল্লাকে ভারী করবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, যে ব্যক্তি জানাযার অনুগামী হয় এবং জানাযার সালাত আদায় করে, অতঃপর দাফন করা পর্যন্ত জানাযার সাথে থাকে, তার জন্য দু’ক্বীরাত সওয়াব রয়েছে। যার হাতে মুহাম্মাদের জীবন, তাঁর কসম করে বলছি, এক ক্বীরাত হচ্ছে ওহোদ পাহাড় অপেক্ষা দাঁড়িপাল্লায় অধিক ভারী।’(আহমাদ; সহীহুল জামে‘ হা/৬১৩৫)। অন্যত্র তিনি বলেন, যে ব্যক্তি মৃতের জন্য সালাত আদায় করা পর্যন্ত জানাযায় উপস্থিত থাকবে, তার জন্য এক ক্বীরাত। আর যে ব্যক্তি মৃতের দাফন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত উপস্থিত থাকবে তার জন্য দু’ক্বীরাত। জিজ্ঞেস করা হলো দু’ক্বীরাত কী? তিনি বললেন, দু’টি বিশাল পর্বত সমতুল্য (সওয়াব)।’(বুখারী হা/১৩২৫, ৪৭; মুসলিম হা/৯৪৫)

(৫). আল্লাহর রাস্তায় ঘোড়া প্রস্ত্তত রাখা: আল্লাহর কালিমা তথা দ্বীনকে সমুন্নত করার জন্য অনেক সময় কাফির, মুশরিক শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়। সেই জিহাদে ব্যবহারের জন্য যে ব্যক্তি ঘোড়া প্রস্ত্তত রাখে তার জন্য সওয়াব রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন- ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান ও তাঁর প্রতিশ্রুতির প্রতি বিশ্বাস রেখে আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য ঘোড়া প্রস্ত্তত রাখে, ক্বিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তির পাল্লায় ঘোড়ার খাদ্য, পানীয়, গোবর ও পেশাব ওযন করা হবে।’(বুখারী হা/২৮৫৩; নাসাঈ হা/৩৫৮২; মিশকাত হা/৩৮৬৮)

(৬). ফরয সালাতের পরে যিকর করা: ফরয সালাত শেষে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অনেক দোআ, তাসবীহ ও যিকর পাঠ করতেন। যার ফযীলত ও গুরুত্ব অনেক। এগুলি পরকালে নেকীর পাল্লাকে ভারী করবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, দু’টি বিষয় বা দু’টি অভ্যাসের প্রতি যে মুসলিম হেফাযত করবে সে নিশ্চয়ই জান্নাতে যাবে। অভ্যাস দু’টি সহজ কিন্তু তা আমলকারীর সংখ্যা কম। তা হলো (১) প্রত্যেক সালাতের পর দশবার সুবহানাল্লাহ, দশবার আলহামদুলিল্লাহ ও দশবার আল্লাহু আকবার বলবে। মুখে (পাঁচ ওয়াক্ত) এর সংখ্যা একশত পঞ্চাশ। কিন্তু মীযানে তা এক হাযার পাঁচশত (২) যখন শয্যায় যাবে তখন চৌত্রিশবার আল্লাহু আকবার, তেত্রিশবার আলহামদুলিল্লাহ ও তেত্রিশবার সুবহানাল্লাহ বলবে। তা মুখে একশত। কিন্তু মীযানে এক হাযার। আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে তা হাতের আঙ্গুলে গণনা করতে দেখেছি। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! অভ্যাস দু’টি সহজ হওয়া সত্ত্বেও এর আমলকারীর সংখ্যা কম কেন? তিনি বললেন, তোমরা বিছানায় ঘুমাতে গেলে শয়তান তোমাদের কোন লোককে তা বলার আগেই ঘুম পাড়িয়ে দেয়। আর সালাতের মধ্যে শয়তান এসে তার বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং সে ঐগুলো বলার আগেই প্রয়োজনের দিকে চলে যায়।’(আবু দাউদ হা/৫০৬৫; মিশকাত হা/২৩০৬)

(৭). সন্তানের মৃত্যুতে ধৈর্য ধারণ করা ও সওয়াব কামনা করা: দুনিয়াতে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি মানুষের সর্বাধিক প্রিয় বস্ত্ত। তাই ধন-সম্পদ নষ্ট হলে কিংবা সন্তান-সন্ততি মারা গেলে মানুষ ভেঙে পড়ে। অনেক সময় দিশাহারা হয়ে যায়। কিন্তু মুমিন সকল বিপদ-মুসিবতে আল্লাহর উপরে ভরসা রাখে। বিপদকে সে গোনাহ মাফের মাধ্যম হিসাবে কল্যাণকর জ্ঞান করে। তেমনি সন্তানের মৃত্যুতেও ধৈর্য ধারণ করে। আর এর ফলে সে অশেষ সওয়াবের অধিকারী হয় এবং তার নেকীর পাল্লা ভারী হয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘পাঁচটি জিনিসের জন্য বাহঃ বাহঃ। যা দাঁড়িপাল্লায় অধিক ভারী হবে। তাহলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার, সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ (বলা) এবং সৎ সন্তানের মৃত্যুর পরে পিতার সওয়াব কামনা করা।(মুসনাদে আহমাদ হা/১৮১০১; সহীহাহ হা/১২০৪; সহীহুল জামে‘ হা/২৮১৭)
.
পরিশেষে বলব, যেসব আমলের মাধ্যমে পরকালীন জীবনে নেকীর পাল্লা ভারী হবে সেগুলো বেশী বেশী সম্পাদন করে জান্নাতের পথ সুগম করা প্রতিটি মুসলমানের অবশ্য করণীয়। পক্ষান্তরে যেসব আমল নেকীর পাল্লা হালকা করবে এবং গোনাহের পাল্লা ভারী করবে সেগুলো থেকে বিরত থেকে নাজাতের পথ সুগম করা মুমিনের কর্তব্য। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তাওফীক্ব দান করুন। আমীন! (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)
___________________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।