কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক বার্তা প্রচার করাই এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

কেমন মেয়ে বিয়ে করবেন এবং এ ব্যাপারে ইসলামী শরীয়তের নির্দেশনা

ভূমিকা: প্রত্যেকটি জিনিসের ভাল ও মন্দ গুণাগুণ রয়েছে। এই গুণাগুণগুলিকে সে জিনিসের বৈশিষ্ট্য বলা হয়। বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহ্‌ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর পক্ষ থেকে মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু উত্তম আদর্শ রয়েছে। সেগুলিই হচ্ছে আদর্শ নারীর বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্যগুলি যে নারীর মধ্যে থাকবে সে-ই ইসলামের দৃষ্টিতে আদর্শ নারী বলে বিবেচিত হবে। অতএব, বিশ্বের মুসলিম নারীদের শিক্ষার লক্ষ্যে আদর্শ নারীর কিছু বৈশিষ্ট্য নিম্নে আলোকপাত করা হলো। রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘সম্পূর্ণ দুনিয়া হচ্ছে সম্পদ। আর দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সম্পদ হচ্ছে সতী-সাধবী নারী’(বুখারী, মুসলিম,বাংলা মিশকাত হা/২৯৪৯)। মুমিনা হওয়ার পরও নারীর মাঝে যেসব বৈশিষ্ট্য থাকলে তাকে উত্তম স্ত্রী হিসাবে গণ্য হয়, তন্মধ্যে কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হল:

(১). সর্বপ্রথম বিশুদ্ধ “ঈমান”:
___________________________
“ঈমান” এমন একটি শব্দ যে মুসলিম হিসাবে সবাই এই শব্দটির সাথে পরিচিত। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে যে আমরা নিজেদেরকে মুসলিম হিসাবে, ঈমানদার হিসাবে দাবী করলেও মূলত ঈমান কাকে বলে, এর দাবী কি এই সব বিষয়ে তেমন কিছুই জানি না। আরবী ‘আমন’ শব্দ থেকে ঈমান শব্দটির উৎপত্তি। আমন (أمن) অর্থ শান্তি, নিরাপত্তা, আস্থা, বিশ্বস্ততা, হৃদয়ের স্থিতি ইত্যাদি। ঈমান শব্দের আভিধানিক অর্থ: নিরাপত্তা প্রদান, আস্থা স্থাপন, স্বীকৃতি প্রদান ইত্যাদি। ঈমান এবং ইসলাম পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। ঈমান ছাড়া যেমন ইসলাম মূল্যহীন তেমন ইসলাম ছাড়া ঈমান মূল্যহীন। একটি ছাড়া অপরটি গ্রহণযোগ্য নয়। ঈমান এবং ইসলাম এই দুটির সমন্বয়ই হচ্ছে ইবাদাত। অর্থাৎ তাওহীদ তথা আল্লাহর তাওহীদের যাবতীয় বিষয়কে অন্তরে বিশ্বাস করা, মুখে স্বীকৃতি দেয়া এবং কাজে বাস্তবায়ন করার নামই ঈমান। নারী-পুরুষের মাঝে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বিবাহ হচ্ছে একমাত্র বৈধ, বিধিবদ্ধ, সর্বজনীন এবং পবিত্র ব্যবস্থা। সুতরাং, বিবাহের জন্য সর্বপ্রথম পাত্র ও পাত্রী উভয়ের ঈমানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাওহীদে বিশ্বাসী, নামাযী এবং সুন্নাতের অনুসারী এমন কারো জন্য বেনামাযী, কবর, মাযার-পীর পূজারী, মনপূজারী অথবা দুনিয়া পূজারী, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র বা প্রচলিত শিরকী-কুফুরীর রাজনীতির সাথে জড়িত এমন কাউকে বিয়ে করা যাবেনা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ঈমান না আনা পর্যন্ত (কাফের/মুশরিক) নারীকে তোমরা বিবাহ কর না, মুশরিক নারী তোমাদেরকে মুগ্ধ করলেও; নিশ্চয় মুমিন ক্রীতদাসী তা অপেক্ষা উত্তম। ঈমান না আনা পর্যন্ত (কাফের/মুশরিক) পুরুষের সঙ্গে তোমরা বিবাহ দিও না, মুশরিক পুরুষ তোমাদেরকে মুগ্ধ করলেও, মুমিন ক্রীতদাস তা অপেক্ষা উত্তম। তারা অগ্নির দিকে আহ্বান করে এবং আল্লাহ‌ তোমাদেরকে নিজ অনুগ্রহে জান্নাত ও ক্ষমার দিকে আহ্বান করেন। তিনি মানুষের জন্য স্বীয় বিধান সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন, যাতে তারা তা হতে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।’ (সূরা আল-বাক্বারাহ ২২১)। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা ঈমানদার নারীদের সম্বোধন করে বলেন, ‘তোমরা কাফির নারীদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক (যা পূর্বে ছিল) বজায় রেখো না।’ (সূরা আল-মুমতাহিনা: ১০)। ইবনু কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) (৭০১-৭৭৪ হি.) উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ‘মুমিন নারীরা কাফিরদের জন্য হালাল নয়। আর কাফিররাও তাদের জন্য হালাল নয়’। এই আয়াতের দ্বারা মুসলিম নারীদেরকে মুশরিকদের জন্য হারাম করা হয়েছে। (তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ৮ম খণ্ড, পৃ. ৯৩)।
.
▪️(২). দ্বীনদার (ধার্মিক মেয়ে):
_______________________________
পৃথিবীতে মুসলমান অনেক ধরণেরই সম্পদ আছে কিন্তু, হাদীসের বর্ননা অনুযায়ী এই পৃথিবীর মাঝে শ্রেষ্ঠ সম্পদ হচ্ছে একজন নেককার স্ত্রী। সম্পদ বা সৌন্দর্যের লোভে বেদ্বীন বা দ্বীনের মাঝে ত্রুটি আছে এমন কাউকে বিয়ে করলে দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জাহানের অনেক কল্যাণ ও শান্তি থেকে বঞ্চিত হতে হবে। পবিত্র কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা‘আলা صَالِحَاتُ তথা দ্বীনদার বা নেককার গুণের অধিকারী হিসাবে নারীকে উল্লেখ করেছেন। (সূরা আন-নিসা : ৩৪)। উক্ত শব্দের ব্যাখ্যায় ইমাম তাবারী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘দ্বীনের সঠিক অনুসরণকারিণী ও সৎকর্মশীল নারীগণ।’(ইমাম ত্বাবারী, জামিঊল বায়ান ফী তা’বীলিল কুরআন, ৮ম খণ্ড, পৃ. ২৯৩)
.
হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘নারীকে বিবাহ করা হয় চারটি বিষয় দেখে। সেগুলো হলো: তার সম্পদ, তার বংশ, তার সৌন্দর্য ও তার ধার্মিকতা বা দ্বীনদারিতা। সুতরাং, তুমি ধার্মিক নারীকেই প্রাধান্য দেবে। (এরপর নবিজি স্নেহপরায়ণ হয়ে বললেন) তোমার উভয় হস্ত ধুলোমলিন হোক (এটা স্নেহার্থে ব্যবহৃত একটি আরবি ইডিয়ম)। (ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ৫০৯০; ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ: ৩৫২৭)
আলোচ্য হাদিসে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানালেন, একজন নারীকে বিবাহের প্রতি অনুপ্রাণিত করে চারটি বিষয়— তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য ও তার ধার্মিকতা। তিনি আরও জানালেন, সেই ব্যক্তিই সৌভাগ্যবান ও সাফল্যের অধিকারী হবে, যে ধার্মিক নারীকে প্রাধান্য দিয়েছে। আল্লামা কুরতুবী (রহঃ) বলেনঃ আলোচ্য হাদীসের অর্থে চারটি বৈশিষ্ট্য যা নারীর বিবাহের প্রতি আগ্রহ যোগায়, তা নির্দেশ বা ওয়াজিব নয়। বরং এ বৈশিষ্ট্যগুলো দেখা বৈধ, তবে দ্বীন-দারিত্ব দেখাটা অধিক অগ্রগণ্য। তিনি আরো বলেন যে, এ হাদীস থেকে এটা মনে করা যাবে না যে, নারী পুরুষের কুফু বা সমতা এ চারটির মধ্যে সীমাবদ্ধ। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫০৯০)
.
▪️(৩). প্রেমময়ী ও অধিক সন্তান-প্রসবা মেয়ে:-
_______________________________________
মা‘ক্বিল ইবনু ইয়াসার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,‘‘তোমরা প্রেমময়ী অধিক সন্তান-প্রসবা নারীকে বিয়ে করো। কেননা, আমি অন্যান্য (নবিগণের) উম্মতের সাথে তোমাদের দ্বারা সংখ্যাধিক্যের গর্ব করবো।’’(ইমাম আবু দাউদ, আস-সুনান: ২০৫০; ইমাম আহমাদ, আল-মুসনাদ: ১৩৫৯৪; হাদিসটি হাসান সহিহ)। আলোচ্য হাদীসে উল্লেখিত الْوَدُودَ (আল ওয়াদূদ) হলো, যে মহিলা তার স্বামীকে বেশী ভালোবাসে তাকে ওয়াদূদ বলা হয়। আর الْوَلُودَ (আল ওয়ালূদ) বলতে সে নারীকে বুঝায়, যে অধিক সন্তান জন্ম দেয়। বিবাহের জন্য পাত্রী যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দু’টো গুণ নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করেছেন। রাসূল (ﷺ) পুরুষদেরকে প্রেমময়ী ও অধিক সন্তান জন্মদানকারী নারীদেরকে বিয়ে করার উৎসাহিত করেছেন, কারণ এর দ্বারা উম্মতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে যা নিয়ে কেয়ামতের দিন রাসূল (ﷺ) গর্ব করবেন। এছাড়া সন্তানদেরকে হাদিসে রিযক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাছাড়া প্রেমময়ী মানুষ স্বামী/স্ত্রীর কাছ থেকে যা কামনা করে, তা না পেলে অনেকেই হারাম কর্মকান্ড পরকীয়ার মত পাপে জড়িয়ে পড়ে। আর এই কুপথে না গেলেও, সারাজীবনের জন্য সেটা একটা অভিশাপ হিসেবেই থেকে যাবে। তাই, নারী পুরুষ উভয়ের উচিত জীবনসঙ্গীর হক্ক পূর্ণভাবে আদায় করার ব্যপারে সজাগ থাকা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দু’টো গুণ নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করেছেন। এর কারণ হলো, অধিক সন্তান জন্মাদানে সামর্থ্যবান নারী যদি প্রেমবিনয়ী না হয়, তবে স্বামী তার দিকে আকৃষ্ট হবে না। আবার প্রেমময়ী নারী যদি সন্তান জন্ম না দিতে পারে তাহলে মূল উদ্দেশ্যই অর্জন হবে না। আর জন্মহার বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি জাতি বৃহৎ জাতিতে পরিণত হতে পারে। উল্লেখিত দু’টো গুণই কুমারী নারীর মাঝে বিদ্যমান বলে জানা যায়। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২০৪৯)
.
প্রশ্ন আসবে, বিয়ের আগে কীভাবে বুঝবো যে, মেয়েটি প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান-প্রসবা? এর উত্তরে হাদিসের ব্যাখ্যায় আব্দুল’আযীম আবাদি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, একজন মহিলা অধিক সন্তান-প্রসবা কিনা তা জানার দুটি উপায় রয়েছে: (১) তার মা, খালা এবং বোনদের দেখে (২) যদি সে আগে বিয়ে করে থাকে; সেটা তার আগের বিয়ে থেকেই জানা যাবে। যদি মেয়েটি বিধবা অথবা তালাকপ্রাপ্তা হয়ে থাকে, তাহলে সহজেই জানা যাবে, তার আগের দাম্পত্য জীবনের ব্যাপারে খোঁজ নিলে। আর যদি কুমারী (অবিবাহিত) হয়, তাহলে সেই মেয়ের নিকটাত্মীয় নারীদের মাধ্যমে অনুমান করবে। যেমন: তার মা, খালা এবং বোন। তাদের সন্তানের সংখ্যা কত লক্ষ করুন, তাদের মধ্যে যদি এই দুটো গুণ থাকে, তাহলে এই মেয়ের মাঝেও এসব গুণ থাকার সম্ভাবনা থাকবে। কোন মেয়ের মা ও খালা যদি অধিক সন্তান জন্মদানকারী হয়ে থাকে, তাহলে আশা করা যেতে পারে সেও অধিক সন্তান জন্মদানকারী হবে। (আব্দুল’আযীম আবাদি ‘আউন আল-মা’বুদ (৪/৩৩) ইসলামি সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং ৩২৬৬৮)।মোটকথা, কিছুটা হলেও বুঝার জন্য এটি মোটাদাগে অনুমান করা। হুবহু মিলে যাবে এমনটি নয়।
.
▪️(৪). কুমারী মেয়ে:
____________________________
নারীদেরকে আল্লাহ তাআ’লা প্রেমময়ী, সহজাত লজ্জাবোধ ও কমনীয়তা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, যা পর্দানশীল কুমারী নারীদের মাঝে সবচাইতে বেশি থাকে। এইজন্য আল্লাহ তাআ’লা জান্নাতী নারীদেরকে চিরকুমারী করে সৃষ্টি করেছেন। নবিজী তাঁর সাহাবীগণের সাথে খুব খোলাখুলি কথা বলতেন। কারণ তিনি তাঁদের অত্যন্ত আপনজন ছিলেন। যেমন: আব্দুর রহমান ইবনু সালিম ইবনু উতবাহ্ ইবনু উওয়াইম ইবনু সা‘ইদাহ্ আল আনসারী তাঁর পিতা, তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘তোমরা কুমারী বিয়ে করবে। কেননা তাদের মুখ মিষ্ট (কামনাপূর্ণ অথবা বাক্যালাপে সুমিষ্ট), তাদের গর্ভ (সন্তানধারণে) অধিক অনুকূল এবং তারা অল্পতেই পরিতুষ্ট থাকে।’’ (ইমাম ইবনু মাজাহ,আস-সুনান: ১৮৬১; আলবানী সহীহ আল জামি‘ ৪০৫৩ মিশকাতুল মাসাবিহ হা/৩৯২ হাদিসটি হাসান)
.
অন্য বর্ণনায় এসেছে, সাহাবি জাবির (রা.) একজন বিধবাকে বিয়ে করেন। তখন নবিজি বলেছিলেন, তুমি যদি কুমারী বিয়ে করতে, তাহলে তার সাথে খেল-তামাশা করতে পারতে আর সেও তোমার সাথে আনন্দ করতে পারতো। (ইমাম বুখারি, আস-সহীহ: ৫০৭৯ ইমাম মুসলিম, আস সহীহ ৭১৫,আবু দাঊদ ২০৪৮ আলবানী, সহীহ আল জামি‘ ৪২৩৩ মিশকাত হা/৩০৮৮)। জবাবে তখন জাবির (রা.) বলেন, আমি এমন একজনকে বিয়ে করতে চেয়েছি, যে হবে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, কারণ আমার বাসায় কয়েকজন বোন আছে। তখন নবীজি বলেন, তাহলে ঠিক আছে। (ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ২৩০৯)
.
আলোচ্য হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুমারী মেয়েকে বিবাহ করার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। কেননা তারা অধিক মিষ্টভাষী হয়ে থাকে, যেমন: মহান আল্লাহ বলেনঃ هٰؤُلَاءِ بَنَاتِي هُنَّ أَطْهَرُ لَكُمْ ‘‘তারা আমার সৃষ্ট কন্যা, তারা তোমাদের জন্য অধিক পবিত্র।’’ (সূরা হূদ ১১/ ৭৮)। তবে জেনে রাখা ভাল যে, কুমারী বিয়ে করতে বলা হয়েছে মানে এই না যে, বিধবা অথবা তালাকপ্রাপ্তা নারী বিয়ে করা যাবে না। আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ সাইয়িবা (তালাকপ্রাপ্তা) মহিলার অন্তর পূর্ব স্বামীর দিকে ঝুকে থাকে বিধায় তার পূর্ণ ভালোবাসা সে দিতে পারে না, যা কুমারী মহিলা দিতে পারে। যেমনটি বর্ণিত রয়েছে, তোমরা কুমারী মহিলা বিয়ে কর, কেননা তারা অধিক প্রেমময়ী। তাছাড়া বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায় সাহাবীগণের সময়ে অনেক বিধবা এবং তালাকপ্রাপ্তা নারীকে বিয়ে করার জন্য পুরুষ সাহাবীগণ প্রতিযোগিতা শুরু করে দিতেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ফাতিমা বিনতে কায়েস নাম্নী একজন বিদূষী নারী সাহাবিয়া ছিলেন। তাঁর স্বামী তাঁকে তালাক দিলে কয়েকজন সাহাবী তাঁর জন্য বিয়ের পয়গাম পাঠান। তখন তিনি নবীজির সাথে পরামর্শ করেন। নবীজি একজনকে এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন যে, তিনি স্ত্রীর উপর খড়গহস্ত ছিলেন। আরেকজনকে প্রত্যাখ্যান করেন তাঁর নিঃস্ব অবস্থার জন্য। (বিস্তারিত জানতে সুনানুন নাসায়ির ৩২৪৫ নং হাদিসটি দেখে নিতে পারেন)। এটি বিশুদ্ধ হাদীস। এমনকি একমাত্র আয়িশা (রা.) বাদে নবীজির সকল স্ত্রীই ছিলেন বিধবা অথবা তালাকপ্রাপ্তা। খোদ নবীজি নিজেই অনেক বিধবা নারীকে বিভিন্ন সাহাবীর সাথে বিয়ে দিয়েছেন। আহালুল আলিমগণ বলেন, সাধারণত কুমারী নারীরা অধিক লাজুক, সরল ও ভালোবাসাপ্রবণ হয়। (তবে এটা ভাবার সুযোগ নেই যে তালাকপ্রাপ্ত নারীরা লাজুক বা সরলমনা হয়না তারাও হয়, তবে কুমারীর তুলনায় কিছুটা কম)। কুমারী জীবনে পূর্বে কোনো পুরুষ না আসায় স্বামীর ব্যাপারে আবেগ-উচ্ছ্বাস বেশি থাকে। পুরুষরা লাজুক ও সহজ-সরল মেয়েদের অধিক পছন্দ করে। যদিও বর্তমান বাস্তবতা বেশ নিদারুণ। পুরুষের সঙ্গ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা কুমারী নারী এখন আগের মতো নেই। আবার নারীসঙ্গ থেকে দূরে থাকা অবিবাহিত পুরুষও কমে গেছে। ভাইস ভার্সা। তাই, নবীজি যে সেন্স থেকে এই প্রসঙ্গে বলেছিলেন, সেটি বর্তমানে কমই প্রতিফলিত হয়। বিধবা নারী অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিধায় বিয়ের ক্ষেত্রে তার সরাসরি মতামত ব্যতীত তাকে বিয়ে দেওয়া যাবে না। অন্যদিকে কুমারী মেয়ে শুধু রাজি থাকলেই যথেষ্ট। এমনকি সে চুপ থাকলে ধরে নেওয়া হবে, সে রাজি। কিন্তু বিধবার ক্ষেত্রে সরাসরি স্পষ্ট অনুমতি লাগবে। (ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ৬৯৬৮)
.
▪️(৫). পর্দানশীল ও বিনয়ী:
_________________________
পর্দা প্রথা ইসলামের এক অমোঘ বিধান। যা নারী-পুরুষ সকল মুমীনের জন্য পালন করা অতীব যরূরী। কেননা পর্দাহীনতার ফলে সমাজে যেনা-ব্যভিচার বৃদ্ধি পায়, নারী নির্যাতন ছড়িয়ে পড়ে। এজন্য সবাইকে পর্দা মেনে চলতে হবে। বিশেষত, নারীদের পর্দা মেনে চলা বাধ্যতামূলক। কেননা বেপর্দা নারী মানেই অহংকারী, অহংকারী কারো জন্য স্বামীর আনুগত্য বজায় রাখা খুবই কষ্টকর, আর এদের মাঝে খুব কম সংখ্যক নারীই জান্নাতে প্রবেশ করবে। অথচ শিক্ষিত/অশিক্ষিত, আলেম হোক আর জালেম হোক, শতকরা ১০০ ভাগ পুরুষ স্ত্রীর কাছ থেকে আনুগত্য কামনা করে, এবং স্ত্রীর অবাধ্যতাকে ঘৃণা করে।“একবার এক সফরে রাসূল (ﷺ) সাহাবাদেরকে নিয়ে একটা পাহাড়ে উঠলেন। সেখানে হঠাৎ তারা একটা কাক দেখতে পেলেন, যার পা ও ঠোট ছিলো লাল। এই ধরণের কাক আসলে খুবই বিরল, দেখতে পাওয়া যায়না বললেই চলে। সাহাবারা এতো বিরল একটা জিনিস দেখে আশ্চর্য হয়ে বলাবলি করতে লাগলেন। রাসূল (ﷺ) তখন বললেন, এইরকম কাকের মাঝে লাল পা ও লাল ঠোটওয়ালা কাক যেমন অত্যন্ত বিরল, তেমনি নারীদের মাঝে যারা বেপর্দা চলাফেরা করবে তাদের মাঝে খুব কম সংখ্যক নারীই জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
.
▪️(৬). “কুফু বা সমতা”:
______________________
আরবি ‘কুফু’ শব্দের অর্থ সমতা, সাদৃশ্য, সমকক্ষতা ইত্যাদি। বিয়েতে বর-কনের মাঝে সমতাবিধানকে আরবিতে ‘কুফু’ বলা হয়। স্বামী-স্ত্রীর বিবাহিত জীবনের দীর্ঘ পথচলা যেন সুখের হয় এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া ভালো হয়, সেজন্য কুফু গুরুত্বপূর্ণ। বিয়ের সময় নারী ও পুরুষের মাঝে অবশ্যই কুফু বা সমতার দিকে লক্ষ্য রাখা উচিৎ। দাড়ী কামাতে অভ্যস্ত, হারাম ইনকাম এমন কোন পুরুষের সাথে যদি ক্বুরানের হা’ফিজাহ কোন নারীকে বিয়ে দেওয়া হয়, আর বিয়ের পরে স্বামী তাকে মডার্ণ ড্রেস পড়তে বাধ্য করে, হিন্দী গান শোনানোর বায়না ধরে তাহলেতো প্রবলেম। আবার কোন নারী যদি বিয়ের পরে যেকোন উপায়ে স্বামীকে অঢেল সম্পত্তি অর্জন করতে চাপ দেয়, দাঁড়ি রাখা যাবেনা বায়না ধরে, মা-বাবার হক্ক আদায়ে বাঁধা দেয়…এই সংসারে আর যাই হোক সুখ নামক অচিন পাখিটা কখনো ধরা দেবেনা। তাই বিয়ের পূর্বে সার্বিক দিক বিবেচনা করে কুফু রক্ষা করা উচিৎ।
.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘‘তোমরা ভবিষ্যতের বংশধরদের জন্য (জীবনসঙ্গী) বাছাই করো, সমতা (কুফু) বিবেচনায় বিবাহ করো এবং বিবাহ দিতেও সমতার প্রতি লক্ষ্য রাখো।’’ (ইমাম ইবনু মাজাহ, আস-সুনান: ১৯৬৮; হাদিসটি হাসান)। কথা হলো: কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে কুফু বিবেচনা করতে হবে? আলিমগণের একটি অংশ চারটি বিষয়কে কুফুর অন্তর্ভূক্ত বলেছেন। সেগুলো হলো: দ্বীনদারি, স্বাধীন হওয়া (ক্রীতদাস না হওয়া), বংশমর্যাদা এবং পেশা। তাঁদের মতে, অতি উচ্চ বংশের কারও সাথে একদম নিচু বংশের কারও বিবাহ না দেওয়া উচিত। এমনকি সাহাবীগণের মাঝেও এসব কারণে অমিল হয়েছে (তবে, সেটি কিছু সাহাবীর ক্ষেত্রে হয়েছে)। যেমন: নবীজির মুক্ত দাস যায়েদ (রা.)-এর সাথে কুরাইশ বংশের রমণী যাইনাব (রা.)-এর বিবাহ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কারণ তাঁদের রুচি ভিন্ন ভিন্ন ছিলো। ইমাম মালিক (রাহ.)-সহ অনেক আলিম কেবল দ্বীনদারির ক্ষেত্রে বর-কনের মাঝে সমতাবিধানকে জরুরি বলেছেন। এই মতটিই সবচেয়ে উত্তম। হাদীসে রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘তোমরা যে ছেলের দ্বীনদারি ও চরিত্রের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হতে পারবে, সে যদি প্রস্তাব দেয়, তাহলে তার কাছে (তোমাদের মেয়েকে) বিয়ে দিয়ে দাও। যদি তা না করো, তবে পৃথিবীতে মহাবিপর্যয় সৃষ্টি হবে।’’ সাহাবীগণ বলেন, ‘যদি তার মাঝে কিছু ত্রুটি থাকে?’ নবীজি তখন আগের কথারই পুনরাবৃত্তি করেন। (ইমাম তিরমিযি, আস-সুনান: ১০৮৫; হাদিসটি হাসান সহিহ)
.
▪️(৭). “ইলম ও আমল”:
______________________
ইসলামের উপর চলতে গেলে যে যেই বিধানের সম্মুখীন হবে তার উপর সে বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করা জরুরী। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘প্রতিটি মুসলিমের উপর জ্ঞান অন্বেষন করা ফরজ।’ (ইবনু মাজাহ, হা/২২৪; মিশকাত, হা/২১৮)। এ হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম বাগাবী (রহ,) বলেন, যে ইবাদত পালন করা শরীআ বান্দার উপর আবশ্যক করে দিয়েছে সে সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা বান্দার উপর ফরজ। যেমন: যাকাত প্রসঙ্গে জ্ঞান অর্জন করা যদি নিসাব পরিমাণ মালের মালিক হয়, হজ্জ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা ফরয, হজ্জে যাওয়া সামর্থ্য হলে। (শারহুস সুন্নাহ, ১/২৯০ পৃ.)। ইলম ছাড়া বিভিন্ন পরীক্ষা বা বিপদ-আপদ ও ফেতনার সময়ে ঈমান নিয়ে টিকে থাকা খুবই কষ্টকর, যা বর্তমান যুগে খুব বেশি অনুভূত হচ্ছে। সঙ্গী/সঙ্গীনীর যদি ইলমের ব্যপারে ত্রুটি থাকে, তাহলে তার প্রভাব আপনার উপরেও পড়বে। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, “একজন মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের উপরেই আছে।” থিওরিটিক্যালি স্বামী/স্ত্রী একজন অপরজনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু হওয়ার কথা। সুতরাং, জ্ঞানী, ইসলামী জীবন-যাপনে আগ্রহী ও অভ্যস্ত এমন কাউকে বিয়ে করতে চেষ্টা করুন যে আপনার দ্বীনের ব্যপারে সাহায্যকারী হবে, বাঁধা হয়ে দাঁড়াবেনা।
.
পরিশেষে, উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা পরিস্কার যে বিবাহের ক্ষেত্রে সর্বদাই নারীদের দ্বীনদারীকেই প্রাধান্য দিতে হবে। আর তার সম্পদ বা প্রেমময়ী হওয়া বা কুমারী হওয়া বা তার সৌন্দর্য এইগুলো অতিরিক্ত। এগুলো বাধ্যতামূলক কিছু নয়। আমরা কেউ যেন এমনটি না ভাবি যে, ইসলাম সম্ভবত বিধবাদের ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা দিয়েছে। বরং হাদীসে এসেছে, যে বিধবাকে সাহায্যের জন্য লেগে থাকে, সে ওই ব্যক্তির মতো, যে রাতভর নামাজ পড়ে অথবা একটানা রোজা রেখে যায়। (ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ৫৩৫৩)। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য বেশিরভাগ পুরুষেরাই কামনা করে সুন্দরী ধনীর কোন দুলালীকে বিয়ে করতে হবে। মনে রাখবেন, আপনি যেমন বীজ বপন করবেন তেমন ফল পাবেন। পরকালের কথা চিন্তা করে কাজ করবেন দুনিয়া ও আখেরাতে জয়ী হবেন, আর দ্বীনকে বিসর্জন দিয়ে শুধু দুনিয়ার আশা করবেন তাহলে দুনিয়া পেতেও পারেন আবার নাও পারেন কিন্তু পরকালকে ধ্বংস করবেন। পরকালের কথা চিন্তা করে কাজ করবেন দুনিয়া ও আখেরাতে জয়ী হবেন। আল্লাহ আমাদের সকলকে ইসলামী পরিবারের অফুরন্ত নেয়ামত দিয়ে ধন্য করুন। আমিন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)
_______________________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।