কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক বার্তা প্রচার করাই এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

বিবাহের জন্য প্রস্তাবকৃত পাত্র/পাত্রী দ্বীনদার কিনা সেটি বুঝার উপায়

ভূমিকা: বিবাহ মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ। মহান আল্লাহ তায়ালা নারীর প্রতি পুরুষের তীব্র আকর্ষণ আর পুরুষের প্রতি নারীর তীব্র আকর্ষণ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। নারী পুরুষ প্রত্যেকেই একে অপরের মুখাপেক্ষী। পুরুষ যেমন তার যৌন চাহিদা পূরণের জন্যে নারীর প্রতি মুখাপেক্ষী, অনুরূপ নারীও তার যৌন চাহিদা পূরণের জন্যে পুরুষের প্রতি মুখাপেক্ষী। উভয়ের এ চাহিদা পূরণের জন্যে হালাল পন্থা অবলম্বন করাকে বিয়ে বলে। বিয়ে হলো আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে বান্দার জন্যে উৎকৃষ্ট একটি নেয়ামত। কিন্তু সঠিকভাবে পাত্র-পাত্রী নির্বাচন না করতে পারলে বিবাহিত জীবন হয়ে উঠে বিষাদময়। সেজন্য বিবাহের পাত্র-পাত্রী নির্বাচন করতে হবে সঠিকভাবে। বিয়ে যেহেতু একটি পবিত্র বন্ধন ও ধর্মীয় বিধান সেহেতু ইসলামের দৃষ্টিতে বিয়ের পাত্র-পাত্রী নির্বাচন করার যে বিধিনিষেধ রয়েছে সেগুলো ফলো করা উচিত। সাধারণতঃ মানুষ তার ভাবী-সঙ্গিনীর প্রভাব-প্রতিপত্তি, মান-যশ-খ্যাতি, ধন-সম্পদ, কুলীন বংশ, মনোলোভা রূপ-সৌন্দর্য প্রভৃতি দেখে মুগ্ধ হয়ে তার জীবন-সঙ্গ লাভ করতে চায়; অথচ তার আধ্যাত্মিক ও গুণের দিকটা গৌণ মনে করে। যার ফলে দাম্পত্যের চাকা অনেক সময় অচল হয়ে রয়ে যায় অথবা সংসার হয়ে উঠে তিক্তময়। কিন্তু জ্ঞানী নারী-পুরুষরা এই বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখে। পাত্র/পাত্রী আসলেই ভালো ও দ্বীনদার কি না, সেটি যাচাই করার জন্য কিছু বৈশিষ্ট্য আজকের পর্বে আমরা তুলে ধরার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ। যেমন:
.
(১). কোন একজন ব্যক্তিকে চেনার অন্যতম উপায় হলো তার বন্ধু/বান্ধবীকে চেনা। কারণ, মানুষ সে ধরনের লোককেই ফ্রেন্ড বানায়, যাকে সে ভালোবাসে এবং যার আচরণ ও চলাফেরায় সে মোটাদাগে সন্তুষ্ট। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন— ‘ব্যক্তি তার বন্ধুর চালচলন অনুসরণ করে। সুতরাং, তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ করে,সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে!’’ (ইমাম তিরমিযী ২৩৭৮,আবূ দাঊদ ৪৮৩৩, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৯২৭, হাদিসটি হাসান)। হাদীসের ব্যখ্যায় ইমাম গাযালী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ লোভী ব্যক্তির সাথে উঠাবসা করলে নিজের লোভও বৃদ্ধি পায়। আর দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তির সাথে চলাফেরা করলে দুনিয়ার প্রতি নিজের আকর্ষণ কমে আখিরাতের কথা বেশি মনে হয়। এর কারণ হলো কারো অনুসরণ করাটা নিজের জ্ঞানকে সেদিকেই নিয়ে যায়। অনুসরণকারী তার অনুসরণীয় ব্যক্তির প্রতি ভক্তির কারণে নিজের চিন্তাশক্তিকে হারিয়ে ফেলে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ হা/৫০১৯ ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য)। সুতরাং, পাত্র/পাত্রী কাদের সাথে ঘনিষ্ঠ, সেদিকে খেয়াল করুন। তাদের খোঁজ নিন। তাহলে ২+২=৪ মেলানো অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে। তবে হ্যাঁ, কিছু ব্যতিক্রম থাকবেই।
.
(২). পাত্র/পাত্রী কোন পরিবেশে বেড়ে উঠেছে সেই এলাকায় বা হোস্টেল, আবাসিক হল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইত্যাদি জায়গাতে খোঁজ নিলে প্রকৃত অবস্থা অনেকটাই বুঝা যায়। কারণ, এসব স্থানে সে চাইলেও মুখোশ পরে থাকতে পারবে না। তার প্রকৃত অবস্থা লোকজন জানবেই। বিশেষ করে রুমমেট বা ক্লাসমেটদের কাছ থেকে সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম আলেম শাইখ ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: মেয়ের অভিভাবকের উপর ফরজ হচ্ছে- প্রস্তাব দেয়া ছেলের দ্বীনদারি ও চারিত্রিক বিষয়ে খোঁজ-খবর নেয়া। যদি ভালো তথ্য পাওয়া যায় তাহলে বিয়ে দিবে। আর যদি বিরূপ তথ্য পাওয়া যায় তাহলে বিয়ে দেয়া থেকে বিরত থাকবে। যদি আল্লাহ দেখেন যে, এই অভিভাবক শুধু দ্বীনদারি ও চারিত্রিক কারণে এই ছেলের কাছে বিয়ে দেয়নি তাহলে তিনি অচিরেই তার মেয়ের জন্য দ্বীনদার ও চরিত্রবান ছেলের ব্যবস্থা করে দিবেন।(শাইখ উসাইমীন (রহঃ) এর নুরুন আলাদ দারব ফতোয়া সংকলনে; বিবাহ/পাত্র নির্বাচন/প্রশ্ন নং-১৬ ইসলামি সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১০৪০৫৪)
.
(৩). স্থানীয় মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন থেকে ধারণা নেওয়া: ইমাম শব্দের অর্থ নেতা। তিনি মাননীয় ও অনুসরণীয়। সালাত আদায়ে তিনি নেতৃত্ব দেন। সকল শ্রেণীর মুসল্লী তার নেতৃত্বে সালাতে রুকু সিজদা দেন, উঠেন ও বসেন। তার তাকবীর ধ্বনি শুনে সকলে তার অনুকরণ ও অনুসরণ করেন, কেউই তা লঙ্ঘন করে না। সুতরাং, স্থানীয় মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনের কাছ থেকে পাত্রের ব্যাপারে সঠিক ধারণা পাওয়া যাবে। কারণ, মসজিদের সাথে একটি ছেলের সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ।কেননা দ্বীনদার ছেলেরা মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে সালাত আদায় করার চেষ্টা করে।
.
(৪). পাত্রী চেনার ক্ষেত্রে খুব ভাল একটি উপায় হতে পারে, পাত্রীর মা। কারণ পাত্রীর চরিত্র দেখার আগে তার বাপ-মায়ের চরিত্রও বিচার্য। কারণ, সাধারণতঃ ‘আটা গুণে রুটি আর মা গুণে বেটি’ এবং ‘দুধ গুণে ঘি ও মা গুণে ঝি’ হয়ে থাকে। আর ‘বাপকা বেটা সিপাহি কা ঘোড়া, কুছ না হো তো থোড়া থোড়া।’ সুতরাং, শাশুড়ীর দ্বীনদারি ও আচরণের ব্যাপারে ভালো করে জানা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মেয়েরা বাসায় মায়ের দ্বারা যথেষ্ট প্রভাবিত হয়। ধরুন, খোঁজ নিয়ে দেখলেন, মেয়ের বাবার উপর মেয়ের মা খবরদারি করে, প্রেশারে রাখে, তুচ্ছজ্ঞান করে, এমতাবস্থায় এটার সম্ভাবনা আছে যে, মেয়েটি এসব দেখে অভ্যস্ত হয়ে ভেবেই নিয়েছে—পরিবারের কর্তা (বাবা) বিশেষ কেউ না; তার নির্দেশনা বা অভিভাবকত্ব তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। তবে, অবশ্যই সবাই একরকম না। অনেক মেয়ে এগুলো দেখার পরও এসবে প্রভাবিত হয় না, এটাও বাস্তব সত্য।
.
(৫). বাবা-মা ও পরিবারের লোকদের সাথে পাত্র/পাত্রীর আচরণ ও সম্পর্ক যাচাই করতে পারলে, সেটি দিয়েও অনেক কিছু অনুমান করা সম্ভব, ইনশাআল্লাহ। কারণ, এই লোকগুলোর সাথে ব্যক্তির আসল চরিত্র প্রকাশিত হয়। তাই, এঁদের সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘সর্বোত্তম ব্যক্তি সে-ই, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের চেয়ে উত্তম ব্যক্তি।’’ (ইমাম তিরমিযি হা/৩৮৯৫, দারিমী ২২৬০, ইমাম ইবনু মাজাহ, আস-সুনান: ১৯৭৭; হাদিসটি সহিহ)
.
(৬). উমর (রা.)-সহ বিভিন্ন জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছেন, কয়েকটি সময় একজন ব্যক্তিকে প্রকৃত অর্থে চেনা যায়। সেগুলো হলো: (১). তার সাথে দীর্ঘ ও কষ্টকর সফর করলে, (২). তার সাথে লেনদেন করলে, (৩). তার সাথে রাগারাগি হলে এবং (৪). তার প্রতিবেশী হলে। এবার খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন—পাত্র-পাত্রীর সাথে এ ধরনের অভিজ্ঞতা যাদের সাথে আছে, তাদের মন্তব্য কী!
.
(৭). তাছাড়া কনে দেখার সময় সামনাসামনি বর এবং কনে একে অপরকে কিছু প্রশ্ন করতে পারে। এগুলোর উত্তরের মাধ্যমেও ব্যক্তির ব্যাপারে কিছুটা হলেও ধারণা পাওয়া সম্ভব। বিশেষ করে যেসব বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতে পারে: জীবনের উদ্দেশ্য কী, বিয়ে কেন করতে চায়, আল্লাহ আমাদেরকে কেন সৃষ্টি করেছেন? আল্লাহ তার রাসূল ﷺ ফিরিস্তা আখিরাত, ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের বিশুদ্ধ আক্বীদা কেমন হবে? মাহরাম এবং নন-মাহরাম মেন্টেইন করে চলে কি না, সপ্তাহে কয় দিন কুরআন পড়ে, প্রতিদিন বারো অথবা দশ রাকাআত সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ আদায় করে কি না, (কনের ক্ষেত্রে) স্বামীর আনুগত্যের ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গি এবং স্বামীর আনুগত্যের সর্বোচ্চ সীমারেখা জানে কি না ইত্যাদি। তবে, অনেক মানুষ এ সময় নার্ভাস ফিল করে আর অনেকে স্বভাবসুলভ বাকপটুতা দেখাতে পারে। তাই, এ বিষয়টা মাথায় রাখা জরুরী। হাদীসে ভাগ্যবান নারী পুরুষ সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আ’নহুমা বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, আমি কি তোমাদেরকে জান্নাতী পুরুষ কারা সেই কথা বলে দেব না? – নবী জান্নাতী, – সিদ্দীক্ব জান্নাতী,- শহীদ জান্নাতী, – শিশুরা জান্নাতী এবং – যে ব্যক্তি শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে শহরের অন্য প্রান্তে থাকা কোন (মুসলিম) ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করতে যায় সে জান্নাতী। আর তোমাদের নারীদের মধ্যে জান্নাতী রমণীগণ হচ্ছে যারা স্বামীর প্রতি প্রেমময়ী ও অধিক সন্তান প্রসবকারিণী। স্বামী ক্রদ্ধ হলে সে এসে স্বামীর হাতে হাত রেখে বলে, আপনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আমি ঘুমাব না।’(সহীহুল জামে হা/২৬০৪; সিলসিলা সহীহাহ হা/২৮৭)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, এই আমার হাত আপনার হাতের মধ্যে রাখছি, আপনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আমি চোখে মুদিত করব না।’ অর্থাৎ আমি ঘুমাব না, আরাম-আয়েশ করব না। (সূরা আন-নিসার ৩৪-নং আয়াতের তাফসীর সিলসিলা সহীহা হা/৩৩৮০; সহীহ আত-তারগীব হা/১৯৪১)
.
পরিশেষে, আমার পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই বিবাহের পূর্বে ভালরূপে ভেবে নিনঃ- আপনি কি ভালোবাসার মর্মার্থ জানেন? কেবল যৌন-সুখ লুটাই প্রকৃত সুখ নয়—তা জানেন তো? আপনি কি আপনার তাকে সুখী ও খুশী করতে পারবেন? আপনি তাকে চিরদিনের জন্য নিজের অর্ধেক অঙ্গ মনে করতে পারবেন? আপনার স্বাস্থ্যরক্ষার চেয়ে দাম্পত্য-সুখ রক্ষা করতে কি অধিক সচেষ্ট হতে পারবেন? আপনাদের উভয়ের মাঝে কোন ভুল বুঝাবুঝির সময় সন্ধির (মিমাংসার) উদ্দেশ্যে একটুও নমনীয়তা স্বীকার করতে পারবেন তো? বিবাহ আপনার বহু স্বাধীনতা হরণ করে নেবে, সে কথা জানেন তো? দাম্পত্য কেবল কয়েক দিনের সফর নয় তা জানেন তো? বলা বাহুল্য, বিবাহ কোন মজার খেলা নয়। বিবাহ কাঁধের জোঁয়াল। বিবাহ একটি সামাজিক অনুষ্ঠান, যা ইসলামী শরী‘আত কর্তৃক নির্দেশিত। এতে পার্থিব ও পরকালীন কল্যাণ রয়েছে। কিন্তু তা পূর্ণ ইখলাস সহকারে শরী‘আতসিদ্ধ পন্থায় সম্পন্ন হতে হবে। অন্যথা তা ইহকালে যেমন কল্যাণ বয়ে আনবে না; পরকালেও কোন সওয়াব বা বিনিময় পাওয়া যাবে না। তাই এ বিষয়ে সকলকে সজাগ ও সচেতন হ’তে হবে। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন- আমীন! কিছু বিষয় সংকলিত। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)
___________________________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।