কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক বার্তা প্রচার করাই এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

পাত্র-পাত্রী দুজনের মধ্যে কারও যদি খারাপ অতীত থাকে তাহলে সেটি বলতে কি সে বাধ্য কিংবা বিয়ের পর সেটি জেনে গেলে করণীয় কি

ভূমিকা: মানুষের অন্তর মন্দপ্রবণ। আর যে কাজে তাকে নিষেধ করা হয়, সে কাজের প্রতি সে প্রলুব্ধ হয়। ফলে সে সর্বদা ছোট-বড় পাপ করতেই থাকে। মানুষ যেমন ভুলের উর্ধ্বে না, তেমন পাপেরও উর্ধ্বে না। প্রত্যেক ব্যক্তি ছোট-বড় কোন না কোন পাপের সাথে জড়িত। কারণ হলো, মানুষের ভেতর মানবিক দূর্বলতা সৃষ্টিগত। আমরা জানি হক্ব হলো দুই প্রকার: (১). আল্লাহর হক্ব (২). বান্দার হক্ব। মানুষ এই দুই হক্ব নষ্ট করার কারণেই পাপী হয়ে থাকে। যেমন: যেনা-ব্যভিচার, সুদ-ঘুষ, মদ-জুয়া, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই-রাহাজানি, খুনাখুনি, মিথ্যা বলা, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, চোগলখোরী করা, গালিগালাজ, আত্মসাৎ করা ইত্যাদি অপকর্মের সাথে জড়িত থাকা এবং ফরয ইবাদত থেকে বিমুখতার কারণে মানুষ পাপী হয়ে থাকে। মহান আল্লাহ মানুষের ও বিশ্বচরাচরের সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা, তিনিই আমাদের রূযীদাতা, রোগ ও আরোগ্যদাতা, জীবন ও মরণদাতা, এ বিশ্বাস দৃঢ়ভাবে পোষণ করা। তিনি যেমন মহা ক্ষমাশীল, তেমনি দ্রুত প্রতিশোধ গ্রহণকারী, এ আকাংখা ও ভয় সর্বদা লালন করা, সাথে সাথে প্রতিটি কর্মের হিসাব আল্লাহর কাছে দিতে হবে, সর্বদা এ দায়িত্বানুভূতি অন্তরে লালন করা প্রতিটি মুসলিম নর-নারীর অপরিহার্য কর্তব্য।
.
আমাদের সবার জানা উচিত দোষে-গুণেই মানুষ। আল্লাহর বিশেষ বান্দারা ছাড়া কেউ দোষের ঊর্ধ্বে নয়। হাদিসেও এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রত্যেক আদম সন্তানই পাপী। আর উত্তম পাপী হলো সে ব্যক্তি যে (গুনাহ করে) তওবা্ করে। (ইমাম তিরমিযী ২৪৯৯, সনদ হাসান)। এই হাদীসটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে মানুষ অনিবার্যভাবে গুনাহ করবে, কিন্তু তার পরে সে তার পাপের বিষয়ে কী করে তা গুরুত্বপূর্ণ। মুমিন তার সমস্ত পাপ থেকে আল্লাহর কাছে তাওবা করে, সেগুলি পরিত্যাগ করে এবং প্রতিবার পাপ করার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং সে এটি করার জন্য অনুতপ্ত হয় এবং আবার না করার জন্য আন্তরিকভাবে সংকল্প করে তওবা-ইস্তেগফার করে। মহান আল্লাহ বলেন- বল, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গোনাহ মাফ করে দিবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল ও দয়াবান।’(সূরা যুমার; ৩৯/৫৩)। ইমাম ইবনে কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ্) বলেন, এটি সকল গুনাহের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যে কেউ কুফরী কর্ম করল বা শিরক করল, সন্দেহ পোষণ করল, মুনাফিক্বী করল, মানবহত্যা করল, কোন ফাসিকী কর্ম করল কিংবা অনুরূপ কোন পাপ করল, অতঃপর এগুলো থেকে তওবা করল, আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন। [তাফসীর ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য]। সুতরাং নিজের কৃত পাপসমূহ আল্লাহর নিকটে উপস্থাপন করে নত শিরে ভবিষ্যতে পাপ না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে ইখলাছের সাথে আল্লাহর নিকটে তাওবা করলে তিনি তাওবা কবুল করবেন ইনশাআল্লাহ। আজকের পর্বে আমাদের আলোচনার বিষয় হল: বিবাহের জন্য প্রস্তাবিত পাত্র-পাত্রীর কারও যদি ‘খারাপ অতীত’ থাকে, তাহলে সেটি বলতে সে বাধ্য কিনা কিংবা বিয়ের পর এটি জেনে গেলে করণীয় কি?
.
(১). প্রথম কথা হল, কখনও মানুষের কাছে তার গোনাহের ব্যাপারে প্রশ্ন করতে নেই। এটা অভদ্রতা এবং ইসলামী ম্যানার ও শালিনতার লঙ্ঘন। সুতরাং কেউ তার হবু বর/কনেকে এ ধরনের প্রশ্ন করে বিব্রত করবে না। এমনকি, কোনো মানুষকেই না। মহান আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজিদে বলেন—‘‘মন্দ কথার প্রকাশ আল্লাহ পছন্দ করেন না, কেবল যার উপর জুলুম করা হয়েছে (তার ব্যাপারটি ভিন্ন)।’’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৪৮)। উক্ত আয়াত প্রমাণ করে কারো মধ্যে যদি কোন ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়, তাহলে তার প্রকাশ্যে সমালোচনা না করার প্রতি শরীয়তে খুবই কঠোর ভাবে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, বরং তাকে নির্জনে বুঝাতে বলা হয়েছে। কিন্তু যদি ধর্মীয় কোন কল্যাণ থাকে, তাহলে প্রকাশ্যে সমালোচনা করায় কোন অসুবিধা নেই। এমনিভাবেই জনসমক্ষে প্রকাশ্যে কোন কুকর্ম করা নিতান্ত অপছন্দনীয়। একে তো কুকর্মে লিপ্ত হওয়াটাই নিষিদ্ধ, যদিও তা পর্দার অন্তরালে হয়, তার উপর সেটা জনসমক্ষে প্রকাশ্যে করা অতিরিক্ত আর একটি অপরাধ। আর তার জন্য ঐ কুকর্মের অপরাধ দ্বিগুণ হতে পারে। উক্ত দুই ধরনের অপরাধের কথা এই আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে। আর তাতে এটাও বলা হয়েছে যে, কারো কৃত বা অকৃত অপরাধের কারণে তাকে প্রকাশ্যে ভৎর্সনা করো না। অবশ্য যালেমের যুলুমের কথা জনসমক্ষে বর্ণনা করার ব্যাপারটা ব্যতিক্রম।
.
(২). নিজের গুণাহের কথা মানুষকে বলা নিষেধ। নিজের গুণাহ প্রকাশ করাকে আরবীতে মুজাহারা বলা হয়। মুজাহারা হলো এমন কোনো পাপ, যা প্রকাশ্যে করা হয় অথবা গোপনে পাপ করার পরে তা সকলের কাছে প্রকাশ করে দেওয়া হয়। আর ইসলামী শরীয়তে
নিজের গুনাহের কথা অন্যকে বলা নিষেধ। কারণ মূলনীতি হল, নিজের পাপকর্ম গোপন করা ওয়াজিব, এবং একজন ব্যক্তি যেন নিজেকে প্রকাশ না করে যখন আল্লাহ তাকে গোপন করেন; দোষ আড়াল করে রাখা আল্লাহর অন্যতম অনুগ্রহ ও দান। দোষ ঢেকে রাখাটা শোভা ও সৌন্দর্য, উজ্জ্বলতা ও মহত্ত্ব। উত্তম চরিত্রের দাবি হলো নিজের গুনাহের কথা গোপন রাখা এবং কথাচ্ছলে কারও কাছে প্রকাশ না করা। সুতরাং, ভালোমানুষী দেখিয়ে বিয়ের আগে নিজের খারাপ অতীত বলতে যাবেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘আমার সকল উম্মাতকে মাফ করা হবে, তবে মুজাহিররা (গুনাহ প্রকাশকারী) ব্যতীত। আর নিশ্চয় এটি খুবই অন্যায় যে, কোনো লোক রাতের বেলা (গোপনে গোনাহের) কাজ করলো। এরপর সে সকাল করলো এমতাবস্থায় যে, আল্লাহ সেটি ঢেকে রাখলেন। কিন্তু সে বলে বেড়াতে লাগলো, ‘হে অমুক! আমি আজ রাতে এই এই কাজ করেছি।’ অথচ সে এমন অবস্থায় রাত কাটিয়েছিলো যে, আল্লাহ তার কাজটি ঢেকে রেখেছিলেন, আর সে সকালে তার উপর আল্লাহর দেওয়া আবরণ খুলে ফেললো। (ইমাম বুখারী, আস-সহিহ: ৬০৬৯ ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ: ২৯৯০)
.
(৩). বিয়ের আগে যদি হবু বর অথবা কনে অতীতের ব্যাপারে প্রশ্ন করে, তবে কি তাকে সেটি বলতে হবে? এর জবাবে আহালুল আলেমগন বলেছেন, এই প্রশ্নের উত্তরে তাকে অতীতের কথা জানানো বাধ্যতামূলক নয়, যদি সে সেই গুণাহ থেকে আন্তরিকভাবে তাওবাহ করে থাকে। তাহলে এই সময়ে তার নিজের গোপনীয় পাপ প্রকাশ করা উচিত নয়। বরং আল্লাহ যেভাবে চান সেভাবেই তার এগিয়ে যাওয়া উচিত। হয়তো আল্লাহ তার পাপ গোপন রাখবেন ইনশাআল্লাহ। (ইসলামি সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং ৮৪০৩৮)। আরো বিস্তারিত জানতে স্বনামধন্য দুটো ফাতাওয়া অথরিটি দেখতে পারেন islamqa(.)info এবং islamqa(.)org (দারুল ইফতা বার্মিংহাম দেখুন)
.
(৪). বিয়ের পর যদি স্বামী/স্ত্রী একে অন্যকে অতীতের পাপকর্ম সম্পর্কে প্রশ্ন করে, তাহলেও সেটি স্বীকার করার বাধ্য-বাধকতা নেই, যদি সেই গুনাহ থেকে আন্তরিকভাবে তাওবাহ করা হয়ে থাকে। বরং এক্ষেত্রে জরুরি হলো, কল্যাণকর কাজের স্বার্থে সে চাইলে সাময়িকভাবে মিথ্যার আশ্রয় নিতে পারে কেননা ইসলামি শরীয়তে তিনটি ক্ষেত্রে মিথ্যা কথা বলার অনুমতি রয়েছে। তাই অন্তর থেকে অনু সুচনা করে স্বামী বা স্ত্রী একে অপরকে এই বলে মিথ্যা বলা যে, তার কোনো খারাপ অতীত ছিলো না। এ ব্যাপারে বিশুদ্ধ হাদিস আছে যে,স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে সন্তুষ্ট করতে মিথ্যা বলতে পারবে। (ইমাম তিরমিযি, আস-সুনান: ১৯৩৯; ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ: ৬৫২৭ মিশকাতুল মাসাবিহ হা/৫০৩৩) তবে জেনে রাখা ভালো যে, এই মিথ্যার সুযোগ নিয়ে অন্যায় করা, জুলুম করা বা বিশ্বাসঘাতকতা করা অথবা কোনরূপ হীন স্বার্থে মিথ্যা বলা যাবে না। কারণ মিথ্যা বলা মহাপাপ। আল্লাহ বলেন, তোমরা মিথ্যা কথা থেকে বেঁচে থাক’। (সূরা হজ্জ ২২/৩০)
.
(৫). বিয়ের আগে যদি বর অথবা কনে জেনেই যায় যে, তার হবু বর/কনের একটা অতীত আছে, তাহলে তার কী করণীয়? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো, এই বিষয়টি একান্তই তার ইচ্ছার সাথে সম্পর্কিত। যদি তার হবু বর/কনে ইতোমধ্যে তাওবাহ করে থাকে, তাহলে সে বিয়ের দিকে আগাতে পারে। আবার তার রুচি না হলে বাদও দিতে পারে। বিশেষ করে, যে ছেলে/মেয়ের অতীত রিলেশন থাকে, সে সম্পর্কের ব্যাপারে অনেক বেশি এক্সপেরিয়েন্সড হয়। ফলে তার আচরণে একটা গাম্ভীর্য থাকে, সতর্কতা থাকে, মার্জিন থাকে। অন্যদিকে, যে এসবে কখনও জড়ায়নি, তার মধ্যে থাকে সরলতা, স্বতঃস্ফূর্ততা এবং উচ্ছ্বাস। সুতরাং এই দুটোর মাঝে মনঃস্তাত্ত্বিক কোনো দ্বন্দ্ব হলে হতেও পারে। তবে, এসব তত্ত্বকথা সবক্ষেত্রে সমান হয় না। বরং উল্টোটাও হয় অনেকের ক্ষেত্রে। আমাদের মূল কনসার্ন হওয়া উচিত—একজন ব্যক্তির বর্তমান অবস্থা কী—সে বিষয়ে সঠিকভাবে অবগত হওয়া। বিশেষ করে, কেউ যদি তাওবাহ করে, তাহলে তার অতীত টেনে তাকে কষ্ট দেওয়া জায়েয নেই। হাদিসে এসেছে, ‘‘অনুতপ্ত হওয়াই (প্রকৃত) তাওবাহ। গুনাহ থেকে তাওবাহকারী সেই ব্যক্তির মতো, যার কোনো গুনাহই নেই।’’(ইমাম ইবনু মাজাহ, আস-সুনান: ৪২৫০ ও ৪০৫২; শায়খ আলবানি, সহিহুল জামি’: ৬৮০৩; হাদিসটি হাসান)
.
(৬). আমরা অনেক সময় বলি, বর্তমান যুগটি ফিতনার যুগ। কথাটা অবাস্তব নয়। ফিতনা যদিও সব যুগেই ছিল, কিন্তু নবী রাসূলের -যুগ থেকে দূরত্ব যত বাড়ছে ফিতনার অন্ধকারও ততই বাড়ছে। সুতরাং বর্তমান আধুনিক জামানায় এত ফিতনার মাঝেও যে নারী-পুরুষ নিজেকে অনেক কষ্টে পবিত্র রেখেছে, সে তো তার মতো কাউকে চাইতেই পারে। এটাতে অন্যায়ের কিছু নেই। একদিকে কারও ‘খারাপ অতীত’ জানতে চাওয়ার সুযোগ নেই, অন্যদিকে নিজের মতো পরিচ্ছন্ন অতীতের কাউকে পাওয়ার তীব্র বাসনা—এর সমাধান কী? এই প্রশ্নের উত্তরে বলবো: কেউ তার অতীতের ভুলের জন্য তাওবাহ করে, অনুশোচিত হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার পরও যদি কারও ‘খারাপ অতীত’ আপনি মানতে না পারেন, তাহলে তার সাথে বিয়ের কথা বলার সময় সরাসরি বলে দিন এটা, যাতে সে সহজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তাহলে হয়তো সে যেকোনো কারণ দেখিয়ে বিয়ের আলোচনা থামিয়ে দিতে পারে (নিজের খারাপ অতীত শেয়ার করবে না; করা উচিতও না, বরং অন্য কোনো কারণ দেখাবে)। মূলকথা, বিয়ের আলোচনার সময়ই এসব বিষয় শেষ করে ফেলতে হবে। বিয়ের পর যদি এসব নিয়ে ওঠতে-বসতে কথা শোনান, খোঁটা দেন, তাহলে সেটি হবে চরম অভদ্রতা আর ছোটলোকী। আর হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘মু’মিন খোঁটা দানকারী, অভিশাপকারী, নির্লজ্জ ও অশ্লীল-ভাষী হয় না।’’(ইমাম তিরমিযী ১৯৭৭, মুসনাদে আহমাদ ৩৮২৯, ৩৯৩৮) আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন- আমীন! কিছু বিষয় সংকলিত। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)
___________________________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।