আরাফা দিবস কোনটি এবং বাংলাদেশ ভারত পাকিস্তানের মুসলিমগন কোন দিন আরাফার সিয়াম পালন করবে

আরাফা দিবস কোনটি? বাংলাদেশ ভারত পাকিস্তানের মুসলিমগন কোন দিন আরাফার সিয়াম পালন করবে? সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে নাকি নিজ দেশের চাঁদের হিসেবে রাখবে? একটি ইনসাফ পূর্ণ দলিল ভিত্তিক পর্যালোচনা।
▬▬▬▬▬▬▬💠💠💠▬▬▬▬▬▬▬
ভুমিকা: শরীয়তের দৃষ্টিতে মুসলিম উম্মার জন্য আরাফার দিন অতি মর্যাদাসম্পন্ন এক দিন। যিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখ-কে আরাফার দিন বলা হয়। আরাফার দিনটিই হজ্জের দিন।হজ্জের মধ্যে হাজীদের অবশ্যই আরাফাতে অবস্থান করতে হবে। যে ব্যক্তি আরাফাতে অবস্থান করতে পারবেনা তার হজ্জ ছুটে যাবে।আর এর পরের দিন অর্থাৎ যিলহজের ১০ তারিখ হলো ঈদের দিন। আরাফার ময়দান সৌদি আরবে হেরেম এলাকার বাইরে অবস্থিত। কাবাঘর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে, মসজিদুল হারাম রোড হয়ে ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।প্রায় ১০.৪ কি.মি. জায়গা জুড়ে বিস্তৃত আরাফার ময়দান। চতুর্দিকে সীমানা নির্ধারণমূলক উঁচু ফলক রয়েছে। আরাফার এ দিনটি অন্যান্য ফযীলতপূর্ণ দিনের চেয়ে বেশি মর্যাদাপূর্ণ। এই দ্বীনের একটি নফল সিয়ামে পূর্বের এক বছরের এবং পরবর্তী এক বছরের সগিরা গুনাহ ক্ষমা করা হয় সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি।
.
◾আমাদের আলোচনার মূল বিষয়: আরাফা দিবস কোনটি? আমরা কোন দিন আরাফার সিয়াম পালন করবো সৌদি অনুযায়ী নাকি নিজ দেশের চাঁদের হিসেবে পুরো বিষয়টি পরিস্কার ভাবে বুঝতে পুরা লিখাটি মনোযোগ সহকারে পড়ার অনুরোধ রইল।
.
◾স্বাভাবিক ভাবে সিয়াম শুরু ও শেষ করার মূলনীতি:
______________________________________
দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমগণ আরাফার সিয়াম কবে রাখবে সেই উত্তর জানার আগে আমরা সিয়াম শুরু করা ও শেষ করার মূলনীতি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি। যেমন, আবূ হুরায়রা (রাদিয়াল্লা-হু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,তোমরা চাঁদ দেখে সিয়াম আরম্ভ করো এবং চাঁদ দেখে সিয়াম শেষ (ঈদ) করো। আকাশ যদি মেঘে ঢাকা থাকে তাহলে শা‘বানের গণনা ৩০ দিন পুরা করো’ (সহীহ বুখারী, হা/১৯০৯;সহীহ মুসলিম, হা/১০৮১)
.
উপরোক্ত এই হাদীসের আলোকে যে মূলনীতি দাঁড়ায় তা হলো— ‘সিয়ামের শুরু ও শেষ চাঁদের উদয়ের উপর নির্ভরশীল’। অর্থাৎ স্থানীয় (নিজ দেশে) চাঁদ দেখে সিয়াম রাখতে হবে এবং চাঁদ দেখে সিয়াম সমাপ্ত করতে হবে। অল্প কিছু লোক ব্যতীত সমগ্র মুসলিম উম্মাহ এই মূলনীতির বিষয়ে মোটামুটি একমত।
.
▪️উক্ত মূলনীতির প্রয়োগ: উপরোক্ত মূলনীতির আলোকে রামাযানের সিয়াম, আইয়ামে বীযের সিয়াম, আশূরার সিয়ামসহ সকল সিয়াম স্থানীয় উদয়স্থলে চাঁদ দেখার ভিত্তিতেই রাখা হয়। ব্যতিক্রম ঘটেছে শুধু আরাফার সিয়ামের ক্ষেত্রে। আরাফার সিয়ামের ক্ষেত্রে আরাফার সিয়াম কবে রাখতে হবে এই মাসয়ালায় আহালুল আলেমগণ দুটি মত দিয়েছেন।
.
▪️➤প্রথম মত: অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম বলেছেন যেদিন হাজীগণ আরাফার মাঠে অবস্থান করবেন, সেদিন আরাফার সিয়াম রাখতে হবে। এর প্রমাণ হিসেবে তারা বলেছেন, আরাফার সিয়াম সম্পর্কে যতগুলো হাদীস এসেছে, সবগুলোতেই বলা হয়েছে,يوم عرفة (আরাফার দিন)। যেহেতু হাদীসে ‘আরাফার দিন’ বলা হয়েছে, يوم التاسع (নবম তারিখ) বলা হয়নি, বিধায় আরাফার সিয়াম ‘তারিখ’ এর সাথে সম্পর্কিত নয়; বরং ‘স্থান’ এর সাথে সম্পর্কিত। আর আরাফা হারামাইনের দেশ সঊদী আরবে অবস্থিত। তাই হজ্জ সম্পাদনকারীগণ যেদিন আরাফার ময়দানে অবস্থান করবেন, সেই দিনই এই সিয়াম পালন করতে হবে। সেটা যে দেশের যে তারিখই হোক না কেন। মোটকথা অধিকাংশ ওলামাদের মতে হাজীগন যেদিন আরাফার ময়দানে অবস্থান করবেন সেটাই আরাফাত দিবস। তাই আরাফার দিবসে সিয়াম পালন করতে হবে এটাই সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত এবং জমহুর ওলামাদের মত। কারন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘আরাফা দিবসের (يوم عرفة) সিয়ামের ব্যপারে আল্লাহর নিকট আশা করি তিনি এর মাধ্যমে সিয়াম পালনকারীর পূর্বের এক বছরের এবং পরের এক বছরের পাপ মোচন করে দিবেন‌ (সহীহ মুসলিম, হা/১১৬২; মিশকাত, হা/২০৪৪; সহীহ ইবনু হিব্বান ৩৬৩২, ইরওয়া ৯২৫,সহীহ আত্ তারগীব ১০১৭, সহীহ আল জামি‘ ৩৮৩৫ বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/১৯৪১, ৪/২৫০-৫১ পৃ.)।
.
আমরা জানি, আগামীকাল ২৭ জুন,২০২৩ মঙ্গলবার হাজিগণ আরাফার মাঠে অবস্থান করবেন। তাই, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের অধিবাসীরা আগামী ২৬ জুন সোমবার রাতে সাহরি খেয়ে ২৭ জুন মঙ্গলবার আরাফার রোজা রাখবে। এটি সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি, গত শতাব্দীর শীর্ষ আলিম শায়খ আবদুল আযিয ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-সহ অনেক আলিমের বিশুদ্ধ মত। সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া বোর্ড লাজনা দায়িমা এবং মিসরের ফতোয়া বোর্ড দারুল ইফতার মতামতও এমন। যেমন শাইখ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ)-এর তত্ত্বাবধানে সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া বোর্ড আরাফার দিন সম্পর্কে বলেছে, يوم عرفة هو اليوم الذي يقف الناس فيه بعرفة ‘যেদিন হাজীগণ আরাফার মাঠে অবস্থান করেন সেটা আরাফার দিন’ (ফাতাওয়া লাজনা দায়েমাহ, ১০/৩৯৩ পৃ.)। বোর্ড এই বক্তব্যকেই প্রাধান্য দিয়েছে (https://t.ly/bfwj)। বোর্ড আরো উল্লেখ করেছে যে, ‘কেউ চাইলে আগে বা পরেও রাখতে পারে’ (ফাতাওয়া লাজনা দায়েমাহ, ১০/৩৯৩ পৃ.)। শাইখ সুলায়মান আর-রুহায়লী বলেন, ‘এই দিনটা আরাফার মাঠের সাথে সম্পৃক্ত। আর আরাফার মাঠ অন্যান্য দেশে নেই, এটা সঊদীতে অবস্থিত। তাই সম্ভব হলে এ দিনেই সিয়াম রাখবে। যদি এই দিনটি অন্যদের ঈদের দিনের সাথে মিলে যায়, তবে তারা আগের দিন রাখবে’ (https://t.ly/BHWU)। এছাড়াও এই মতের পক্ষে মত দিয়েছেন দারুল ইফতা আল-মিসরিয়্যা,(www.dar-alifta.org ফতওয়া নং ৩৪৭১) প্রফেসর ড. হুসামুদ্দীন(ফাতাওয়া ইয়াসআলূনাক, ১০/৩৪৮ ও শায়খ সুলায়মান ইবনু আব্দুল্লাহ আল-মাজেদ।(দেখুন: শাইখ সুলায়মান আব্দুল্লাহ আল-মাজেদ এর ওয়েব সাইট, ফতওয়া নং ১৭১৬৫)।

⚫প্রথম পক্ষের কিছু যুক্তিঃ
.__________________________________
➤(১) আরাফা সম্পর্কে যতগুলো হাদীস বর্ণিত হয়েছে সব হাদীসে يوم عرفة (আরাফার দিন) বলে উল্লেখ করা হয়েছে, আরেক বর্ননায় আরাফার দিন সন্ধ্যা বেলার সম্পর্ক জুড়ে দিয়েছেন আরাফায় এলোমেলো চুল ধুলা বালি গায় আরাফায় অবস্থান করা হাজীদের সাথে, আরেক বর্ননায় বিশেষ ফজিলত উল্লেখ করে মহান আল্লাহ আরাফায় অবস্থান করা হাজীদের নিয়ে ফেরেশতাদের সাথে গর্ব করেন। যেটা অন্যান্য দেশের ৯ তারিখ অনুযায়ী করেননা।
.
➤(২) আরাফা যিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখে এতে কোন দ্বিমত নেই মতানৈক্য রয়েছে তার নাম আরাফা হওয়ার কারনে যা হাজীদের আরাফায় অবস্থানের সাথে সম্পর্কিত।কেননা হাজীগন দুইদিন আরাফায় অবস্থান করেন না। তাছাড়া ওলামায় কেরাম ঐক্যমত পোষন করেছেন যে যিলহজ্জ মাস গননায় যদি ভুল করে মানুষ যদি ৮ অথবা ১০ তারিখে আরাফায় অবস্থান করে তাহলে তাদের হজ্জ শুদ্ধ হবে কাযা করতে হবেনা।(দেখুন ফতোয়ায় ইয়াসআলুনাকা, ১০/ ৩৪৭-৩৫১পৃষ্ঠা) এখানে প্রশ্ন হয় হাজীরা যদি গননায় ভুল করে কখনো ৮/১০ তারিখে আরাফায় অবস্থান করে সেটা জানার পর আমরা কোন দিন সিয়াম পালন করবো?
.
➤(৩) আরাফার সিয়াম হাজীদের আরাফায় অবস্থানের সাথে সম্পর্কিত নিজ দেশের চাঁদের হিসাব অনুযায়ী নয়। যদি নিজ দেশের চাঁদ অনুযায়ী আরাফা হয় তাহলে যেখানে কয়েক মাস চাঁদ অস্ত যায় না আবার অস্ত গেলে নতুন করে ওঠে না তারা কিভাবে আরাফার সিয়াম রাখবে? উত্তরে যদি বলেন পাশের কোন মুসলিম দেশ অনুযায়ী তাহলে আমরা বলবো এক্ষেত্রে পাশের দেশ অনুসরন করা জায়েজ হবে আর সৌদি আরবের আরাফার অনুসরণ জায়েজ হবেনা?
.
➤(৪) শরীয়ত চলে দলিলের ভিত্তিতে, যুক্তির আলোকে নয়। যারা বলেন আরাফার সিয়াম নিজ দেশের ৯ তারিখ অনুযায়ী রাখতে হবে তাদের কাছে প্রশ্ন, একটি সহীহ দলিল দিন যেখানে রাসূল (সাঃ) অথবা কোন সাহাবী বলেছেন আরাফার মাঠে অবস্থানের সাথে আরাফার সিয়ামের কোন সম্পর্ক নেই এটি নিজ দেশের চাঁদ অথবা ৯ তারিখের সাথে সম্পর্কিত তাই নিজ দেশের চাঁদ অনুযায়ী আরাফার সিয়াম রাখতে হবে? পারবেন একটি সহীহ দলিল দেখাতে?।
.
▪️➤দ্বিতীয় মত: দ্বিতীয় দলের আহলুল আলেমগন উপরে বর্ণিত সিয়াম শুরু ও শেষ করার মূলনীতির হাদীসের আলোকে বলেছেন, চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতার ভিত্তিতে নিজ নিজ দেশের নয় তারিখে সিয়াম রাখতে হবে। আর এই মূলনীতি ফরয সিয়াম, আইয়ামে বীযের সিয়াম, আশূরার সিয়াম, আরাফার সিয়ামসহ সকল সিয়ামের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য। এই মতের দিকে গিয়েছে মারকাযুল ফাতাওয়া,(মারকাযুল ফাতাওয়া (islamweb.net), ফতওয়া নং ১০৩৩৫) ইসলাম সওয়াল ওয়া জওয়াব (ইসলাম সওয়াল ওয়া জওয়াব (islamqa.info), ফতওয়া নং ৪০৭২০) ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ফর ফাতওয়া অ্যান্ড রিসার্চ,(আল-ক্বারারাত ওয়াল ফাতাওয়া, পৃ. ৮২-৮৩) আল্লামা মুহাম্মাদ ইবনু উছায়মীন(মাজমূ‘উল ফাতাওয়া ওয়া রাসায়িল, ২০/৪৭) শায়খ আব্দুল্লাহ ইবনু জিবরীন,(ইবনু জাবরীনের ওয়েব সাইটে দেখুন (http://ibn-jebreen.com) ড. হানী ইবনু আব্দুল্লাহ আল জুবায়র,(দেখুন,«النور الساطع من أفق الطوالع» পৃষ্ঠা নং ০৭) প্রফেসর ড. আহমাদ আল-হাজ্জী আল-কুরদী شبكة الفتاوى الشرعية(http://www.islamic-fatwa.com), ফতওয়া নং ৩৩৯৬৯। ও প্রফেসর ড. খালিদ আল-মুশায়কীহ।(موقع المسلم (http://almoslim.net/
.
পাশাপাশি বিগত শতাব্দীতে সৌদি ‘আরবের শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন, চাঁদের বিষয় নিয়ে আলেমদের মধ্যে ইখতিলাফ রয়েছে। তিনি অন্যান্য সিয়ামের মত আরাফার সিয়ামকেও নিজ নিজ দেশের ৯ তারিখ অনুযায়ী রাখার মতকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং আম দলীল পেশ করে তিনি বলেছেন, সঠিক কথা হলো— উদয়স্থলের ভিন্নতায় সিয়াম ভিন্ন ভিন্ন দিনে হবে। ইবনু তায়মিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ)ও এই মত গ্রহণ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ যদি মক্কায় চাঁদ দেখা যায়,তাহলে এই দিনটি মক্কার নবম তারিখ। কিন্তু কোনো দেশে যদি মক্কার পূর্বে চাঁদ দেখা যায়, তাহলে মক্কার নবম তারিখ হবে তাদের ঈদের দিন। এই দিনে সিয়াম রাখা তাদের জন্য জায়েয হবে না। কেননা তা তাদের ঈদের দিন। আবার কোনো দেশে যদি মক্কার পরে চাঁদ দেখা যায়, তাহলে মক্কার নবম তারিখ হবে তাদের অষ্টম তারিখ। তাই তারা নিজেদের নবম তারিখে সিয়াম রাখবে, যেটা মক্কার দশম তারিখ। এটাই অগ্রগণ্য মত। কারণ নবী (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘যখন তোমরা চাঁদ দেখবে তখন সিয়াম রাখো। আবার যখন চাঁদ দেখেবে তখন ছিয়াম শেষ করো’। দৈনিক সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে যেমন তারা স্থানীয় সময় হিসাব করে, তদ্রূপ মাসিক সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রেও স্থানীয় সময় হিসাব করবে’।(ইমাম উসাইমীন মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, ২০ তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৮) এই ফতোয়াটির অনুবাদক আব্দুল্লাহ মৃধা ভাই)।
.
⚫ দ্বিতীয় পক্ষের কিছু যুক্তিঃ
._______________________________
➤(১). সৌদি অনুযায়ী যদি আরাফার সিয়াম রাখা হয় তাহলে চাঁদ দেখে সিয়াম রাখা ও চাঁদ দেখে সিয়াম ছাড়ার হাদীসের বিধান লঙ্ঘিত হবে কেননা সৌদি আরবের ৯ যিলহজ্জ আমাদের দেশে ৮ যিলহজ্জ। আর হাদীসে এসেছে তোমরা চাঁদ দেখে রোযা রাখ এবং চাঁদ দেখে ঈদ কর। কিন্তু যদি আকাশে মেঘ থাকে, তাহলে গণনায় ৩০ পুরা করে নাও।(বুখারী ১৯০০, মুসলিম ১০৮০)।
.
➤(২). হাজীদের আরাফায় অবস্থান অনুযায়ী যদি সিয়াম রাখা হয় তাহলে সঊদী আরবের পশ্চিমের দেশগুলোতে যখন একদিন আগে চাঁদ দেখা যাবে তাদের কি হবে? সঊদী আরবের নয় তারিখের দিন তাদের হবে ১০ তারিখ। অর্থাৎ কুরবানীর দিনে তাদের আরাফার ছিয়াম রাখতে হবে। অথচ কুরবানীর দিনে সিয়াম রাখা হারাম।[আবূ দাঊদ, হা/২৪১৬; ইবনু মাজাহ, হা/১৭২২ যেমন,(২০২১ সালের ঈদুল ফিতরেই যা ঘটেছে।২০২১ সালের ঈদুল ফিতরের চাঁদ মে মাসের ১২ তারিখে সোমালিয়া, নাইজেরিয়া, পাকিস্তানসহ সাতটি দেশে চাঁদ দেখার সংবাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশের চাঁদপুরে ৫০ গ্রাম ঈদুল ফিতর উদযাপন করেছেন। সূত্র: দৈনিক কালের কণ্ঠ, ১৩ মে ২০২১)।
.
➤(৩). আরাফার সিয়াম রাখতে হয় ঈদের আগের দিনে। কিন্তু সঊদীর সাথে মিল রেখে আরাফা পালন করা হলে পূর্বাঞ্চলীয় লোকদের আরাফার সিয়াম ঈদের দুই দিন আগে রাখতে হবে, যা সহীহ সুন্নাহর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
.
➤(৪). অতিতে যখন বর্তমান যুগের মত এমন প্রযুক্তি ছিলনা হাজীরা কবে আরাফায় অবস্থান করেন সেটা জানার সুযোগ ছিলনা তখন সৌদির বাহিরের মুসলিমগন কোন দিন আরাফার সিয়াম রাখতেন? এবং মহান আল্লাহ না করুন,যদি ভবিষ্যতে কখনো যদি হজ্জ অনুষ্ঠিত না হয়,এবং যার ফলে হাজীগণ আরাফার ময়দানে অবস্থান করতে না পারেন।তখন কিভাবে আরাফার সিয়াম রাখা হবে? উত্তর নিঃসন্দেহে তখন নিজ দেশের চাঁদের হিসাব অনুযায়ী ৯ তারিখ আরাফার সিয়াম রাখতে হবে।

উপরোক্ত দুটি মতের আলোকে এখানে স্পষ্ট হচ্ছে যে, সঊদী আরবের ফাতাওয়া বোর্ড, শাইখ বিন বায,শাইখ উছায়মীন, প্রফেসর ড. সুলায়মান আর-রুহায়লী সবাই অন্যান্য সিয়াম নিজ নিজ ভূখণ্ডের চাঁদ অনুযায়ী রাখার কথা বলেছেন। কিন্তু আরাফার সিয়ামকে সঊদী আরবের ফাতাওয়া বোর্ড, শাইখ রুহায়লী আরাফার দিনের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন এবং আগে বা পরে রাখার বিষয়েও ছাড় দিয়েছেন। আর শায়খ উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) অন্যান্য সিয়ামের মত আরাফার সিয়ামকেও নিজ নিজ দেশের চাঁদ অনুযায়ী রাখার বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছেন। এখানেই সামান্য ইখতিলাফ।

❑➤পরিশেষে উপরোক্ত দুটি মতের আলোকে ইনসাফ পূর্ণ সমাধান:
______________________________________
উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে এটি পরিষ্কার যে, আরাফার সিয়াম কোন দিন রাখতে হবে বিষয়টি ইখতিলাফি (মতভেদপূর্ণ)। উভয় পক্ষের দলিল রয়েছে এবং সাথে উভয় পক্ষে যুগ শ্রেষ্ঠ সালাফি আলেমগণ রয়েছেন, সুতরাং উক্ত মাসালায় বাড়াবাড়ি কিংবা কঠোরতা না করে আমরা মতানৈক্য ও সমস্যা থেকে বেঁচে থাকতে জিলহজ্জের প্রথম ৯ দিন সিয়াম রাখতে পারি। কিন্তু সেটা সম্ভব না হলে, শেষের ৪-৫ টি রাখি সেটাও সম্ভব না হলে অন্তত দুই দিনই সিয়াম রাখতে পারি। অর্থাৎ সৌদি আরবের চাঁদের হিসাবে ৯ তারিখে (যেদিন হাজিগণ আরাফায় অবস্থান করবেন সেদিন) এবং নিজ দেশের চাঁদের হিসাবে ৯ তারিখে (অর্থাৎ আরাফার দিনের পরের দিন)। তাহলে নিশ্চিতভাবে আমাদের আরাফার রোজা আদায় হয়ে যাবে; এবং কোনো সন্দেহ সংশয় থাকবে না। সেই হিসেবে, আগামী ২৭ ও ২৮ জুন, রোজ মঙ্গলবার ও বুধবার বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের অধিবাসীরা দুই দিন আমরা দুটি নফল সিয়াম রাখতে পারি। তবে একটি কথা মনে রাখতে হবে, দুটো সিয়াম আরাফার নিয়তে রাখা যাবে না। যেকোনো একটি সিয়াম আরাফার নিয়তে রাখবেন আর অপরটি সাধারণ নফলের নিয়তে। হ্যাঁ, দুশ্চিন্তার কোন কারন নেই; আরাফার দিনে যদি কেউ সাধারণ নফলের নিয়তেও সিয়াম রাখে, তবে সেটি আরাফার সিয়াম হিসেবেই পরিগণিত হবে। তাই,আমার পরামর্শ হলো: ২৭ তারিখে আরাফার নিয়তে সিয়াম রাখবেন, আর ২৮ তারিখে সাধারণ নফলের নিয়তে রাখবেন (আবার কেউ দ্বিতীয় মতটি মানতে চাইলে,২৭ তারিখ সাধারণ নফলের নিয়তে সিয়াম রাখবেন এবং ২৮ তারিখে আরাফার নিয়তে রাখবেন)। ইনশাআল্লাহ,তাহলে নিশ্চিতভাবেই আরাফার রোজা হয়ে যাবে। নিয়ত মুখে বলতে হবে না; অন্তরের ইচ্ছাই যথেষ্ট। কেননা মুখে নিয়ত করা সর্বসম্মতিক্রমে বিদআত।(দেখুন সহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮; মিশকাত, হা/১৪০ উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারাব, অডিও ক্লিপ নং-৩৪৯)
.
পূর্ববর্তী নেককার ব্যক্তিগণ যিলহজের প্রথম ৯ দিনই সিয়াম রাখতেন। এমনকি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম নিজেও এই নয় দিন সিয়াম পালন করতেন।যেটা আমার রাসূল (সাঃ)-এর স্ত্রী হাফসাহ (রাঃ) এর হাদীস থেকে জানতে পেরেছি (দেখুন নাসাঈ,২৪১৭ আবূ দাঊদ ২৪৩৭, সহীহ আবূ দাঊদ ২১২৯)।সুতরাং আরাফার রোজার জন্য সতর্কতা হিসেবে একদিন বেশি রোজা রাখলেও ক্ষতি নেই; বরং একটি নফল রোজা অতিরিক্ত রাখা হবে। সম্ভব হলে তো যিলহজের প্রথম ৯ দিনই রোজা রাখা ভালো। মোট কথা, যিলহজ্জ মাসের এই নয় দিনে রোযা রাখা মুস্তাহাব। ইমাম নওবী বলেন, ‘ঐ দিনগুলিতে রোযা রাখা পাকা মুস্তাহাব।’(শরহুন নওবী ৮/৩২০) আবার সাধারণ ভাবেই যিলহজ্জের প্রথম দশ দিনের আমল অত্যন্ত মর্যাদার। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘আল্লাহ তা‘আলার নিকট যিলহজ্জের (প্রথম) দশ দিনের আমলের চেয়ে মহান এবং প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই।’’(মুসনাদে আহমাদ হা/ ৫৪৪৬; বুখারী হা/৯৬৯ আবূ দাঊদ হা/ ২৪৩৮ তিরমিযী হা/ ৭৫৭) হাফিয ইবনে হাজার (রহ.) বলেন, ‘একথা স্পষ্ট হয় যে, যিলহজ্জের প্রথম দশ দিনের বিশেষ গুরুত্বের কারণ; যেহেতু ঐ দিনগুলিতে মৌলিক ইবাদতসমূহ একত্রিত হয়েছে যেমন, নামায, রোযা, সদাকাহ এবং হাজ্জ। যা অন্যান্য দিনগুলিতে এইভাবে জমা হয় না।(ফাতহুল বারী ২/৪৬০) ইমাম ইবনে উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,নফল সিয়াম তো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নেক আমল। তাই, এই দিনগুলোতে বেশি বেশি নফল সিয়াম রাখা উত্তম।(আশ শারহুল মুমতে’ খন্ড: ৬ পৃষ্ঠা: ৪৭১)
.
❖⛔ উল্লেখ্য যে,আরাফার দিনে হাজি সাহেবরা রোজা রাখবেন না; বরং অন্যরাই শুধু রাখবেন।
________________________________
উম্মুল ফাদ্বল (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আরাফার দিন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোজা রেখেছেন কি না, তা নিয়ে লোকজন সন্দেহে পতিত হলে আমি রাসুলের নিকট পানীয় প্রেরণ করলাম। নবিজি তখন উটের উপর ছিলেন। আর তিনি তা পান করলেন। (ফলে সবাই নিশ্চিত হলো যে, তিনি রোজা রাখেননি। তিনি তখন হজ পালনরত ছিলেন) (সহীহ মুসলিম ২৬৫১)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম শাইখ উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: আরাফার দিন হজ্জপালনকারী নন ও হজ্জপালনকারীর জন্য রোযা রাখার হুকুম কি?
.
উত্তরে তিনি বলেন: যিনি হজ্জপালন করছেন না তার জন্যে আরাফার দিন রোযা রাখা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আরাফার দিন রোযা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন: “আমি আল্লাহর নিকট প্রত্যাশা করছি যে, বিগত বছর ও পরবর্তী বছরের গুনাহ মার্জনা করবে।” অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে “গত বছর ও পরের বছরের গুনাহ মার্জনা করবে।”পক্ষান্তরে, হাজীদের জন্য আরাফার দিন রোযা রাখা সুন্নত নয়। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায়ী হজ্জকালে আরাফার দিন রোযা রাখেননি। সহিহ বুখারীতে মায়মুনা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরাফার দিন রোযা রেখেছেন; নাকি রাখেননি এ ব্যাপারে কিছু মানুষ সন্দেহে ছিল। তখন আমি তাঁর জন্য এক পেয়ালা দুধ পাঠালাম; তখন তিনি আরাফার ময়দানে অবস্থান করছিলেন। তিনি দুধ পান করলেন; লোকেরা তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিল।(মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন, খণ্ড ২০, প্রশ্ন: ৪০৪)
.
বিশেষ দ্রষ্টব্য: আইয়ামে বীয-এর সিয়াম পালনকারী ব্যক্তিগণ যিলহজ্জ মাসে ১৪ ও ১৫ তারিখে ২ দিন সিয়াম পালন করতে পারেন। যেহেতু ১৩ তারিখ তাশরীক্বের মধ্যে পড়ে যায়, যেদিন সিয়াম রাখা হারাম। তাই পরের দু’দিন সিয়াম পালন করলেই যথেষ্ট হবে (নাসাঈ, হা/২৪৩৪, ২৩৯৪, সনদ সহীহ)। এছাড়া চাইলে ১৬ তারিখ বা ঐ মাসের অন্য কোন দিনে অবশিষ্ট একটি সিয়াম রাখতে পারবে। (আবূ দাঊদ, হা/২৪৫৩, সনদ সহীহ; শায়খ বিন বায,মাজমূ‘উ ফাতাওয়া, ১৫ তম খণ্ড, পৃ. ৩৮০)।(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
______________________
আপনাদের দ্বীনি ভাই:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Share On Social Media