কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক বার্তা প্রচার করাই হল এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

আল্লাহর গুণাগুণ সাব্যস্তকারী আহলে সুন্নাতের উপর আরোপিত বাতিলপন্থীদের কিছু সন্দেহ ও তার জওয়াব


শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমীন রহ.

অনুবাদ : মুহাম্মাদ শামসুল হক সিদ্দিক

সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

যারা সিফাতসমূহকে বাহ্যিক অর্থ থেকে সরিয়ে তাবিল তথা দূর ব্যাখ্যার আশ্রয় নেয় তাদের মধ্যে একদল আছে এমন যারা কুরআন-সুন্নাহয় সিফাত-বিষয়ক কিছু টেক্সট সম্পর্কে আহেল সুন্নাত ওয়াল জামাআতের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তাদের দাবি এই যে আহলে সুন্নাত এই টেক্সটসমূহকে বাহ্যিক অর্থ থেকে সরিয়ে অন্য অর্থে নিয়ে থাকেন। তাদের এ প্রশ্ন উত্থাপনের মূল লক্ষ্য আহলে সুন্নাতকে তাবিলপন্থীদের দলে শামিল করে নেওয়া এবং আহলে সুন্নাতের মধ্যে ও তাদের মধ্যে যে কোনো পার্থক্য নেই তা প্রমাণ করা।
যারা এরূপ প্রশ্ন করেন, দু পর্যায়ে তাদের উত্তর দিতে চাই। প্রথম পর্যায়ে সংক্ষিপ্তভাবে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে বিস্তারিতভাবে:
প্রথমত: সংক্ষিপ্ত জবাব আর তা দুভাবে:
এক. আমরা এটা মানি না যে আহলে সুন্নাতের ব্যাখ্যা সিফাত বিষয়ক কিছু টেক্সটকে বাহ্যিক অর্থ থেকে সরিয়ে দেয়; কারণ বাহ্যিক অর্থ বলতে বুঝায় কোনো কথা সামনে আসামাত্র যে অর্থটি মাথায় উঁকি দেয়। আর এ বাহ্যিক অর্থ কথার কনটেক্সট হিসেবে, কথাকে যার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে উল্লেখ করা হয় তার হিসেবে, ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। পাশাপাশি বাক্যের গাঁথুনি হিসেবেও শব্দার্থের পরিবর্তন হয়। আর একটি বাণী তো কিছু শব্দ ও বাক্যের সমন্বয়েই তৈরি হয়। অতএব একটিকে অন্যটির সঙ্গে মেলানোর পরই অর্থ উদ্ধার হয়।
দুই. যদি আমরা মেনেও নিই যে আহলে সুন্নাত যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা কিছু টেক্সটকে বাহ্যিক অর্থ থেকে সরিয়ে দেয়, তবে তারা এরূপ করেছেন কুরআন-সুন্নাহর দলিলের ভিত্তিতে। হয়তো টেক্সটের সঙ্গেই থাকা দলিল অথবা অন্য কোথাও থাকা দলিল। তারা নিছক কিছু সংশয়-সন্দেহকে দলিল হিসেবে সাব্যস্ত করেননি, অথচ এসব সংশয়-সন্দেহকেই আহলে তা‘তীল অকাট্য প্রমাণ হিসেবে মনে করে এবং আল্লাহর জন্য তা সাব্যস্ত করে যা তিনি নিজের জন্য সাব্যস্ত করেননি।

দ্বিতীয়ত: বিস্তারিত জবাব
এ পর্যায়ে ওইসব টেক্সট সম্পর্কে আলোচনা করব যেগুলোর ব্যাপারে বলা হয় যে আহলে সুন্নাত তা বাহ্যিক অর্থ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। নিম্নবর্ণিত উদাহরণগুলো থেকে তা বুঝা যাবে। তাহলে ইমাম গাযালীর একটি কথা উল্লেখের মাধ্যমে শুরু করি। ইমাম গাযালী হাম্বলী মাযহাবের কোনো ব্যক্তির বরাত দিয়ে উল্লেখ করেন যে, ‘ইমাম আহমদ তিন জায়গা ছাড়া অন্য কোথাও তাবিল করেননি। এ তিন জায়গা হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত তিনটি হাদীস:
الحجر الأسود يمين الله في الأرض
হজরে আসওয়াদ জমীনের বুকে আল্লাহর ডান হাত
قلوب العباد بين أصبعين من أصابع الرحمن
বান্দাদের অন্তরসমূহ দয়াময়ের আঙ্গুলসমূহের মধ্যে দু’আঙ্গুলের মাঝখানে।
إني أجد نفس الرحمن من قبل اليمن
নিশ্চয় আমি আল্লাহর (বান্দাদের) নাফস (বিপদমুক্তির বিষয়টি) ইয়েমেনবাসীদের দিকে পাই।
শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া উক্ত হাদীসগুলো ইমাম গাযালী থেকে বর্ণনা করে মাজমুউল ফাতাওয়ায় উল্লেখ করেছেন। (খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৯৮)
এরপর তিনি বলেছেন, ‘এ ঘটনাটি ইমাম আহমদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার’।
প্রথম উদাহরণ: ‘হজরে আসওয়াদ পৃথিবীতে আল্লাহর ডান হাত’।
এর উত্তর: উক্ত হাদীসটি বাতিল হাদীস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে উক্ত হাদীসটি প্রমাণিত হয়নি। ইমাম ইবনুল জাওযী ‘আল ইলাল আল মুতানাহিয়া’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, ‘এ হাদীসটি সহীহ নয়’। ইবনুল আরাবী বলেন, ‘এটি একটি বাতিল হাদীস, যার প্রতি তাকানো হবে না।’ শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, ‘এ হাদীসটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অপ্রমাণিত সনদে বর্ণিত হয়েছে।’ অতএব এ হাদীসের অর্থ নিয়ে চিন্তাভাবনা করার আদৌ কোনো প্রয়োজন নেই। তবু শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেন: ‘এটা প্রসিদ্ধ যে উক্ত হাদীস ইবনে আববাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে। আর পুরো হাদীসটি হলো এ রকম:
الحجر الأسود يمين الله في الأرض، فمن صافحه وقبله، فكأنما صافح الله وقبل يمينه
হজরে আসওয়াদ পৃথিবীতে আল্লাহ তা‘আলার ডান হাত। যে তার সঙ্গে হাত মেলাল এবং চুম্বন করল, সে যেন আল্লাহর সঙ্গে মুসাফাহা করল এবং তাঁর ডান হাত চুম্বন করল।
যে ব্যক্তি উক্ত হাদীসের শব্দমালায় গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করবে সে বুঝতে পারবে এর শব্দমালায় কোনো সমস্যা নেই; কেননা এতে বলা হয়েছে, ‘পৃথিবীতে আল্লাহর ডান হাত’। অর্থাৎ এখানে শব্দকে বন্ধনযুক্ত করে উল্লেখ করা হয়েছে, উন্মুক্তভাবে বলা হয়নি যে, ‘আল্লাহর ডান হাত’ বরং বলা হয়েছে, ‘পৃথিবীতে আল্লাহর ডান হাত’। আর কোনো শব্দকে উন্মুক্তভাবে উল্লেখ করা ও বন্ধনযুক্ত করে উল্লেখ করার মধ্যে অর্থগতভাবে পার্থক্য রয়েছে। এরপর তিনি বলেন: ‘যে তার সঙ্গে হাত মেলাল ও মুসাফাহা করল সে যেন আল্লাহর সঙ্গেই মুসাফাহা করল। অতএব হাদীসটি শুরুর অংশ এবং শেষের অংশ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, হজরে আসওয়াদ আল্লাহ তা‘আলার সিফাতের মধ্যে শামিল নয়। প্রত্যেক বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্যই এ বিষয়টি পরিষ্কার। (মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৯৮)

দ্বিতীয় উদাহরণ: ‘বান্দাদের অন্তরসমূহ দয়াময়ের আঙ্গুলসমূহের মধ্য থেকে দু‘আঙ্গুলের মাঝখানে’।
এর উত্তর: এ হাদীসটি সহীহ। ইমাম মুসলিম উক্ত হাদীসটি তার গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবন আস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন:
إن قلوب بني آدم كلها بين إصبعين من أصابع الرحمن كقلب واحد يصرفه حيث يشاء
নিশ্চয় আদম সন্তানের সকল অন্তর দয়াময়ের আঙ্গুলসমূহের মধ্যে দু’আঙ্গুলের মাঝখানে, এক অন্তরের মতো যা তিনি তার ইচ্ছানুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করেন।
এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
اللهم مصرف القلوب، صرف قلوبنا على طاعتك
হে আল্লাহ, অন্তরসমূহের নিয়ন্ত্রণকারী! আপনি আমাদের অন্তরসমূহ আপনার আনুগত্যের ওপর স্থির করুন।
আহলে সুন্নাত এবং সালাফগণ হাদীসটিকে বাহ্যিক অর্থেই নিয়েছেন। তারা বলেছেন, প্রকৃত অর্থে আল্লাহ তা‘আলার আঙ্গুল আছে একথা আমরা আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করি, যেভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করেছেন। আর আল্লাহ তা‘আলার দু‘আঙ্গুলের মাঝখানে বান্দাদের অন্তর থাকে একথার দাবি এটা নয় যে আল্লাহ তা‘আলার আঙ্গুল বান্দাদের অন্তরসমূহ স্পর্শ করে আছে। হাদীসের শব্দমালা থেকে স্পর্শ করে থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। অতএব বাহ্যিক অর্থ থেকে সরিয়ে অন্য অর্থ নেয়ার আদৌ কোনো প্রয়োজন নেই। এর উদাহরণ, যদি কেউ বলে যে মেঘমালা জমিন ও আসমানের মাঝখানে, তাহলে এ বক্তব্যের অর্থ এটা নয় যে মেঘমালা জমীন ও আসমানকে স্পর্শ করে আছে। অনুরূপভাবে যদি বলা হয় যে বদরপ্রান্তর মক্কা ও মদীনার মাঝখানে, তাহলে এর অর্থ এটা নয় যে বদরপ্রান্তর মক্কা ও মদীনাকে স্পর্শ করে আছে। অতএব বান্দাদের সকল অন্তর প্রকৃত অর্থেই আল্লাহ তা‘আলার আঙ্গুলসমূহের মধ্যে দু‘আঙ্গুলের মাঝখানে, তবে এ মাঝখানে থাকাটা স্পর্শকে আবশ্যক করে না। না আবশ্যক করে সত্তাগতভাবে বান্দাদের সঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা সংমিশ্রণকে যাকে আরবীতে ‘হুলুল’ বলা হয়।

তৃতীয় উদাহরণ: ‘নিশ্চয় আমি আল্লাহর (বান্দাদের) নাফস (বিপদমুক্তি) ইয়েমেনবাসীদের পক্ষ থেকে পাই।’
এর উত্তর: এ হাদীসটি ইমাম আহমদ তার মুসনাদ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন (খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৪১)। হাদীসটি আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘ঈমান হলো ইয়েমেনি এবং প্রজ্ঞাও হলো ইয়েমেনি। আর নিশ্চয় আমি আল্লাহর (বান্দাদের) নাফস (বিপদমুক্তি) ইয়েমেনবাসীদের পক্ষ থেকে পাই।’ (হাইসামী) মাজমাউয যাওয়ায়িদ গ্রন্থে এসেছে, এ হাদীসটির বর্ণনাকারীগণ সহীহ হাদীস বর্ণনাকারীদের অন্তর্ভুক্ত। তবে শাবীব ছাড়া; তিনিও হলেন ছিকাহ অর্থাৎ বিশ্বস্ত। ‘তাকরীব’ গ্রন্থে এসেছে, শাবীব হলেন তৃতীয় তাবাকার বিশ্বস্ত বর্ণনাকরী। ইমাম বুখারী ‘আত-তারীখুল কাবীর’ গ্রন্থে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।
ইমাম গাযালীর কথা অনুযায়ী ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল এ হাদীসটিকে বাহ্যিক অর্থ থেকে সরিয়ে এর অন্য অর্থ করেছেন। কিন্তু মূল বিষয় সে রকম নয়। কেননা হাদীসটিতে যে نفس শব্দটি এসেছে তার উচ্চারণ হবে ‘নাফাস’ ‘নাফ্স’ নয়। নাফ্স শব্দের অর্থ অন্তর। অতএব নাফ্স বললে হাদীসটির অর্থ দাঁড়াত: ‘আমি দয়াময়ের অন্তরকে ইয়েমেনের দিকে পাই’। কিন্তু এখানে নাফ্স উদ্দেশ্য নয় বরং উদ্দেশ্য হলো নাফাস। নির্ভরযোগ্য আরবী আভিধানগ্রন্থ ‘মাকাইসুল্লগাহ’ – তে নাফাস শব্দের অর্থ করা হয়েছে, ‘এমন জিনিস যার মাধ্যমে বিপদ থেকে মুক্তিলাভ করা যায়।’ সে হিসেবে হাদীসটি অর্থ দাঁড়াবে, ‘আল্লাহ তা‘আলা ইয়েমেনবাসীদের মাধ্যমে বান্দাদের বিপদমুক্ত করবেন।’
শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেন: ‘এই ইয়েমেনবাসীরাই মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এবং বিভিন্ন শহর জয় করেছে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাদের মাধ্যমেই নানা সমস্যা থেকে মুমিনদের উদ্ধার করেছেন। (মাজমুউল ফাতাওয়া:খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৯৮)

চতুর্থ উদাহরণ: আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
﴿ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰٓ إِلَى ٱلسَّمَآءِ﴾ [البقرة: ٢٩]
অতঃপর তিনি আসমানের প্রতি মনোযোগী হলেন। (আল বাকারা: ২: ২৯)
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় আহলে সুন্নাতের দুটি বক্তব্য রয়েছে:
প্রথম বক্তব্য: এখানে ‘ইস্তাওয়া’ শব্দের অর্থ ঊর্ধ্বে উঠেছেন। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা উপরের দিকে উঠেছেন। এ অর্থটিকেই ইমাম তাবারী তার তাফসীর গ্রন্থে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি উক্ত আয়াতের তাফসীরে বলেছেন:
علا عليهن وارتفع، فدبرهن بقدرته، وخلقهن سبع سماوات
তিনি আকাশসমূহের ওপরে উঠলেন, ঊর্ধ্বে উঠলেন, তিনি তার কুদরত দ্বারা আকাশসমূহ নিয়ন্ত্রণ করলেন, এবং তা সাত আসমান হিসেবে সৃষ্টি করলেন।
ইমাম বাগাবী তার তাফসীরে অভিন্ন বক্তব্য উল্লেখ করেছেন যা তিনি ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা ও অধিকাংশ সালাফ তাফসীকারীদের উদ্বৃতি দিয়ে উল্লেখ করেছেন। ইস্তাওয়া শব্দের বাহ্যিক অর্থকে ধরে রাখতে গিয়েই তারা এরূপ তাফসীর করেছেন এবং ওপরে ওঠার আকার-প্রকৃতি-ধরণ কি তা তারা আল্লাহ তা‘আলার ইলমের কাছে সমর্পন করেছেন।
দ্বিতীয় বক্তব্য: ইস্তিওয়া শব্দের অর্থ এখানে পরিপূর্ণ মনোযোগ আরোপ করা। ইমাম ইবনে কাছীর সূরা আল বাকারার তাফসীরে এবং ইমাম বাগাবী সূরা ফুসসিলাত এর তাফসীরে এ ব্যাখ্যাই দিয়েছেন। ইমাম ইবনে কাছীর বলেছেন: ‘অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা আকাশের প্রতি মনোযোগী হলেন। আর ইস্তিওয়া এখানে ইচ্ছা করা ও মনোযোগী হওয়ার অর্থকে শামিল করছে; কেননা এখানে ইস্তাওয়া ক্রিয়াপদেও পর إلى যুক্ত করা হয়েছে। ইমাম বাগাবী বলেছেন, ‘অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা আকাশ সৃষ্টির দৃঢ় মনোযোগ পোষণ করলেন।’
বলার অপেক্ষা রাখে না যে উক্ত ব্যাখ্যায় বাণীকে তার বাহ্যিক অর্থ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়নি; কেননা ইস্তাওয়া ক্রিয়াপদটি এমন একটি অব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যা শেষ প্রান্ত বা সীমানা বুঝায়। অতএব তা এমন অর্থ বুঝাচ্ছে যা উক্ত অব্যয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

পঞ্চম ও ষষ্ঠ উদাহরণ: আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
﴿وَهُوَ مَعَكُمۡ أَيۡنَ مَا كُنتُمۡۚ ﴾ [الحديد: ٤]
আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথেই আছেন। (আল হাদীদ: ৫৭: ৪)
﴿وَلَآ أَدۡنَىٰ مِن ذَٰلِكَ وَلَآ أَكۡثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمۡ﴾ [المجادلة: ٧]
এর চেয়ে কম হোক কিংবা বেশি হোক, তিনি তো তাদের সংগেই আছেন, তারা যেখানেই থাকুক না কেন। (আল মুজাদালা: ৫৮: ৭)
উল্লিখিত দুই আয়াতে যে বাণী রয়েছে তা প্রকৃত ও বাহ্যিক অর্থেই। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, প্রকৃত ও বাহ্যিক অর্থটা এখানে কি?
এখানে কি বলা হবে যে, আল্লাহ তা‘আলা তার সৃষ্টিজীবের সঙ্গে থাকেন এই অর্থে যে তিনি তাদের সঙ্গে মিশে থাকেন অথবা তারা যেসব জায়গায় থাকে সেসব জায়গায় আল্লাহর তা‘আলার সত্তা অবস্থান করে।
না কি বলা হবে যে, এখানে বাহ্যিক ও প্রকৃত অর্থ বলতে বুঝায়, আল্লাহ তা‘আলা তার সৃষ্টিজীবের সঙ্গে এই অর্থে থাকেন যে তিনি তাঁর জ্ঞানে, কুদরতে, শ্রবণে, দর্শনে, নিয়ন্ত্রণে এবং রুবুবিয়াতের অন্যান্য অর্থে সকল মাখলুকের ঊর্ধ্বে আরশের ওপর থাকা সত্ত্বেও সকল সৃষ্টিকে পরিবেষ্টন করে আছেন?
এটা নিঃসন্দেহ যে প্রথম কথাটি এখানে প্রযোজ্য নয়, কেননা উল্লিখিত বাণীদ্বয়ের কনটেক্সট উক্ত কথাকে দাবি করে না। বরং কোনোভাবেই তা বুঝায় না; কেননা এখানে ‘সঙ্গে-থাকা’র বিষয়টি আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। আর আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টিজীব কর্তৃক পরিবেষ্টিত হবেন তা হতে পারে না। অর্থাৎ যদি বলা হয় যে আল্লাহ তা‘আলা তার সৃষ্টিজীবের সঙ্গে থাকেন এই অর্থে যে তিনি তাদের সঙ্গে মিশে থাকেন অথবা তারা যেসব জায়গায় থাকে সেসব জায়গায় আল্লাহর তা‘আলার সত্তা অবস্থান করে, তাহলে একথার দাবি হলো যে আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টিবস্তু কর্তৃক পরিবেষ্টিত থাকেন। আল্লাহর ব্যাপারে এমন কথা কখনো বলা যাবে না। উপরন্তু مَعِيَّة (সঙ্গে থাকা) আরবী ভাষার অর্থনির্দেশ-নীতি অনুযায়ী মিশে থাকা অথবা একই স্থানে সঙ্গে থাকাকে দাবি করে না। বরং সাধারণভাবে সঙ্গে থাকাকে বুঝায়, এরপর স্থান অনুযায়ী সঙ্গে থাকার আকার-প্রকৃতির ব্যাখ্যা দেওয়া হয়।
আর আল্লাহ তা‘আলার সঙ্গে-থাকাকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা সম্পূর্ণ বাতিল যার অর্থ দাঁড়ায় মাখলুকের সঙ্গে মিশে থাকা অথবা মাখলুক যে জায়গায় থাকে সে জায়গায় অবস্থান করা। এ ধরনের ব্যাখ্যা কয়েকটি কারণে বাতিল:
প্রথম কারণ: এরূপ ব্যাখ্যা সালাফদের ইজমার উল্টো। সালাফদের কেউই এরূপ ব্যাখ্যা করেননি। বরং তারা এরূপ ব্যাখ্যা অস্বীকার করার ব্যাপারে একমত ছিলেন।
দ্বিতীয় কারণ: কুরআন, সুন্নাহ, যুক্তিবুদ্ধি, স্বচ্ছ মানবপ্রকৃতি ও সালাফদের ইজমার দ্বারা একথা প্রমাণিত যে আল্লাহ তা‘আলা সর্বোচ্চে ও সর্বোর্ধ্বে। আর উক্ত ব্যাখ্যা আল্লাহ তা‘আলার সর্বোচ্চতা ও সর্বোর্ধ্বতার বিপরীত। আর যা দলিল দ্বারা প্রমাণিত বিষয়ের বিপরীত হবে তা বাতিল। অতএব বান্দাদের সঙ্গে থাকার অর্থ যদি কেউ এভাবে করে যে আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদের সঙ্গে মিশে থাকেন অথবা বান্দাদের জায়গাতেই থাকেন তবে কুরআন, সুন্নাহ, যুক্তিবুদ্ধি, স্বচ্ছ মানবপ্রকৃতি ও সালাফদের ইজমা অনুযায়ী তা প্রত্যাখ্যাত হবে।
তৃতীয় কারণ: উক্ত কথার যুক্তিগত এমন অযাচিত ফলাফল বের হয় যা আল্লাহ তা‘আলার জন্য উপযোগী নয়।
আর যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলাকে জানে, তাঁকে যথার্থরূপে সম্মান করে এবং আরবী ভাষায় معية অর্থাৎ ‘সঙ্গে-থাকা’ কাকে বলে তা বোঝে সে কখনোই একথা বলতে পারে না যে: আল্লাহ তা‘আলা মাখলুকের সঙ্গে থাকার প্রকৃত অর্থ হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদের সঙ্গে মিশে থাকেন অথবা তারা যে জায়গায় অবস্থান করে তিনিও সে জায়গায় অবস্থান করেন। আরবী ভাষা সম্পর্কে যে অজ্ঞ, সেই কেবল এরূপ কথা বলতে পারে।
অতএব এতে আর কোনো সন্দেহ রইল না যে এ কথাটি বাতিল। যেহেতু এ কথাটি বাতিল তাই দ্বিতীয় কথাটিই সঠিক। আর তা হলো, আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদের সঙ্গে এমনভাবে আছেন যে তিনি তাঁর ইলম, কুদরত, শ্রবণ, দর্শন, নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য ও রুবুবিয়াতের যা যা দাবি আছে সবকিছুর নিরিখে তিনি তাদের পরিবেষ্টন করে আছেন। এটাই হলো উল্লিখিত দুই আয়াতের নিঃসন্দেহ বাহ্যিক অর্থ; কেননা এ আয়াত দুটো হলো হক এবং হকের বাহ্যিক অর্থও হক। বাতিল কখনো আল কুরআনের বাহ্যিক অর্থ হতে পারে না।
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া ফতওয়ায়ে হামাবিয়াতে বলেছেন (মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ১০৩): ‘আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক বান্দার সঙ্গে থাকার অর্থ জায়গা অনুযায়ী ভিন্ন-ভিন্ন হয়ে থাকে। অতএব আল্লাহ তা‘আলা যখন বলেন:
﴿يَعۡلَمُ مَا يَلِجُ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَمَا يَخۡرُجُ مِنۡهَا﴾ [الحديد: ٤]
তিনি জানেন জমিনে যা কিছু প্রবেশ করে এবং তা থেকে যা কিছু বের হয়। (আল-হাদীদ: ৫৭: ৪)
এরপর বলেন:
﴿وَهُوَ مَعَكُمۡ أَيۡنَ مَا كُنتُمۡۚ ﴾ [الحديد: ٤]
‘আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথেই আছেন।’ (আল হাদীদ: ৫৭: ৪)
তখন আল্লাহ তা‘আলার এ ভাষণ বাহ্যিকভাবে যা বুঝায় তা হলো, আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক বান্দাদের সঙ্গে-থাকার অর্থ হলো- তিনি তাদের সকল বিষয় জানেন, তিনি তাদের ওপর সাক্ষী, তিনি সকল বিষয়ের ওপর আধিপত্যশীল ও সর্বজ্ঞানী। এটাই হলো সালাফদের কথার অর্থ যে, ‘তিনি তাঁর জ্ঞানের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে আছেন।’ এটাই হলো আল্লাহ তা‘আলার বাণীর বাহ্যিক অর্থ ও হাকীকত। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা‘আলার নিম্নোক্ত দুটি বাণীরও একই অর্থ। আর তা হলো:
﴿مَا يَكُونُ مِن نَّجۡوَىٰ ثَلَٰثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمۡ﴾ [المجادلة: ٧]
তিন জনের কোন গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থজন হিসেবে আল্লাহ থাকেন না।
এরপর তিনি বলেছেন:
﴿هُوَ مَعَهُمۡ أَيۡنَ مَا كَانُواْۖ ﴾ [المجادلة: ٧]
তিনি তো তাদের সংগেই আছেন, তারা যেখানেই থাকুক না কেন। (সূরা আল মুজাদালা: ৫৮: ৭)
আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গারে ছাওরে তাঁর সাথীকে যে বলেছিলেন:
﴿لَا تَحۡزَنۡ إِنَّ ٱللَّهَ مَعَنَاۖ ﴾ [التوبة: ٤٠]
তুমি পেরেশান হয়ো না, নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। (আত-তাওবা: ৯: ৪০)
এখানেও ‘আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন’ বাহ্যিক অর্থেই। আর সার্বিক অবস্থা থেকে বুঝা গেলো যে এখানে সাথে-থাকার অর্থ – জ্ঞান ও সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে সঙ্গে থাকা।
এরপর তিনি বলেন: “ معية (সঙ্গে-থাকা) শব্দটি কুরআন-সুন্নাহর বিভিন্ন জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে। প্রতি জায়গার দাবি অনুযায়ী তার অর্থ নির্ণিত হবে। হয়তো ভিন্ন ভিন্ন জায়গা অনুযায়ী এ শব্দের অর্থ ভিন্ন ভিন্ন হয়েছে অথবা সকল স্থানে এক এক মাত্রার সম্মিলিত অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যদিও প্রত্যেক জায়গায়ই শব্দটি আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যযুক্ত। তবে যে অর্থেই হোক না কেন, কোনো স্থলেই অর্থ এটা নয় যে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সত্তাসহ মাখলুকের সঙ্গে মিশে আছেন। যদি মিশে থাকতেন তবে বলা শুদ্ধ হতো যে বাহ্যিক অর্থ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।”
সঙ্গে-থাকার দাবি এটা নয় যে, আল্লাহ তা‘আলার সত্তা মাখলুকের সঙ্গে মিশে থাকে, এর দলিল হলো আল্লাহ তা‘আলা সূরায়ে মুজাদালার আয়াতের শুরুতে এবং শেষে তাঁর সর্বব্যাপী ইলমের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন:
﴿ أَلَمۡ تَرَ أَنَّ ٱللَّهَ يَعۡلَمُ مَا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِي ٱلۡأَرۡضِۖ مَا يَكُونُ مِن نَّجۡوَىٰ ثَلَٰثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمۡ وَلَا خَمۡسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمۡ وَلَآ أَدۡنَىٰ مِن ذَٰلِكَ وَلَآ أَكۡثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمۡ أَيۡنَ مَا كَانُواْۖ ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا عَمِلُواْ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِۚ إِنَّ ٱللَّهَ بِكُلِّ شَيۡءٍ عَلِيمٌ ٧ ﴾ [المجادلة: ٧]
তুমি কি লক্ষ্য করনি যে, আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে নিশ্চয় আল্লাহ তা জানেন? তিন জনের কোন গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থজন হিসেবে আল্লাহ থাকেন না, আর পাঁচ জনেরও হয় না, যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি থাকেন না। এর চেয়ে কম হোক কিংবা বেশি হোক, তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন, তারা যেখানেই থাকুক না কেন। তারপর কিয়ামতের দিনে তিনি তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জানিয়ে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সব বিষয়ে সম্যক অবগত। (আল মুজাদালা: ৫৮: ৭)
উক্ত আয়াতের বাহ্যিক অর্থানুযায়ী, এখানে বান্দাদের ‘সঙ্গে-থাকা’র দাবি হলো- আল্লাহ তা‘আলা তাদের সম্পর্কে পূর্ণ ইলম রাখেন এবং তাদের আমল ও কর্মের কোনো কিছুই তাঁর কাছে গোপন নয়। এখানে অর্থ এটা নয় যে আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদের সঙ্গে মিশে আছেন, অথবা তিনি তাদের সঙ্গে জমিনের ওপর আছেন।
অনুরূপভাবে সূরায়ে হাদীদের আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা প্রথমে আরশের ওপরে উঠার কথা, তাঁর ব্যাপক ইলমের কথা বলেছেন এরপর তিনি বান্দাদের সঙ্গে থাকার কথা উল্লেখ করেছেন এবং পরিশেষে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন যে বান্দারা যা আমল করে সে সম্পর্কে তিনি সর্বদ্রষ্টা। ইরশাদ হয়েছে:
﴿ هُوَ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٖ ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰ عَلَى ٱلۡعَرۡشِۖ يَعۡلَمُ مَا يَلِجُ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَمَا يَخۡرُجُ مِنۡهَا وَمَا يَنزِلُ مِنَ ٱلسَّمَآءِ وَمَا يَعۡرُجُ فِيهَاۖ وَهُوَ مَعَكُمۡ أَيۡنَ مَا كُنتُمۡۚ وَٱللَّهُ بِمَا تَعۡمَلُونَ بَصِيرٞ ٤ ﴾ [الحديد: ٤]
তিনিই আসমানসমূহ ও জমিন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনি আরশে উঠেছেন। তিনি জানেন জমিনে যা কিছু প্রবেশ করে এবং তা থেকে যা কিছু বের হয়; আর আসমান থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উত্থিত হয়। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথেই আছেন। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা। (আল হাদীদ: ৫৭: ৪)
এ আয়াতের বাহ্যিক অর্থ এটা যে আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদের সঙ্গে আছেন। তবে এ সঙ্গে থাকার অর্থ বান্দাদের বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখা, বান্দাদের সকল আমল দেখা যদি সর্বোচ্চতায় আরশের ওপরে আছেন। আয়াতের অর্থ এটা নয় যে আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদের সঙ্গে মিশে আছেন, অথবা তাদের সঙ্গে জমিনে আছেন; কেননা এরূপ অর্থ হলে আয়াতের শুরুর অংশে আল্লাহ তা‘আলার সর্বোচ্চতা ও আরশের ওপরে থাকার যে কথা রয়েছে তার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে যাবে।
অতএব আমরা বুঝতে পারলাম যে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের সঙ্গে আছেন এর দাবি হলো যে আল্লাহ তা‘আলা তাদের অবস্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞাত, তিনি তাদের কথাবার্তার সর্বশ্রোতা, তিনি তাদের আমলসমূহের সর্বদ্রষ্টা, তিনি তাদের সকল বিষয় নিয়ন্ত্রণকারী। তিনি তাদের জীবনদানকারী, মৃত্যুদাতা, ধনাঢ্য দাতা ও দরিদ্রকারী। তিনি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা রাজত্ব থেকে বঞ্চিত করেন, তিনি যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন, ইত্যাদি ইত্যাদি যা আল্লাহ তা‘আলার রুবুবিয়াত ও তার পরিপূর্ণ ক্ষমতা দাবি করে। সৃষ্টিজগতে হস্তক্ষেপ থেকে কোনো কিছুই আল্লাহ তা‘আলাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে না। যার এই শান তিনি প্রকৃত অর্থেই তাঁর সৃষ্টির সাথে, যদিও তিনি তাদের ঊর্ধ্বে আরশের ওপরে প্রকৃত অর্থে।
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া ‘আল আকীদা আল ওয়াসেতিয়া’য় আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক বান্দার সাথে থাকার ব্যাপারে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন- ‘আল্লাহ তা‘আলা আরশের ওপরে থাকা এবং একই মুহূর্তে আমাদের সঙ্গে থাকার ব্যাপারে যা কিছু বললেন, তা প্রকৃত অর্থেই। এ ক্ষেত্রে কোনো অর্থবিকৃতির প্রয়োজন নেই। তবে অবশ্যই মিথ্যা ধারণা থেকে আল্লাহ তা‘আলার প্রতি আমাদের বিশ্বাসকে বাঁচাতে হবে।’ (মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৪২)
তিনি আল ফাতওয়া আল হামাবিয়া (মাজমুউল ফাতাওয়া, পৃষ্ঠা ১০২, ১০৩)- তে বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে সার কথা হলো, যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহ গভীরভাবে অধ্যায়ন করবে সে পরিপূর্ণ হিদায়েত ও আলো লাভ করতে সক্ষম হবে, যদি সে সত্যের অনুসরণকে উদ্দেশ্য বানায়, তাহরীফ ও বিকৃতি থেকে বেঁচে থাকে এবং আল্লাহ তা‘আলার নাম ও সিফাতের ক্ষেত্রে ইলহাদ ও বিকৃতির আশ্রয় নেওয়া থেকে বিরত থাকে।’
আর কোনো ধারণাকারী এ ধারণা করবে না যে, উল্লিখিত বিষয়ের একটি অন্যটির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যেমন কেউ বলল যে, ‘আল্লাহ তা‘আলা আরশের ওপরে আছেন এ ব্যাপারে কুরআন-সুন্নায় যে বক্তব্য এসেছে তার বিপরীত বক্তব্য রয়েছে নিম্নবর্ণিত আয়াত ও হাদীসে। আয়াতটি হলো, (وَهُوَ مَعَكُمْ ) ‘আর তিনি তোমাদের সাথেই আছেন’, আর হাদীসটি হলো, إذا قام أحدكم إلى الصلاة فإن الله قبل وجهه ‘যখন তোমাদের কেউ সালাতে দাঁড়ায় তখন আল্লাহ তা‘আলা নিশ্চয় তাঁর সম্মুখেই থাকেন’। এ জাতীয় ধারণা অর্থাৎ (আল্লাহ তা‘আলা তাঁর আরশের উপর উঠা সংক্রান্ত) উল্লিখিত বক্তব্যের সঙ্গে উক্ত আয়াত ও হাদীসটি সাংঘর্ষিক, এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
আর তা এ জন্যে যে আল্লাহ তা‘আলা প্রকৃত অর্থেই আমাদের সঙ্গে আছেন, যেমন তিনি প্রকৃত অর্থেই আরশের ওপরে আছেন। এক আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা এ উভয় বিষয়কে একত্র করে বলেছেন:
﴿ هُوَ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٖ ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰ عَلَى ٱلۡعَرۡشِۖ يَعۡلَمُ مَا يَلِجُ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَمَا يَخۡرُجُ مِنۡهَا وَمَا يَنزِلُ مِنَ ٱلسَّمَآءِ وَمَا يَعۡرُجُ فِيهَاۖ وَهُوَ مَعَكُمۡ أَيۡنَ مَا كُنتُمۡۚ وَٱللَّهُ بِمَا تَعۡمَلُونَ بَصِيرٞ ٤ ﴾ [الحديد: ٤]
তিনিই আসমানসমূহ ও জমিন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনি আরশে উঠেছেন। তিনি জানেন জমিনে যা কিছু প্রবেশ করে এবং তা থেকে যা কিছু বের হয়; আর আসমান থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উত্থিত হয়। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথেই আছেন। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা। (সূরা আল হাদীদ: ৫৭: ৪)
আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াতে আমাদের এ সংবাদ দিয়েছেন যে তিনি আরশের ওপরে আছেন। তিনি সকল বিষয়ে সুপরিজ্ঞাত এবং আমরা যেখানেই থাকি না কেন তিনি আমাদের সঙ্গেই আছেন। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীসে বলেছেন: والله فوق العرش، وهو يعلم ما أنتم عليه (আর আল্লাহ তা‘আলা আরশের ওপরে, তোমরা যে অবস্থায় আছ, আল্লাহ তা‘আলা তা জানেন।)
আল্লাহ তা‘আলার শানের জন্য যেভাবে উপযোগী সেভাবে তিনি বান্দার সঙ্গে থাকেন, এ কথার সঙ্গে, আল্লাহ তা‘আলা আরশের ওপরে আছেন, এর কোনো সংঘর্ষ নেই। বিষয়টি আমরা তিনভাবে বুঝতে পারি:
এক: আল্লাহ তা‘আলা এ উভয় বিষয়কে তাঁর কিতাবে একত্র করেছেন। যে কিতাব সকল বৈপরীত্ব থেকে মুক্ত। আর যে দুটি বিষয়কে আল্লাহ তা‘আলা একত্র করেছেন সে দুটির মাঝে কোনো বৈপরীত্ব থাকতে পারে না।
আর আল কুরআনের কোনো বিষয়ে বৈপরীত্য আছে বলে যদি ধারণা হয়, তাহলে আপনার উচিত হবে গভীরভাবে অধ্যয়ন করা যাতে প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ পায় (অবৈপরীত্য বুঝা যায়)। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿ أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ ٱلۡقُرۡءَانَۚ وَلَوۡ كَانَ مِنۡ عِندِ غَيۡرِ ٱللَّهِ لَوَجَدُواْ فِيهِ ٱخۡتِلَٰفٗا كَثِيرٗا ٨٢ ﴾ [النساء: ٨٢]
তারা কি কুরআন নিয়ে গবেষণা করে না? আর যদি তা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে হত, তবে অবশ্যই তারা এতে অনেক বৈপরীত্য দেখতে পেত। (সূরা আন-নিসা: ৪: ৮২)
যদি গভীরভাবে অধ্যয়নের পরও বিষয়টি স্পষ্ট না হয়, তাহলে যারা পাকাপোক্ত জ্ঞানের অধিকারী তাদের পথ অবলম্বন করতে হবে, যারা বলেন যে,
﴿ءَامَنَّا بِهِۦ كُلّٞ مِّنۡ عِندِ رَبِّنَاۗ وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّآ أُوْلُواْ ٱلۡأَلۡبَٰبِ ٧ ﴾ [ال عمران: ٧]
আমরা এগুলোর প্রতি ঈমান আনলাম, সবগুলো আমাদের রবের পক্ষ থেকে। (সূরা আলে ইমরান: ৩: ৭)
অতএব বিষয়টিকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করতে হবে যিনি এ ব্যাপারে সুপরিজ্ঞাত। জেনে রাখবেন, যদি কোনো ত্রুটি থাকে তবে তা আপনার জ্ঞান ও বুঝের মধ্যে রয়েছে। পক্ষান্তরে আল কুরআন সকল বৈপরীত্য থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।”
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া র. তার কথা (যেমন আল্লাহ তা‘আলা এ দুটিকে একত্র করেছেন) দ্বারা এ দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।
ইমাম ইবনুল কাইয়েম র. বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা অবশ্যই সংবাদ দিয়েছেন যে তিনি তাঁর সৃষ্টির সাথে আছেন যদিও তিনি আরশের ওপরে আছেন। আর আল্লাহ তা‘আলা এ দুটিকে একত্র করে উল্লেখ করেছেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন- এখানে তিনি সূরা আল-হাদীদের আয়াতটি উল্লেখ করেছেন- এরপর তিনি বলেছেন: অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা সংবাদ দিয়েছেন যে তিনি আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি তাঁর আরশের ওপরে উঠেছেন। তিনি তাঁর বান্দাদের সাথে আছেন এ অর্থে যে তিনি আরশের ওপর থেকেই তাদের আমল দেখছেন, যেমন হাদীসে এসেছে: (আর আল্লাহ তা‘আলা আরশের ওপরে, তোমরা যে অবস্থায় আছ তিনি তা দেখছেন।) অতএব আল্লাহ তা‘আলার ঊর্ধ্বতা এবং মাখলুকের সঙ্গে থাকা, এ দুটির মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই। আর মাখলুকের সঙ্গে থাকা আল্লাহ তা‘আলার ঊর্ধ্বতাকে বাতিল করে দেয় না। বরং উভয়টিই সত্য।’
দুই. ‘সঙ্গে থাকা’র প্রকৃত অর্থ উর্ধ্বতার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। বরং এ উভয় বিষয় সৃষ্টিবস্তুর ক্ষেত্রেও একত্র হতে পারে। উদাহরণত যদি কেউ বলে যে ‘আমরা এখনও এ অবস্থায় চলছি যে চাঁদ আমাদের সাথে।’ তাহলে এ কথার দ্বারা কোনো বৈপরীত্য বুঝা যাবে না। কেউ এরূপ বুঝবে না যে, চাঁদ মাটিতে নেমে এসেছে এবং আমাদের সঙ্গে চলতে শুরু করেছে। যদি সৃষ্টিবস্তুর ক্ষেত্রে এরূপ সম্ভব হয়, তাহলে সৃষ্টিকর্তা, যিনি সকল বিষয়কে পরিবেষ্টিত করে আছে, তিনি উর্ধ্বে থাকা সত্ত্বেও মাখলুকের সঙ্গে অবশ্যই থাকতে পারেন। এটা এ কারণে যে ‘সঙ্গে থাকা’র প্রকৃত অর্থ এক জায়গায় একত্র হওয়াকে আবশ্যক করে না।
এ দিকে ইঙ্গিত করেই ইমাম ইবনে তাইমিয়া র. বলেছেন যে, আরবীতে مع (সঙ্গে) শব্দটি যখন ব্যবহৃত হয় তখন এর বাহ্যিক অর্থ হয় সাধারণভাবে তুলনা করা, যা আবশ্যিকভাবে পরস্পর পরস্পরকে স্পর্শ অথবা একে অন্যের ডানে বা বামে থাকাকে দাবি করে না। যদি ‘সঙ্গে থাকা’র অর্থকে বিশেষ কোনো বস্তু বা ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে উল্লিখিত হয়, তবে তা সে বিশেষ অর্থ-কেন্দ্রিক তুলনাকে বুঝাবে। বলা হয় যে, আমরা এখনও চলছি আর চাঁদ আমাদের সঙ্গে, অথবা তারকা আমাদের সঙ্গে। আরও বলা হয় যে ‘এ বস্তুটি আমার সঙ্গে’ যদিও তা আপনার মাথার ওপরে। কেননা আপনার উদ্দেশ্য হলো এ বস্তুর সঙ্গে আপনার সম্পৃক্ততা বর্ণনা করা। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা‘আলাও প্রকৃত অর্থেই তাঁর মাখলুকের সঙ্গে আছেন যদিও তিনি প্রকৃত অর্থেই তাঁর আরশের ওপরে আছেন।’
তিন. যদি মেনেও নেই যে ‘সঙ্গে থাকা’ এবং ঊর্ধ্বতা এ দুটি বিষয় কোনো সৃষ্টিবস্তুর ক্ষেত্রে একত্র হতে পারে না, তবুও বলব যে আল্লাহ তা‘আলার ক্ষেত্রে এ দুটি বিষয় একত্র হওয়া নিষিদ্ধ নয়। কেননা তিনি নিজেই এ দুটি বিষয়কে একত্র করেছেন। কারণ আল্লাহ তা‘আলা অতুলনীয়, তাঁর সঙ্গে কোনো মাখলুকের তুলনা হয় না। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ ١١ ﴾ [الشورى: ١١]
তাঁর মতো কোনো জিনিস নেই, আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। (আশ-শুরা: ৪২: ১১)
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া এ দিকে ইঙ্গিত করেই ‘আল আকীদা আল ওয়াসেতিয়া’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘কুরআন-সুন্নাহয় আল্লাহ তা‘আলার নিকটতা অথবা সঙ্গে থাকার যে কথা বলা হয়েছে তা আল্লাহ তা‘আলার ঊর্ধ্বতা ও সর্বোচ্চতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। কেননা আল্লাহ তা‘আলার গুণসমগ্রের কোনোটির ক্ষেত্রেই তাঁর তুল্য কোনো বিষয় নেই। তিনি শীর্ষে থেকেও কাছে এবং নিকটে থেকেও ঊর্ধ্বে।’
পরিশিষ্ট: আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সৃষ্টির সঙ্গেই আছেন, এ বিশ্বাসের ক্ষেত্রে মানুষ তিন ভাগে বিভক্ত:
প্রথম ভাগ:
এদের বক্তব্য হলো ‘আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে আছেন’, এখানে ‘সঙ্গে থাকা’র দ্বারা যদি সাধারণভাবে সঙ্গে থাকাকে বুঝায় তবে এর অর্থ হবে, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর জ্ঞানে ও সর্বব্যাপী ক্ষমতায় সৃষ্টির সঙ্গে রয়েছেন। আর যদি বিশেষভাবে সঙ্গে থাকাকে বুঝায় তবে এর অর্থ হবে, সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে তিনি থাকেন। যদিও আল্লাহ তা‘আলা সত্তাগতভাবে সর্বোর্ধ্বে এবং আরশের ওপরে।
এঁরাই হলেন সালাফ এবং এঁদের মাযহাবই হলো সত্য। যেমনটি ওপরে বর্ণিত হয়েছে।

দ্বিতীয় ভাগ:
এদের বক্তব্য হলো, ‘আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে আছেন’ এ কথার দাবি হলো, আল্লাহ তা‘আলা জমিনে তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে আছেন। তারা আল্লাহ তা‘আলার সর্বোর্ধ্বে থাকা এবং আরশের ওপরে থাকাকে নাকচ করে দেন। এরা হলেন প্রাচীন জাহমিয়া ফেরকার অন্তর্গত হুলুলিয়া গোষ্ঠী। এদের মাযহাব বাতিল ও অগ্রহণযোগ্য। সালাফগণ এদের মাযহাব বাতিল হওয়া এবং প্রত্যাখ্যান করার ব্যাপারে একমত। যেমনটি ওপরে বর্ণনা করা হয়েছে।

তৃতীয় ভাগ:
এদের বক্তব্য হলো, ‘আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে আছেন’, এর দাবি হলো আল্লাহ তা‘আলা তাদের সঙ্গে জমিনে আছেন এবং একই সঙ্গে সর্বোর্ধ্বে আরশের ওপরেও আছেন। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া এদের বক্তব্যকে মাজমুউল ফাতাওয়ায় তুলে ধরেছেন।
এরা মনে করেছেন যে ‘সঙ্গে থাকা’ এবং ‘ঊর্ধ্বতা’ এ উভয় বিষয়ে যেসব টেক্সট রয়েছে তার বাহ্যিক অর্থকে তারা ধারণ করতে পেরেছেন। কিন্তু তারা মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন এবং পথভ্রষ্ট হয়েছেন। কেননা ‘সঙ্গে থাকা’ বিষয়ে যেসব টেক্সট রয়েছে তা মাখলুকের সঙ্গে সত্তাগতভাবে আল্লাহ তা‘আলার মিশে থাকাকে দাবি করে না। এটা বরং বাতিল। আর আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের কথার বাহ্যিক অর্থ কোনো বাতিল বিষয় হতে পারে না।

একটি সতর্কতা
‘আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে আছেন’ আমাদের সালাফগণ যখন এর ব্যাখ্যা এভাবে দিয়েছেন যে তিনি তাঁর জ্ঞানের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে আছেন, তখন এ ব্যাখ্যার দাবি এটা নয় যে তিনি কেবল তাঁর জ্ঞানের মাধ্যমেই তাদের সঙ্গে আছেন। বরং এর দাবি এটাও যে তিনি তাঁর শ্রবণ, দর্শন, ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ এবং রুবুবিয়াতের এ জাতীয় আরও যে অর্থসমূহ রয়েছে এসব দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা তাদের পরিবেষ্টন করে আছেন।

আরেকটি সতর্কতা
বিগত পৃষ্ঠাগুলোয় এ ব্যাপারে ইঙ্গিত করেছি যে আল্লাহ তা‘আলার উর্ধ্বাবস্থান কুরআন, সুন্নাহ, যুক্তিবুদ্ধি, ফিতরত ও ইজমা দ্বারা প্রমাণিত।

আল কুরআনের প্রমাণ
আল্লাহ তা‘আলার ঊর্ধ্বাবস্থান আল কুরআন দ্বারা বিভিন্নভাবে প্রমাণিত। কখনো ‘উলু’ (ঊর্ধ্বতা), কখনো ‘ফাওকিইয়া’ (ওপরে থাকা), কখনো ইস্তিওয়া ‘আলাল আরশ (আরশের ওপরে ওঠা), কখনো ‘আকাশে থাকা’ ইত্যাদি শব্দের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। যেমন নিম্নোক্ত আয়াতসমূহে:
﴿وَهُوَ ٱلۡعَلِيُّ ٱلۡعَظِيمُ ٢٥٥ ﴾ [البقرة: ٢٥٥]
আর তিনি সুউচ্চ, মহান। (আল বাকারা: ২: ২৫৫)
﴿ وَهُوَ ٱلۡقَاهِرُ فَوۡقَ عِبَادِهِۦۚ﴾ [الانعام: ١٨]
আর তিনিই তাঁর বান্দাদের উপর ক্ষমতাবান। (আল আনআম: ৬: ১৮)
﴿ ٱلرَّحۡمَٰنُ عَلَى ٱلۡعَرۡشِ ٱسۡتَوَىٰ ٥ ﴾ [طه: ٥]
পরম করুণাময় আরশের ওপর উঠেছেন। (তাহা: ২০: ৫)
﴿ ءَأَمِنتُم مَّن فِي ٱلسَّمَآءِ أَن يَخۡسِفَ بِكُمُ ٱلۡأَرۡضَ فَإِذَا هِيَ تَمُورُ ١٦ ﴾ [الملك: ١٦]
যিনি আসমানে আছেন, তিনি তোমাদেরসহ জমিন ধ্বসিয়ে দেওয়া থেকে কি তোমরা নিরাপদ হয়ে গেছ? (আল মুলক: ৩৭: ১৬)
আবার কখনো আল্লাহর পানে বিভিন্ন বিষয়ের ঊর্ধ্বগমন, ওপরের দিকে ওঠা এবং আল্লাহর দিকে উঠিয়ে নেওয়া এ জাতীয় শব্দ দ্বারা আল কুরআন আল্লাহ তা‘আলার ঊর্ধ্বাবস্থানকে নির্দেশ করেছে। যেমন নিম্নোক্ত উদাহরণসমূহে:
﴿إِلَيۡهِ يَصۡعَدُ ٱلۡكَلِمُ ٱلطَّيِّبُ﴾ [فاطر: ١٠]
তাঁরই পানে উত্থিত হয় ভাল কথা। (ফাতির: ৩৫: ১০)
﴿ تَعۡرُجُ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ وَٱلرُّوحُ إِلَيۡهِ﴾ [المعارج: ٤]
ফেরেশতাগণ ও রূহ এমন এক দিনে আল্লাহর পানে ঊর্ধ্বগামী হয়। (আল মাআরিজ: ৭০: ৪)
﴿ إِذۡ قَالَ ٱللَّهُ يَٰعِيسَىٰٓ إِنِّي مُتَوَفِّيكَ وَرَافِعُكَ إِلَيَّ﴾ [ال عمران: ٥٥]
স্মরণ কর, যখন আল্লাহ বললেন, ‘হে ঈসা, নিশ্চয় আমি তোমাকে পরিগ্রহণ করব, তোমাকে আমার দিকে উঠিয়ে নেব।’ (আলে ইমরান: ৩: ৫৫)
আবার কখনো বা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে কোনো কিছু ‘অবতরণ করা’ ও তৎসংলগ্ন শব্দ দিয়ে আল কুরআন আল্লাহ তা‘আলার ঊর্ধ্বাস্থানকে প্রমাণিত করেছে, যেমন নিম্নোক্ত আয়াতদ্বয়ে:
﴿ قُلۡ نَزَّلَهُۥ رُوحُ ٱلۡقُدُسِ مِن رَّبِّكَ ﴾ [النحل: ١٠٢]
বল, রুহুল কুদস (জীবরীল) একে (কুরআনকে) তোমার রবের পক্ষ হতে যথাযথভাবে নাযিল করেছেন। (সূরা আন-নাহল: ১৬: ১০২)
﴿ يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَ مِنَ ٱلسَّمَآءِ إِلَى ٱلۡأَرۡضِ ثُمَّ يَعۡرُجُ إِلَيۡهِ﴾ [السجدة: ٥]
তিনি আসমান থেকে জমিন পর্যন্ত সকল কার্য পরিচালনা করেন। তারপর তা তাঁরই দিকে উত্থিত হয়। (আস-সাজদাহ: ৩২: ৫)

সুন্নতের প্রমাণ
আল্লাহ তা‘আলার সুউচ্চ অবস্থান কথা, কর্ম ও অনুমোদন এ তিন প্রকার সুন্নত দ্বারাই প্রমাণিত এবং তা বহু হাদীসে নানাভাবে এসেছে এবং সবগুলো মিলে মুতাওয়াতিরের পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে। নিম্নে এ জাতীয় কিছু হাদীস উল্লেখ করা হলো:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিজদারত অবস্থায় বলেছেন:
سبحان ربي الأعلى
(পবিত্র মহান আমার রব, যিনি সর্বোচ্চ)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীসে বলেছেন:
إن الله لما قضى الخلق كتب عنده فوق عرشه: إن رحمتي سبقت غضبي
আল্লাহ তা‘আলা যখন সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি তাঁর কাছে আরশের ওপর লিখলেন, নিশ্চয় আমার রহমত আমার রাগ থেকে অগ্রগামী হয়েছে ।
অন্য এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
ألا تأمنوني وأنا أمين من في السماء
তোমরা কি বিশ্বাস করবে না; অথচ আমি হলাম যিনি আকাশে আছেন তাঁর বিশ্বাসের পাত্র।
হাদীস দ্বারা আরো প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমার দিন মিম্বারে থাকা অবস্থায় দু’হাত উত্তোলন করেছেন এবং বলেছেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাদের উদ্ধার করুন! ’
আর তিনি আরাফার দিন খুতবা প্রদানকালে আকাশের দিকে হাত উত্তোলন করেছেন যখন মানুষেরা বলেছে, ‘আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি পৌঁছে দিয়েছেন, দায়িত্ব আদায় করেছেন এবং নসীহত করেছেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, اللهم اشهد ( হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন) ।
একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক কৃতদাসীকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘আল্লাহ কোথায়?’ উত্তরে সে বলল যে, ‘আসমানে’। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কথা মেনে নিলেন এবং তার মনিবকে বললেন, ‘তাকে আযাদ করে দাও, নিশ্চয় সে মুমিনা’ ।

যুক্তিনির্ভর প্রমাণ
আল্লাহ তা‘আলা সকল পূর্ণাঙ্গ গুণাবলিতে গুণান্বিত এবং সকল অপূর্ণাঙ্গ গুণাবলি হতে পবিত্র, মানুষের আকল বুদ্ধি এ বিষয়টিকে আবশ্যক মনে করে। আর ঊর্ধ্বাবস্থান হলো আল্লাহ তা‘আলার পূর্ণাঙ্গ গুণাবলির একটি। আর নিম্নাবস্থান হলো একটি অপূর্ণাঙ্গ গুণ। অতএব ঊর্ধ্বাবস্থানের গুণে গুনান্বিত থাকা এবং এর বিপরীতটা থেকে পবিত্র থাকা আল্লাহ তা‘আলার জন্য একটি আবশ্যক বিষয়।

ফিতরতের প্রমাণ
ফিতরত বা সুস্থ মানবপ্রকৃতি আল্লাহ তা‘আলার ঊর্ধ্বাবস্থানকে অত্যন্ত প্রাকৃতিকভাবেই নির্দেশ করে। এমন কোনো প্রার্থনাকারী বা ভীতু-আতঙ্কগ্রস্ত ব্যক্তি নেই যে শাণিত আগ্রহ নিয়ে আল্লাহর পানে ছুটে যায় অথচ ডানে বামে না তাকিয়ে কেবল ঊর্ধ্বপানে অনুভূতি ব্যক্ত করার আগ্রহ অন্তরে জাগ্রত হয় না।
আপনি মুসল্লীদের জিজ্ঞাসা করে দেখুন তারা যখন سبحان ربي الأعلى (পবিত্র মহান আমার রব, যিনি সর্বোচ্চ) এ কথা বলে তখন তাদের অন্তর কোন দিকে ধাবিত হয়?

ইজমার প্রমাণ
সাহাবী, তাবেঈ ও ইমামগণ এ ব্যাপারে ঐক্যমত্য পোষণ করেছেন যে, আল্লাহ তা‘আলা আসমানসমূহের ঊর্ধ্বে আরশের ওপরে আছেন। এ ক্ষেত্রে তাদের কথা খুবই প্রসিদ্ধ। ইমাম আওযা‘ঈ র. বলেন:
كنا، والتابعون متوافرون، نقول: إن الله تعالى ذكره فوق عرشه، ونؤمن بما جاءت به السنة من الصفات
তাবে‘ঈগণ পর্যাপ্ত পরিমাণে বর্তমান থাকা অবস্থায় আমরা বলতাম যে, নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা আরশের ওপরে, আর আমরা ঈমান আনি সিফাত সম্পর্কে সুন্নতে যা এসেছে তার প্রতি।
আলেমদের মধ্যে একাধিক ব্যক্তি এ ব্যাপারে ইজমা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। এ ক্ষেত্রে কোনো ইখতিলাফ, মতানৈক্য নেই, থাকা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে বহু বড় বড় প্রমাণ একত্র হয়েছে যেগুলোর বিপরীতে কেবল ওই অহঙ্কারী ব্যক্তিই যেতে পারে যার অন্তরাত্মা মুছে দেওয়া হয়েছে এবং শয়তান তার ফিতরতকে কলুষিত করে দিয়েছে। আল্লাহ তা‘আলার কাছে আমরা নিরাপত্তা ও পরিত্রাণ কামনা করি।
সত্তা ও গুণাবলিতে আল্লাহ তা‘আলার ঊর্ধ্বাবস্থান সকল বিষয়ের মধ্যে অধিক স্পষ্ট এবং বাস্তবতার নিরিখে অধিক প্রতিষ্ঠিত বিষয়, যার প্রমাণাদি অতি সুস্পষ্ট।

তৃতীয় সতর্কতা
প্রিয় পাঠক! জেনে রাখুন যে, আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে থাকার ব্যাপারে ওপরে যে কথা বললাম সে জাতীয় কথা আমি আমার কিছু ছাত্রকে উদ্দেশ্য করে এক মজলিসে বলেছিলাম। আমি বলেছিলাম যে: আমাদের আকীদা হলো, আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক বান্দার সঙ্গে থাকার বিষয়টি আল্লাহ তা‘আলার শানের জন্য উপযোগী কায়দায় সত্ত্বাগতভাবে প্রকৃত অর্থেই। আর এর দাবি হলো, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর ইলম, কুদরত, শ্রবণ, দর্শন, আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ দ্বারা সব কিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন। তিনি তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে থাকা থেকে পবিত্র। অথবা তারা যে স্থলে আছে সে স্থলে অবস্থান করা থেকেও তিনি পবিত্র। বরং আল্লাহ তা‘আলা হলেন তাঁর সত্তা ও গুণাবলিতে সর্বোচ্চ। তাঁর সর্বোচ্চতা তাঁর সত্তাগত গুণাবলির অন্তর্ভুক্ত, যা কখনো তাঁর সত্তা থেকে আলাদা হয় না। আর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর আরশের ওপরে আছেন তাঁর শানের জন্য যেভাবে উপযোগী সেভাবে। আর এটা আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক তাঁর সৃষ্টির ‘সঙ্গে থাকা’র সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। কেননা,
﴿لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ ١١ ﴾ [الشورى: ١١]
‘আল্লাহ তা‘আলার মতো কোনো জিনিস নেই। আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (আশ্-শূরা: ১১)
ওপরে আমি বলেছি যে, আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক বান্দার সঙ্গে থাকার বিষয়টি আল্লাহ তা‘আলার শানের জন্য উপযোগী কায়দায় ‘সত্ত্বাগতভাবে ’প্রকৃত অর্থেই। এখানে ‘সত্তাগতভাবে’ বলার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ‘সঙ্গে থাকা’র প্রকৃত অর্থের প্রতি জোর দেওয়া।
আমি আমার কথা দ্বারা এটা বুঝাতে চাইনি যে, আল্লাহ তা‘আলা জমিনের ওপর তার সৃষ্টির সঙ্গে আছেন। এটা আমি কীভাবে বলতে পারি, আমি তো আমার ওই লেখাতেই বলেছি যে, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে মিশ্রিত হওয়া থেকে পবিত্র। অথবা তাদের জায়গায় অবস্থান করা থেকে পবিত্র। আর আল্লাহ তা‘আলা তার সত্তা ও গুণাবলিতে সর্বোচ্চ এবং তাঁর সর্বোচ্চতা তাঁর সত্তাগত একটি গুণ, যা আল্লাহ থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হয় না। আমি সে লেখায় এটাও বলেছি যে: ‘আমরা মনে করি, যে ব্যক্তি ধারণা করবে আল্লাহ তা‘আলা সত্তাগতভাবে সকল জায়গায় বিরাজমান সে কাফের অথবা পথভ্রষ্ট, যদি এটা তার আকীদা হয়ে থাকে। আর যদি সে এ ধারণাকে সালাফ অথবা ইমামদের কারও সঙ্গে সম্পৃক্ত করে তবে সে মিথ্যাবাদী।’
আর জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন কোনো ব্যক্তি, যে নাকি যথার্থরূপে আল্লাহ তা‘আলাকে কদর করে, তার পক্ষে এটা বলা সম্ভব নয় যে, আল্লাহ তা‘আলা জমিনে তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে রয়েছেন। আমি আমার সকল বৈঠকে, অতীতে যেমনি বর্তমানেও তেমনি, এ কথাটি অস্বীকার করে আসছি। দো‘আ করি, আল্লাহ তা‘আলা আমাকে এবং আমার সকল মুসলিম ভাইকে দুনিয়া ও আখিরাতে সত্য-সঠিক কথার ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন।
আমি এ ব্যাপারে, পরবর্তীতে রিয়াদ থেকে ছাপা আদ-দাওয়া পত্রিকায় (সংখ্যা ৯১১, তারিখ ৪ মুহাররাম, ১৪০৪ হি.) একটি প্রবন্ধ লিখেছি যেখানে ইমাম ইবনে তাইমিয়া যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন সেটিকেই তাগিদ করে বলেছি যে, আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে থাকা সত্য এবং প্রকৃত অর্থেই এবং তা হুলুল এবং সৃষ্টির সঙ্গে মিশে থাকাকে দাবি করে না। আমি এখানে ‘সত্তাগতভাবে’ শব্দটিকে বাদ দেওয়া জরুরি মনে করেছি। আল্লাহ তা‘আলার ঊর্ধ্বাবস্থান এবং সৃষ্টির সঙ্গে থাকা, এ দুটি কীভাবে আমরা একত্র করব তা আমি সেখানে বর্ণনা করেছি।
জেনে রাখুন যে প্রত্যেক এমন শব্দ যা আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক জমিনে অবস্থান অথবা সৃষ্টির সঙ্গে সংমিশ্রণকে আবশ্যক করে অথবা আল্লাহ তা‘আলার সর্বোচ্চ অবস্থানকে নাকচ করে দেয় অথবা আরশের ওপরে থাকাকে নাকচ করে দেয়, অথবা এমন কোনো বিষয়কে আবশ্যক করে যা আল্লাহ তা‘আলার জন্য উপযোগী নয়, তবে এমন শব্দ বাতিল বলে পরিগণিত হবে। এমন শব্দ যে উচ্চারণ করবে তাকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে, সে যেই হোক না কেন এবং যেকোনো শব্দ দিয়েই সে তা প্রকাশ করে থাক না কেন।
আর প্রত্যেক এমন শব্দ যার দ্বারা এমন ধারণা সৃষ্টি হতে পারে যা আল্লাহর জন্য উপযোগী নয় – হোক তা সীমিত কিছু মানুষের কাছে – তবে তা বর্জন করা জরুরি। যাতে আল্লাহর ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষণ করার সুযোগ না আসে। তবে আল্লাহ তা‘আলা নিজের জন্য তাঁর কিতাবে যা সাব্যস্ত করেছেন, অথবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যবানে যা সাব্যস্ত করেছেন, তা আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা ওয়াজিব এবং যেসব ধারণা আল্লাহর জন্য উপযোগী নয় সেসব ধারণাও বাতিল করে দেওয়া ওয়াজিব।

ষষ্ঠ ও অষ্টম উদাহরণ
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَنَحۡنُ أَقۡرَبُ إِلَيۡهِ مِنۡ حَبۡلِ ٱلۡوَرِيدِ ١٦ ﴾ [ق: ١٦]
আর আমি তার গলার ধমনী হতেও অধিক কাছে। (সূরা কাফ: ৫০: ১৬)
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে:
﴿ وَنَحۡنُ أَقۡرَبُ إِلَيۡهِ مِنكُمۡ﴾ [الواقعة: ٨٥]
আর তোমাদের চাইতে আমি তার অধিক কাছে। (সূরা আল ওয়াকিয়াহ: ৫৬: ৮৫)
তাফসীর গ্রন্থসমূহে উল্লিখিত দু‘ আয়াতে ‘অধিক কাছে’ বলতে ফেরেশতাদের বুঝানো হয়েছে।
জওয়াব
উল্লিখিত দু’ আয়াতে অধিক কাছে বলতে ফেরেশতারা অধিক কাছে বলে যে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তাতে বাণীকে তার বাহ্যিক অর্থ থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে না। গভীরভাবে চিন্তা করলে এ বিষয়টি আমাদের বুঝে আসে।
প্রথম আয়াত
এখানে ‘কাছে থাকা’র বিষয়টি এমন কিছুর সঙ্গে বন্ধনযুক্ত করে উল্লেখ করা হয়েছে যার দ্বারা ফেরেশতাদের নিকটতাকেই বুঝা যায়। যেহেতু আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَنَحۡنُ أَقۡرَبُ إِلَيۡهِ مِنۡ حَبۡلِ ٱلۡوَرِيدِ ١٦ إِذۡ يَتَلَقَّى ٱلۡمُتَلَقِّيَانِ عَنِ ٱلۡيَمِينِ وَعَنِ ٱلشِّمَالِ قَعِيدٞ ١٧ مَّا يَلۡفِظُ مِن قَوۡلٍ إِلَّا لَدَيۡهِ رَقِيبٌ عَتِيدٞ ١٨ ﴾ [ق: ١٦، ١٨]
আর অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয় তাও আমি জানি। আর আমি তার গলার ধমনী হতেও অধিক কাছে। যখন ডানে ও বামে বসা দু’জন লিপিবদ্ধকারী লিখতে থাকবে তার প্রত্যেক কর্ম ও কাজ সে যে কথাই উচ্চারণ করে তার কাছে সদা উপস্থিত সংরক্ষণকারী রয়েছে। (সূরা কাফ: ৫০: ১৬ – ১৭)
এখানে إِذْ يَتَلَقَّى (যখন… গ্রহণ করবে) দ্বারা এটা বুঝা যাচ্ছে যে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো লিপিবদ্ধকারী দুই ফেরেশতার নিকটতা।
দ্বিতীয় আয়াত
দ্বিতীয় আয়াতে যে ‘নিকটতা’র কথা বলা হয়েছে, তা বান্দার মৃত্যুকালীন অবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর মৃত্যুকালে বান্দার কাছে যারা উপস্থিত হন তারা হলেন ফেরেশতা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿حَتَّىٰٓ إِذَا جَآءَ أَحَدَكُمُ ٱلۡمَوۡتُ تَوَفَّتۡهُ رُسُلُنَا وَهُمۡ لَا يُفَرِّطُونَ ٦١ ﴾ [الانعام: ٦١]
অবশেষে যখন তোমাদের কারো কাছে মৃত্যু আসে, আমার প্রেরিত দূতগণ তার মৃত্যু ঘটায়। আর তারা কোনো ত্রুটি করে না। (সূরা আল আন‘আম: ৬: ৬১)
মানুষের মৃত্যুকালে ফেরেশতাই যে বান্দার নিকটে আসেন, এর আরেকটি প্রমাণ হলো আল্লাহ তা‘আলার কথা:
﴿وَلَٰكِن لَّا تُبۡصِرُونَ ٨٥ ﴾ [الواقعة: ٨٥]
কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না। (আল ওয়াকিয়া: ৫৬: ৮৫)
কেননা এ আয়াত থেকে বুঝা যাচ্ছে যে যিনি নিকটবর্তী হন তিনি ঠিক ওই জায়গাতেই নিকটবর্তী হন যে জায়গাতে মৃত্যুগামী ব্যক্তি রয়েছে। অথচ আমরা তাকে প্রত্যক্ষ করতে পারি না। এ বিষয়টি ফেরেশতা কর্তৃক নিকটতাকে নির্ধারণ করে দিচ্ছে; কেননা আল্লাহ তা‘আলার ক্ষেত্রে এ প্রকৃতির নিকটতা অসম্ভব।
একটি প্রশ্ন
এখানে একটি প্রশ্ন এভাবে উত্থাপিত হতে পারে যে, যদি ফেরেশতাই নিকটবর্তী হবেন তাহলে আল্লাহ তা‘আলা কেন বললেন যে, ‘আমি তার নিকটে’? অর্থাৎ ‘নিকটতা’-কে আল্লাহ তা‘আলা নিজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে কেন উল্লেখ করলেন? এ প্রকৃতির অভিব্যক্তির উদাহরণ কি অন্য কোথাও পাওয়া যায়?
উত্তর
আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতার নিকটতাকে তাঁর নিজের নিকটতা বলে উল্লেখ করেছেন; কারণ ফেরেশতার নিকটতা আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশেই ঘটে থাকে। ফেরেশতারা হলেন সৈন্য ও দূত।
ফেরেশতার নিকটতাকে আল্লাহ তা‘আলা নিজের নিকটতা বলে ব্যক্ত করার উদাহরণ আল কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় এসেছে, যেমন:
﴿ فَإِذَا قَرَأۡنَٰهُ فَٱتَّبِعۡ قُرۡءَانَهُۥ ١٨ ﴾ [القيامة: ١٨]
অতঃপর যখন আমরা তা পাঠ করি (জিবরাঈলের মাধ্যমে) তখন তুমি তার পাঠের অনুসরণ কর। (সূরা আল কিয়ামাহ: ৭৫: ১৮)
উক্ত আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি কুরআন পাঠ মূলত ফেরেশতা জিব্রীল আ. এর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা এ পাঠকে নিজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে বলেছেন, ‘যখন আমি তা পাঠ করি’। এটা এ হিসেবে যে, জিব্রীল আ. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আল্লাহর নির্দেশেই কুরআন পাঠ করেছেন। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা‘আলার বাণী-
﴿ فَلَمَّا ذَهَبَ عَنۡ إِبۡرَٰهِيمَ ٱلرَّوۡعُ وَجَآءَتۡهُ ٱلۡبُشۡرَىٰ يُجَٰدِلُنَا فِي قَوۡمِ لُوطٍ ٧٤ ﴾ [هود: ٧٤]
অতঃপর যখন ইবরাহীম থেকে ভয় দূর হল এবং তার কাছে সুসংবাদ এল, তখন সে লূতের কওম সম্পর্কে আমাদের সাথে বাদানুবাদ করতে লাগল। (সূরা হুদ: ১১: ৭৪)
এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, ইবরাহীম আ. লূত আ. কওম সম্পর্কে আল্লাহর সঙ্গে বাদানুবাদ করতে লাগলেন। অথচ আমরা জানি যে তিনি ফেরেশতাদের সঙ্গে বাদানুবাদ করতে লাগলেন। কিন্তু যেহেতু ফেরেশতারা আল্লাহর দূত হিসেবে এসেছিলেন সে হিসেবে তাদের সঙ্গে বাদানুবাদ করা এক অর্থে আল্লাহর সঙ্গেই বাদানুবাদ করা।

নবম ও দশম উদাহরণ
আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
﴿ تَجۡرِي بِأَعۡيُنِنَا﴾ [القمر: ١٤]
যা আমার চাক্ষুস তত্ত্বাবধানে চলত। (সূরা আল কামার: ৫৪: ১৪)
এবং মূসা আ. কে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
﴿وَلِتُصۡنَعَ عَلَىٰ عَيۡنِيٓ ٣٩ ﴾ [طه: ٣٩]
যাতে তুমি আমার চোখের সামনে প্রতিপালিত হও’। (তাহা: ৩৯)
জওয়াব:
উল্লিখিতি দু‘আয়াতের অর্থও বাহ্যিক ও প্রকৃত অর্থ। তবে এখানে বাহ্যিক ও প্রকৃত অর্থ বলতে কি বুঝানো হয়েছে?
এখানে কি এটা বুঝানো হয়েছে যে, নূহ আ. এর কিশতি আল্লাহর চোখে চলত? কারণ بِأَعْيُنِنَا এর আক্ষরিক অর্থ ‘আমার চোখে’? অথবা দ্বিতীয় আয়াত অনুযায়ী মূসা আ. কি আল্লাহর চোখের ওপর প্রতিপালিত হয়েছেন? কেননা عَلَى عَيْنِي এর আক্ষরিক অর্থ ‘আমার চোখের ওপর’?
নাকি বলা হবে যে, এখানে বাহ্যিক অর্থ হলো – নূহ আ. কিশতি এভাবে চলত যে আল্লাহর চক্ষু তাকে তত্ত্বাবধান করত, অনুরূপভাবে মূসা আ. এর প্রতিপালনও আল্লাহর চোখের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়েছে।
প্রথম কথাটি যে বাতিল এ ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। কারণ:
এক. আরবী ভাষার ব্যবহারগত দাবি উক্ত কথার পক্ষে নয়। আর পবিত্র কুরআন আরবী ভাষায় নাযিল হয়েছে: এরশাদ হয়েছে:
﴿ إِنَّآ أَنزَلۡنَٰهُ قُرۡءَٰنًا عَرَبِيّٗا لَّعَلَّكُمۡ تَعۡقِلُونَ ٢ ﴾ [يوسف: ٢]
নিশ্চয় আমি একে আরবী কুরআনরূপে নাযিল করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পার। (ইউসুফ: ১২: ২)
অন্য এক আয়াতে এসেছে:
﴿ نَزَلَ بِهِ ٱلرُّوحُ ٱلۡأَمِينُ ١٩٣ عَلَىٰ قَلۡبِكَ لِتَكُونَ مِنَ ٱلۡمُنذِرِينَ ١٩٤ بِلِسَانٍ عَرَبِيّٖ مُّبِينٖ ١٩٥ ﴾ [الشعراء: ١٩٣، ١٩٥]
বিশ্বস্ত আত্মা এটা নিয়ে অবতরণ করেছে। তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হও। সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়। (আশ-শু‘আরা: ২৬: ১৯৩ -১৯৫)
অতএব আরবী ভাষায় যদি কেউ বলে فلان يسير بعيني যার আক্ষরিক অর্থ হলো (অমুক ব্যক্তি আমার চোখে চলছে); কিন্তু কেউ কি উক্ত বাক্যটিকে এ অর্থে বুঝবে? বরং বাক্যটির প্রকৃত ও বাহ্যিক অর্থ হলো (অমুক ব্যক্তি আমার চোখের সামনে বা তত্তাবধানে চলছে)। অনুরূপভাবে যদি কেউ বলে যে فلان تخرج على عيني যার আক্ষরিক অর্থ হলো (অমুক ব্যক্তি আমার চোখের ওপর পড়া লেখা সম্পন্ন করেছে), কিন্তু কেউ কি এ অর্থে বাক্যটিকে বুঝবে? বরং বাক্যটি থেকে যে বাহ্যিক ও প্রকৃত অর্থ বুঝে থাকে তা হলো, (অমুক ব্যক্তি আমার চোখের সামনেই পড়ালেখা সম্পন্ন করেছে।) যদি কেউ উল্লিখিত দু‘বাক্যের আক্ষরিক অর্থকে বাহ্যিক ও প্রকৃত অর্থ বলতে চায় তবে জ্ঞানী ব্যক্তিদের কথা দূরে থাক মুর্খ ব্যক্তিরাও তাকে নিয়ে হাসবে।
দুই. উল্লিখিত দু‘আয়াতের বাহ্যিক ও প্রকৃত অর্থ নির্ধারণে প্রথমোক্ত কথাটি আল্লাহর জন্য কোনোক্রমেই সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা সম্পর্কে যে ব্যক্তির ইলম রয়েছে এবং যে ব্যক্তি তাঁকে যথার্থরূপে কদর করে, তাঁর পক্ষে এ ধরনের অর্থ নির্ধারণ করা কখোনই সম্ভব নয়; কেননা আল্লাহ তা‘আলা আরশের ওপরে আছেন এবং তিনি তাঁর সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা। তিনি মাখলুখের মাঝে সত্তাসহ অবস্থান করেন না। তিনি কোনো মাখলুকের অভ্যন্তরেও অবস্থান করেন না এবং আল্লাহর মধ্যেও তাঁর কোনো মাখলুক অবস্থান করে না। আল্লাহ তা‘আলা এসব থেকে পবিত্র ও ঊর্ধ্বে।
শব্দগত এবং অর্থগতভাবে উল্লিখিত দু‘আয়াতের বাহ্যিক ও প্রকৃত অর্থ নির্ধারণের ব্যাপারে প্রথম কথাটি স্পষ্টরূপে বাতিল বলে সাব্যস্ত হওয়ার পর দ্বিতীয় কথাটিই বাহ্যিক ও প্রকৃত অর্থ বলে সাব্যস্ত হয়ে যায়: অর্থাৎ নূহ আ. এর কিশতি এভাবে চলেছে যে আল্লাহর চক্ষু তাকে তত্ত্বাবধান করেছে। অনুরূপভাবে মূসা আ. এভাবে প্রতিপালিত হয়েছেন যে, আল্লাহর চক্ষু তাকে তত্ত্বাবধান করেছে। সালাফদের কেউ কেউ ‘আমার দৃষ্টির সামনে’ বলে যে অর্থ করেছেন তাও এ বিষয়টিকে বুঝাচ্ছে; কারণ আল্লাহ তা‘আলার যদি কাউকে তাঁর চক্ষু দ্বারা তত্ত্বাবধান করেন, তাহলে এ তত্ত্বাবধানের দাবি হলো যে তিনি তাকে দেখছেন। আর বিশুদ্ধ অর্থের দাবি হিসেবে যে অর্থ আসে তা ওই অর্থেরই অংশ। একটি শব্দ থেকে অর্থ উদ্ধারের সুবিদিত যে নিয়ম রয়েছে তার নিরিখেই এ জাতীয় অর্থ বিশুদ্ধ বলে পরিগণিত। আর আমরা জানি যে একটি শব্দ তিনভাবে তার অর্থনির্দেশ করে। ‘মুতাবাকাহ’ তথা হুবহু অর্থনির্দেশ, ‘তাদাম্মুন’ তথা শামিলগতভাবে অর্থনির্দেশ এবং ‘ইলতিযাম’ তথা দাবিগতভাবে অর্থনির্দেশ।

একাদশ উদাহরণ
হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
وما يزال عبدي يتقرب إلي بالنوافل حتى أحبه، فإذا أحببته كنت سمعه الذي يسمع به، وبصره الذي يبصر به، ويده التي يبطش بها، ورجله التي يمشي بها، ولئن سألني لأعطينه، ولئن استعاذني لأعيذنه
(আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নিকটতা অর্জন করতে থাকে এ পর্যন্ত যে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। আর আমি যখন তাকে ভালোবেসে ফেলি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে। আমি তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে। আমি তার হাত হয়ে যাই যা দিয়ে সে পাকড়াও করে। আমি তার পা হয়ে যাই যা দিয়ে সে হাঁটে। সে যদি আমার কাছে চায় তবে আমি তাকে অবশ্যই দিই। সে যদি আমার আশ্রয় প্রার্থনা করে তবে নিশ্চয় আমি তাকে আশ্রয় দিই।)
উত্তর
এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে কিতাবুর রিকাক এর আওতাধীন ৩৮ নং অনুচ্ছেদে উল্লিখিত হয়েছে।
আহলে সুন্নত ওয়াল জামা‘আত হাদীসটিকে বাহ্যিক অর্থেই নিয়েছেন, কিন্তু এ হাদীসটির বাহ্যিক অর্থ কী?
হাদীসটির বাহ্যিক অর্থ কি এটা যে, আল্লাহ তা‘আলা একজন ওলীর কান, চোখ, হাত ও পা হয়ে যান?
নাকি হাদীটির বাহ্যিক অর্থ এটা যে, আল্লাহ তা‘আলা একজন ওলীর কান, চোখ, হাত ও পাকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। যাতে তার অনুভূতি ও আমল আল্লাহ কেন্দ্রিক হয়ে যায়।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, প্রথম কথাটি হাদীসটির বাহ্যিক অর্থ হতে পারে না। এটা বরং হাদীসটির দাবিগত অর্থও হতে পারে না। আর তা দু‘কারণে:
প্রথম কারণ
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নিকটতা অর্জন করতে থাকে এ পর্যন্ত যে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি।’ তিনি আরো বলেছেন যে, ‘সে যদি আমার কাছে চায় তবে আমি তাকে অবশ্যই দিই। সে যদি আমার আশ্রয় প্রার্থনা করে তবে নিশ্চয় আমি তাকে আশ্রয় দিই।’ এখানে বান্দা ও মাবুদ, নিকটতা অর্জনকরী ও যার নিকটতা অর্জন করা হচ্ছে, যিনি ভালোবাসেন এবং যাকে ভালোবাসা হচ্ছে, প্রার্থনাকারী ও প্রার্থনার পাত্র, দাতা ও গ্রহীতা, আশ্রয় প্রার্থী ও আশ্রয়দাতার মধ্যে পার্থক্যটা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ হাদীসের অনুপম বক্তব্য ভিন-ভিন্ন দুই সত্তাকে বুঝাচ্ছে, যাদের একজন অন্যজন থেকে আলাদা। অতঃপর একজন অপর জনের গুণ অথবা অপর জনের অংশসমূহের মধ্যে কোনো অংশে পরিণত হতে পারে না।
দ্বিতীয় কারণ
ওলীর কান, চোখ, হাত ও পা- এগুলো হলো ক্ষণস্থায়ী সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য বা অংশ। আর এটা কোনো জ্ঞানী ব্যক্তি ধারণা করতে পারে না যে, যিনি অনাদি-অনন্ত, তিনি একটি সৃষ্টিজীবের কান, চোখ, হাত ও পায়ে পরিণত হয়ে যাবেন, এ জাতীয় অর্থ তো কল্পনা করতেও মনে ঘৃণার উদ্রেক করে। তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়ার জন্যও এ জাতীয় কথা জিহ্বা দিয়ে উচ্চারণ করা মুশকিল। অতএব কি করে বলা শুদ্ধ হতে পারে যে এটাই হলো হাদীসের বাহ্যিক অর্থ এবং এ বাহ্যিক অর্থ থেকে সরে আসা হয়েছে? আপনি পবিত্র-মহান হে আল্লাহ! সকল প্রশংসা আপনার, আপনার গুণ বর্ণনা করে শেষ করতে পারব না, আপনি যেভাবে নিজেকে গুণান্বিত করেছেন আপনি ঠিক সে রকমই।
প্রথম কথাটি বাতিল ও নিষিদ্ধ বলে প্রমাণিত হওয়ার পর দ্বিতীয় কথাটিই শুদ্ধ হিসেবে থেকে যায়। আর তা হলো, আল্লাহ তা‘আলা ওলীর কান, চোখ ও আমলকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। এমনভাবে যে, তার কান- চোখ দিয়ে অনুভব করা, হাত-পা দিয়ে কাজ করা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়, সে সাহায্য চাইলে কেবল আল্লাহর কাছেই চায়, ইত্তিবা ও বিধিবিধান পালন শুধু আল্লাহর জন্যই হয়ে যায়। অতএব পরিপূর্ণ ইখলাস, আল্লাহর সাহায্য চাওয়া এবং শরীয়ত ও বিধান পালন এসবগুলোই তার মধ্যে পূর্ণাঙ্গরূপে একত্র হয়। আর এটাই হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ তাওফীক। সালাফগণ উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যা এভাবেই দিয়েছেন। এ ব্যাখ্যাটি হাদীসের শব্দমালার যে বাহ্যিক অর্থ রয়েছে তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। হাদীসটির কন্টেক্সট থেকে যে প্রকৃত অর্থ বুঝা যায় তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ ব্যাখ্যা কোনো তাবিল-নির্ভর ব্যাখ্যা নয়। এ ব্যাখ্যায় বাহ্যিক অর্থ থেকে দূরে চলে যাওয়াও হয়নি। এ জন্য আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা ও শুকরিয়া।

দ্বাদশতম উদাহরণ
হাদীসে কুদসীতে এসেছে:
من تقرب مني شبرا تقربت منه ذراعا، ومن تقرب مني ذراعا تقربت منه باعاً، ومن أتاني يمشي أتيته هرولة.
যে ব্যক্তি এক বিঘত পরিমাণ আমার নিকটবর্তী হলো, আমি এক হাত পরিমাণ তার নিকটবর্তী হলাম। আর যে ব্যক্তি এক হাত পরিমাণ আমার নিকটবর্তী হলো আমি এক গজ পরিমাণ তার নিকটবর্তী হলাম। আর যে ব্যক্তি আমার কাছে হেঁটে এল, আমি তার কাছে দৌড়ে যাই।
হাদীসটি সহীহ। ইমাম মুসলিম হাদীসটি যিকির ও দো‘আ অধ্যায়ে আবু যর রাদিয়াল্লাহু আনহু এর বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকেও অনুরূপ একটি হাদীস তিনি উল্লেখ করেছেন। ইমাম বুখারী কিতাবুত্ তাওহীদ, অনুচ্ছেদ পনেরতে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে অনুরূপ একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন।
[জওয়াব:]
এই হাদীসটি আল্লাহ তা‘আলার ওই সকল কর্মকে বুঝাচ্ছে যা তিনি সম্পাদন করতে ইচ্ছা করেন। সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা‘আলা যা ইচ্ছা তাই করেন। এ বিষয়টি কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। যেমন আল্লাহ তা‘আলার নিম্নোক্ত বাণীসমূহে:
﴿ وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌۖ أُجِيبُ دَعۡوَةَ ٱلدَّاعِ إِذَا دَعَانِۖ ﴾ [البقرة: ١٨٦]
আর যখন আমার বান্দাগণ তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, আমি তো নিশ্চয় নিকটবর্তী। আমি আহবানকারীর ডাকে সাড়া দেই, যখন সে আমাকে ডাকে। (সূরা আল বাকারা: ২: ১৮৬)
﴿ وَجَآءَ رَبُّكَ وَٱلۡمَلَكُ صَفّٗا صَفّٗا ٢٢ ﴾ [الفجر: ٢٢]
আর তোমার রব ও ফেরেশতাগণ উপস্থিত হবেন সারিবদ্ধভাবে। (সূরা আল ফাজর: ৮৯: ২২)
﴿ هَلۡ يَنظُرُونَ إِلَّآ أَن تَأۡتِيَهُمُ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ أَوۡ يَأۡتِيَ رَبُّكَ أَوۡ يَأۡتِيَ بَعۡضُ ءَايَٰتِ رَبِّكَۗ﴾ [الانعام: ١٥٨]
তারা কি এরই অপেক্ষা করছে যে, তাদের নিকট ফেরেশতাগণ হাজির হবে, কিংবা তোমার রব উপস্থিত হবে অথবা প্রকাশ পাবে তোমার রবের আয়াতসমূহের কিছু? (সূরা আল আনআম: ৬: ১৫৮)
﴿ ٱلرَّحۡمَٰنُ عَلَى ٱلۡعَرۡشِ ٱسۡتَوَىٰ ٥ ﴾ [طه: ٥]
দয়াময় (আল্লাহ) আরশে সমাসীন। (সূরা তাহা: ২০: ৫)
অনুরূপভাবে হাদীসে এসেছে:
ينزل ربنا كل ليلة إلى السماء الدنيا حين يبقى ثلث الليل الآخر
আমাদের রব প্রতি রাতেই নিম্নাকাশে নেমে আসেন, যখন রাতের শেষ তৃতীয় প্রহর অবশিষ্ট থাকে।
অন্য এক হাদীসে এসেছে:
ما تصدق أحد بصدقة من طيب ولا يقبل الله إلا الطيب- إلا أخذها الرحمن بيمينه
যখন কোনো ব্যক্তি হালাল সম্পদ থেকে কিছু দান করে – আর আল্লাহ হালাল ব্যতীত গ্রহণ করেন না- তখন দয়াময় তা তাঁর ডান হাত দিয়ে গ্রহণ করেন।
এ জাতীয় আরো অন্যান্য আয়াত ও হাদীস যা ইচ্ছাকৃত কর্মসমূহ আল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়াকে নির্দেশ করে। অতএব হাদীসে যে উল্লিখিত হয়েছে, ‘আমি তার নিকটবর্তী হই’, ‘আমি তার দিকে দৌড়ে আসি’ তা এই পর্যায়ের।
সালাফগণ তথা আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআত উল্লিখিত ধরনের বাণীসমূহকে আল্লাহ তা‘আলার শানের জন্য উপযোগীভাবে বাহ্যিক ও প্রকৃত অর্থেই নিয়ে থাকেন। এ ক্ষেত্রে তারা কোনো ‘তাকঈফ’ তথা ধরন-ধারণ নির্ধারণ এবং ‘তামছীল’ তথা উদাহরণ নির্ধারণের আশ্রয়ে যান না। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. আল্লাহর নিম্নাকাশে নেমে আসা বিষয়ক হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন (দ্র. মাজমুউল ফাতাওয়া: খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪৬৬): আল্লাহ তা‘আলার নিকটবর্তী হওয়া এবং কিছু বান্দার কাছে আসা- যারা আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছাকৃত কর্ম, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলার আগমণ, তাঁর অবতরণ ও আরশের ওপরে আরোহনকে সাব্যস্ত করে – তারা উল্লিখিত হাদীসে নিকটবর্তী হওয়ার যে কথা আছে সেটাকেও সাব্যস্ত করেন।’
অতএব এ কথা বলতে বাধা কি যে, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দার নিকটবর্তী হন, তিনি যেভাবে চান সেভাবে, তাঁর ঊর্ধ্বাবস্থান সত্ত্বেও?
কোনো ধরন-ধারণ নির্ধারণ না করে, অথবা কোনো উদাহরণ না দিয়ে এ কথা বলতে বাধা কি যে আল্লাহ তা‘আলা যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে আসবেন?
এটা তো আল্লাহ তা‘আলার কামাল ও পূর্ণাঙ্গতারই একটি বিষয় যে তিনি তাঁর শান মোতাবেক যা ইচ্ছা তাই করবেন।
কেউ কেউ বলেছেন যে, এ হাদীসে আল্লাহ তা‘আলার যে কথাটি এসেছে যে, ‘আমি তাঁর নিকট দৌড়ে যাই’, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য অর্জনের জন্য কাজ করে যায় এবং শরীর ও অন্তর উভয়টা নিয়ে আল্লাহর পানে ধাবিত হয়, তাকে আল্লাহ তা‘আলা অতিদ্রুত গ্রহণ করে নেন। আর আল্লাহ তা‘আলা আমলকারীকে যে প্রতিদান দেন তা আমলকারীর আমলের চেয়েও অধিক পরিপূর্ণ। তারা তাদের এ বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন যে, আল্লাহ তা‘আলা হাদীসে কুদসীতে বলেছেন, ‘যে আমার কাছে হেঁটে আসে’। আর এটা জ্ঞাত বিষয় যে, আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য অর্জনকারী, আল্লাহ তা‘আলার কাছে পৌঁছতে আগ্রহী ব্যক্তি কেবলমাত্র হাঁটার মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য অর্জন করে না, বরং কখনো হাঁটার মাধ্যমে, যেমন সালাতের উদ্দেশে মসজিদের দিকে হেঁটে যাওয়া, হজ পালনের উদ্দেশে হেঁটে যাওয়া, আল্লাহর পথে জিহাদের উদ্দেশে হেঁটে যাওয়া ইত্যাদি। আবার কখনো রুকু-সিজদা ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য অর্জন করে থাকে, যেমন হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘নিশ্চয় বান্দা আল্লাহ তা‘আলার অতি নিকটবর্তী থাকে তখন যখন সে সিজদারত থাকে।’ বরং বান্দা বিছানায় শুয়ে থেকেও আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿ ٱلَّذِينَ يَذۡكُرُونَ ٱللَّهَ قِيَٰمٗا وَقُعُودٗا وَعَلَىٰ جُنُوبِهِمۡ﴾ [ال عمران: ١٩١]
যারা আল্লাহহকে স্মরণ করে দাঁড়িয়ে, বসে ও কাত হয়ে। (সূরা আলে ইমরান: ৩: ১৯১)
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইমরান ইবনে হুসাইনকে বলেছেন:
صل قائما، فإن لم تستطع فقاعداً، فإن لم تستطع فعلى جنب
তুমি দাঁড়িয়ে সালাত পড়, যদি না পার তাহলে বসে, আর যদি না পার তাহরে কাত হয়ে।
উক্ত ব্যাখ্যার প্রবক্তাগণ বলেন: যদি বিষয়টি এ রকমই হয়, তাহলে হাদীসটির উদ্দেশ্য হবে আল্লাহ তা‘আলা বান্দার আমলের যে বিনিময় দেন তা বর্ণনা করা। আর যে ব্যক্তি একনিষ্ঠ হয়ে আল্লাহর প্রতি ধাবিত হবে, সে যদি ধীরগামীও হয় তবুও আল্লাহ তা‘আলা তাকে তার আমলের চেয়েও উত্তম ও পূর্ণাঙ্গ প্রতিদান দেবেন। আর এটাই হলো হাদীসটির বাহ্যিক অর্থ যার অনন্য বক্তব্য থেকে শরঈ ইঙ্গিত অনুযায়ী বুঝা যাচ্ছে।
যদি অনন্য বক্তব্য থেকে শরঈ ইঙ্গিত অনুযায়ী এ অর্থ বুঝা যায় তবে তা বাহ্যিক অর্থ থেকে দূরে যাওয়া হবে না, আহলে তা‘তীলদের তাবিলের মতোও তাবিল করা হবে না, অতএব তা আহলে সুন্নতের বিরুদ্ধে দলিল হিসেবে দাঁড়াবে না।
উল্লিখিত অভিমত ব্যক্তকারী যা বললেন, তা ফেলে দেওয়ার মতো না। তবে প্রথম কথাটি অধিক পরিষ্কার, ত্রুটিমুক্ত এবং সালাফদের মাযহাবের অধিক উপযোগী।
শরঈ ইঙ্গিতের যে কথাটি বলা হয়েছে, অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য অর্জন শুধু হাঁটার সঙ্গেই বিশিষ্ট নয়, বরং বলা হবে যে হাদীসটি একটি উদাহরণতুল্য। কোনটি ইবাদত এবং কোনটি ইবাদত নয়, তা নির্দিষ্ট করার জন্য হাদীসটি উল্লিখিত হয়নি। অতএব হাদীসটির অর্থ হবে: যে ব্যক্তি আমার কাছে এমন ইবাদতের ক্ষেত্রে হেঁটে আসল যাতে হাঁটার প্রয়োজন পড়ে, যেমন জামাতের সঙ্গে সালাত আদায়ের জন্য মসজিদের যাওয়ার প্রয়োজনে হাঁটতে হয়, অথবা এমন ইবাদত যা মূলত হেঁটেই সম্পন্ন করতে হয়, যেমন তাওয়াফ এবং সাঈ।
আল্লাহ তা‘আলাই সর্বোত্তম জ্ঞানী।

ত্রয়োদশ উদাহরণ
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ أَوَ لَمۡ يَرَوۡاْ أَنَّا خَلَقۡنَا لَهُم مِّمَّا عَمِلَتۡ أَيۡدِينَآ أَنۡعَٰمٗا فَهُمۡ لَهَا مَٰلِكُونَ ٧١ ﴾ [يس: ٧١]
তারা কি দেখেনি, আমার হাতের কৃত বস্তুসমূহের মধ্যে আমি তাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছি। (সূরা ইয়াসীন: ৩৬: ৭১)
আমরা এ আয়াতের উত্তর দেব প্রথমে জিজ্ঞাসা করে যে, এ আয়াতের প্রকাশ্য ও প্রকৃত অর্থ কি? প্রকাশ্য ও প্রকৃত অর্থ নির্ধারিত হওয়ার পরেই তো এটা বলা শুদ্ধ হতে পারে যে তা প্রকাশ্য ও প্রকৃত অর্থ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এটা কি বলা হবে যে এ আয়াতের বাহ্যিক ও প্রকৃত অর্থ এই যে, আল্লাহ তা‘আলা চতুষ্পদ জন্তু তাঁর নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন ঠিক সেভাবে যেভাবে তিনি আদম আ. কে সৃষ্টি করেছেন?
না কি বলা হবে যে, এ আয়াতের বাহ্যিক অর্থ এই যে, আল্লাহ তা‘আলা চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন ঠিক সেভাবে যেভাবে তিনি অন্যান্য সৃষ্টিবস্তুকে সৃষ্টি করেছেন, অর্থাৎ তিনি তার হাত দিয়ে তা সরাসরি সৃষ্টি করেননি, বরং হাতকে এখানে কর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে এটা বুঝানোর জন্য যে হাতের যিনি মালিক তিনিই তা সৃষ্টি করেছেন। আর এটা আরবী ভাষায় একটি স্বীকৃত একটি বিষয়।
প্রথম কথাটি আয়াতের বাহ্যিক ও প্রকৃত অর্থ হতে পারে না দু’ কারণে:
প্রথমত: আরবী ভাষার দাবি অনুযায়ী প্রথম কথাটি আয়াতের শব্দমালার দাবি হতে পারে না। আপনি যদি নিম্নবর্ণিত কয়েকটি আয়াত অনুধাবন করে দেখেন তবে বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে যাবে:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَمَآ أَصَٰبَكُم مِّن مُّصِيبَةٖ فَبِمَا كَسَبَتۡ أَيۡدِيكُمۡ وَيَعۡفُواْ عَن كَثِيرٖ ٣٠ ﴾ [الشورا: ٣٠]
আর তোমাদের প্রতি যে মুসীবত আপতিত হয়, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল। আর অনেক কিছুই তিনি ক্ষমা করে দেন। (আশ্শুরা: ৪২: ৩০)
﴿ ظَهَرَ ٱلۡفَسَادُ فِي ٱلۡبَرِّ وَٱلۡبَحۡرِ بِمَا كَسَبَتۡ أَيۡدِي ٱلنَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعۡضَ ٱلَّذِي عَمِلُواْ لَعَلَّهُمۡ يَرۡجِعُونَ ٤١ ﴾ [الروم: ٤١]
মানুষের হাতের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে ফাসাদ প্রকাশ পায়। যার ফলে আল্লাহ তাদের কতিপয় কৃতকর্মের স্বাদ তাদেরকে আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে। (সূরা আররুম: ৩০: ৪১)
﴿ ذَٰلِكَ بِمَا قَدَّمَتۡ أَيۡدِيكُمۡ﴾ [ال عمران: ١٨٢]
এ হল তোমাদের হাত যা আগাম পেশ করেছে। (সূরা আলে ইমরান: ৩: ১৮২)
এসব আয়াতে মানুষের হাত যা উপার্জন করেছে বা হাত যা আগাম পেশ করেছে দ্বারা স্বয়ং মানুষ যা উপার্জন করেছে বা আগাম পেশ করেছে বুঝানো হয়েছে। হোক তা হাত দ্বারা অথবা অন্যভাবে। এর বিপরীতে যদি বলা হয় যে, এ কাজটি আমি আমার দু’হাত ব্যবহার করে করেছি, তাহলে এর অর্থ হবে কেবল ওই কাজ যা হাত ব্যবহার করে করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলার নিম্নোক্ত বাণীতে:
﴿ فَوَيۡلٞ لِّلَّذِينَ يَكۡتُبُونَ ٱلۡكِتَٰبَ بِأَيۡدِيهِمۡ ثُمَّ يَقُولُونَ هَٰذَا مِنۡ عِندِ ٱللَّهِ﴾ [البقرة: ٧٩]
সুতরাং ধ্বংস তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব লিখে। তারপর বলে, ‘এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে’, যাতে তা তুচ্ছ মূল্যে বিক্রি করতে পারে। (সূরা আল বাকারা: ২: ৭৯)
এখানে ‘নিজ হাতে কিতাব লিখে’ দ্বারা সরাসরি হাত ব্যবহার করে কিতাব লিখাকে বুঝানো হয়েছে।
দ্বিতীয়ত: এখানে যদি উদ্দেশ্য এটাই হত যে, আল্লাহ তা‘আলা সরাসরি তাঁর হাত দ্বারাই চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন, তাহলে বাক্যটি এমন হতো : خلقنا لهم بأيدينا أنعاما (অর্থাৎ আমি তাদের জন্য সৃষ্টি করেছি আমার হাত দ্বারা চতুষ্পদ জন্তু) যেমন আল্লাহ তা‘আলা আদম আ. এর ব্যাপারে বলেছেন:
﴿ قَالَ يَٰٓإِبۡلِيسُ مَا مَنَعَكَ أَن تَسۡجُدَ لِمَا خَلَقۡتُ بِيَدَيَّۖ﴾ [ص: ٧٥]
আল্লাহ বললেন, ‘হে ইবলীস, আমার দু’হাতে আমি যাকে সৃষ্টি করেছি তার প্রতি সিজদাবনত হতে কিসে তোমাকে বাধা দিল? (সূরা সাদ: ৩৮: ৭৫)
কারণ আল কুরআন অস্পষ্ট নয় বরং সুষ্পষ্ট বর্ণনা নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে:
﴿وَنَزَّلۡنَا عَلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ تِبۡيَٰنٗا لِّكُلِّ شَيۡءٖ﴾ [النحل: ٨٩]
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাস্বরূপ। (সূরা আন্-নাহল: ১৬: ৮৯)
অতএব এ আলোচনার দ্বারা প্রথম কথাটির বাতুলতা প্রকাশিত হয়ে গেল, দ্বিতীয় কথাটি যে সঠিক তা প্রমাণিত হয়ে যায়। আর তা হলো: আলোচ্য আয়াতের বাহ্যিক অর্থ হলো, আল্লাহ তা‘আলা চতুষ্পদ জন্তুকে ঠিক সেভাবেই সৃষ্টি করেছেন যেভাবে তিনি সৃষ্টি করেছেন অন্য মাখলুকাতকে। অর্থাৎ তিনি তাঁর হাত দিয়ে সরাসরি সৃষ্টি করেননি। তবে কর্মকে হাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা কর্মকে সত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার মতোই। অতএব আল্লাহ তা‘আলার বাণী, ‘আমার হাতের কৃত বস্তুসমূহের মধ্যে আমি তাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছি’ এর অর্থ ‘আমার সৃষ্ট বস্তুসমূহের মধ্যে আমি তাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছি’। আরবী ভাষার ব্যবহাররীতি এটাই দাবি করে। তবে যদি আরবী ভাষায় يد (হাত) শব্দের পূর্বে بـ অব্যয় থাকে তবে সে সময় সরাসরি হাতই অর্থ হয়ে থাকে। এই পার্থক্যকে জেনে রাখুন। কারণ, এ সাদৃশ্যময় বিষয়সমূহের মধ্যে থাকা পার্থক্য জানা উত্তম ইলমের মধ্যে শামিল। এর দ্বারা অনেক প্রশ্ন সমাধান হয়ে যায়।

চতুর্দশ উদাহরণ
আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ ٱللَّهَ يَدُ ٱللَّهِ فَوۡقَ أَيۡدِيهِمۡۚ﴾ [الفتح: ١٠]
আর যারা তোমার কাছে বাই‘আত গ্রহণ করে, তারা শুধু আল্লাহরই কাছে বাই‘আত গ্রহণ করে; আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর। (সূরা আলা ফাতহ: ৪৮: ১০)
উত্তর:
এর উত্তরে বলা হবে যে, এ আয়াতটি দুটি বাক্য শামিল করে আছে। প্রথম বাক্যটি হলো:
﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ ٱللَّهَ﴾ [الفتح: ١٠]
আর যারা তোমার কাছে বাই‘আত গ্রহণ করে, তারা শুধু আল্লাহরই কাছে বাই‘আত গ্রহণ করে। (সূরা আল ফাতহ:৪৮ ১০)
সালাফ অর্থাৎ আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআত আয়াতটিকে বাহ্যিক ও প্রকৃত অর্থেই নিয়েছেন। অর্থাৎ সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছেই সরাসরি বাই‘আত গ্রহন করেছিলেন। এ কথাটি নিম্নোক্ত আয়াতেও স্পষ্ট:
﴿ ۞لَّقَدۡ رَضِيَ ٱللَّهُ عَنِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ إِذۡ يُبَايِعُونَكَ تَحۡتَ ٱلشَّجَرَةِ﴾ [الفتح: ١٨]
অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তারা গাছের নিচে আপনার হাতে বাই‘আত গ্রহণ করেছিল। (সূরা আল ফাতহ: ৪৮: ১৮)
আর-
﴿إِنَّمَا يُبَايِعُونَ ٱللَّهَ﴾ [الفتح: ١٠]
তারা শুধু আল্লাহরই কাছে বাই‘আত গ্রহণ করে। (সূরা আল ফাতহ: ৪৮: ১৮)
আল্লাহ তা‘আলার এ কথা থেকে কেউ এটা বুঝে না যে, সাহাবীগণ সরাসরি আল্লাহর কাছেই বাই‘আত গ্রহণ করেছিলেন। কেউ এটা বলবে না যে সরাসরি আল্লাহর কাছে বাই‘আত গ্রহণ করাই এ আয়াতের বাহ্যিক ও প্রকাশ্য অর্থ, কেননা এরূপ হলে তা আয়াতের প্রথমাংশ ও বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে যাবে। কেননা আল্লাহ তা‘আলা আয়াতের প্রথম অংশে এটা স্পষ্ট করেছেন যে, সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতেই সরাসরি বাই‘আত গ্রহণ করেছিলেন।
রাসূলের কাছে বাই‘আত গ্রহণ করাকে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কাছেই বাই‘আত গ্রহণ করা এ জন্যে বলেছেন যে, রাসূল হলেন আল্লাহ তা‘আলারই রাসূল যার হাতে সাহাবীগণ আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য বাই‘আত গ্রহণ করেছিলেন। আর রাসূলকে যিনি পাঠিয়েছেন তাঁর পথে জিহাদ করার উদ্দেশে রাসূলের কাছে বাই‘আত গ্রহণ করা প্রকারান্তরে তাঁর কাছেই বাই‘আত গ্রহণ করা। কেননা তিনি তো তাঁর পক্ষ থেকে বাণী পৌঁছে দেওয়ার জন্যই রাসূল। অনুরূপভাবে রাসূলের আনুগত্য করা যিনি রাসূলকে পাঠিয়েছেন তারই আনুগত্য করা। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ مَّن يُطِعِ ٱلرَّسُولَ فَقَدۡ أَطَاعَ ٱللَّهَۖ ﴾ [النساء: ٨٠]
যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল। (সূরা আন্-নিসা: ৪: ৮০)
আর রাসূলের কাছে সাহাবীগণের বাই‘আতকে আল্লাহর কাছে বাই‘আত বলার মধ্যে নিহিত আছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্মানিত করা, তাঁকে সমর্থন করা, কৃত বাই‘আতকে জোরদার করা, বাই‘য়াতের আযমতকে বাড়িয়ে দেওয়া এবং বাই‘আতকারীদের শানকে বাড়িয়ে দেওয়া। এ বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পষ্ট এবং কারও কাছেই গোপন নয়।
দ্বিতীয় বাক্য:
﴿يَدُ ٱللَّهِ فَوۡقَ أَيۡدِيهِمۡۚ﴾ [الفتح: ١٠]
আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর। (সূরা আল ফাতহ: ৪৮: ১০)
এ বাক্যটিও বাহ্যিক ও প্রকৃত অর্থেই; কেননা আল্লাহ তা‘আলার হাত বাই‘আতকারীদের হাতের উপর; হাত হলো আল্লাহ তা‘আলার একটি সিফাত আর আল্লাহ হলেন আরশের ওপর। অতএব তাঁর হাত বাই‘আতকারীদের হাতের ওপরে। এটাই হলো উক্ত বাক্যের বাহ্যিক ও প্রকৃত অর্থ। আর এতে আছে এ কথার তাগিদ যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বাই‘আত করা আল্লাহর কাছেই বাই‘আত করা। এর দ্বারা এটা আবশ্যক হয় না যে আল্লাহ তা‘আলার হাত তাদের হাতের সঙ্গে লেগে থাকবে। যদি বলা হয় যে ‘আকাশ আমাদের ওপরে’ তাহলে এটা বুঝা যাবে না যে আকাশ আমাদের মাথার সঙ্গে লেঘে আছে, আকাশ আমাদের থেকে দূরে ও বিচ্ছিন্ন থাকা সত্ত্বেও উক্ত বাক্যটি বলা শুদ্ধ। অনুরূপভাবে, যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে বাই‘আত করেছিলেন, আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপরে যদিও আল্লাহ তা‘আলা মাখলুক থেকে আলাদা এবং তাদের থেকে ঊর্ধ্বে।
‘আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপরে।’ এখানে ‘আল্লাহর হাত’-কে নবীর হাত বলে বুঝার কোনো সম্ভাবনা নেই। এটা দাবি করার কোনো সুযোগও নেই যে এটাই হলো শব্দের বাহ্যিক অর্থ; কেননা আল্লাহ তা‘আলা এখানে ‘হাত’-কে তাঁর নিজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে উল্লেখ করেছেন এবং তিনি বলেছেন যে তাঁর হাত তাদের হাতের ওপরে। আর বাই‘আত করার সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাত সাহাবীগণের হাতের ওপরে ছিল না, কেননা বাই‘আত করার সময় তিনি তাঁর হাত প্রসারিত করে ধরতেন আর সাহাবীগণ, যেভাবে মুসাফাহা করা হয় সেভাবে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতকে ধরতেন। অতএব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাত তাদের হাতের সঙ্গে থাকত, তাদের হাতের ওপরে থাকত না।

পঞ্চদশ উদাহরণ
হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
يا ابن آدم، مرضت فلم تعدني
হে আদম সন্তান, আমি অসুস্থ হয়েছিলাম কিন্তু তুমি আমাকে দেখতে আসনি । -আল হাদীস।
হাদীসটি ‘সদাচার, সম্পর্ক রক্ষা ও শিষ্টাচার’ অধ্যায়ের আওতাধীন রোগী দেখার ফজীলত অধ্যায়ে ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত এ হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
(আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন বলবেন: হে আদম সন্তান, আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে দেখতে আসনি। সে বলবে: হে আমার রব, আমি কীভাবে আপনাকে দেখতে যাব, আপনি তো রাব্বুল আলামীন? তিনি বলবেন: তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল, কিন্তু তুমি তো তাকে দেখতে যাওনি। তুমি কি জানতে না যে, যদি তুমি তাকে দেখতে যেতে তবে আমাকে তার কাছেই পেতে? হে আদম সন্তান, আমি তোমার কাছে খাবার চেয়েছিলাম কিন্তু তুমি আমাকে খাবার দাওনি। সে বলবে, হে আমার রব, আমি আপনাকে কীভাবে খাওয়াব, আপনি তো সৃষ্টিকুলের রব? তিনি বলবেন, তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে খাবার চেয়েছিল, কিন্তু তুমি তাকে খাবার দাওনি। তুমি কি জানতে না যে, তুমি যদি তাকে খাবার দিতে তবে তা আমার কাছে পেতে? হে আদম সন্তান, আমি তোমার কাছে পানি পান করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে পানি পান করতে দাওনি। সে বলল: হে আমার রব, আমি আপনাকে কীভাবে পানি পান করাব, আপনি তো রাব্বুল আলামীন? তিনি বলবেন: আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে পানি পান করতে চেয়েছিল, কিন্তু তুমি তাকে পানি পান করাওনি, তুমি যদি তাকে পানি পান করাতে তবে তা আমার কাছে পেতে?)
উত্তর:
এর উত্তর হলো, সালাফগণ নিজেদের খেয়ালখুশি মোতাবেক হাদীসটির অর্থে বিকৃতি সাধন না করেই হাদীসটিকে গ্রহণ করেছেন। সালাফগণ এ হাদীসটির ঠিক সে ব্যাখ্যাই দিয়েছেন যে ব্যাখ্যা হাদীসটির যিনি বক্তা তিনি দিয়েছেন। অতএব, ‘আমি অসুস্থ হয়েছিলাম’, ‘তোমার কাছে খাবার চেয়েছিলাম’, আমি তোমার কাছে পানি পান করতে চেয়েছিলাম’, এ কথাগুলোর ব্যাখ্যা আল্লাহ তা‘আলা নিজেই দিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে, ‘তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল’, ‘যে, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে খাবার চেয়েছিল’, ‘আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে পানি পান করতে চেয়েছিল’। অর্থাৎ বিষয়টি খুবই স্পষ্ট যে, এখানে উদ্দেশ্য হলো- আল্লাহ তা‘আলার বান্দাদের মধ্যে কোনো বান্দার অসুস্থ হয়ে পড়া, আল্লাহ তা‘আলার বান্দাদের মধ্যে কোনো বান্দার খাবার চাওয়া, আল্লাহ তা‘আলার বান্দাদের মধ্যে কোনো বান্দার পানি পান করতে চাওয়া। আর এ ব্যাখ্যা যিনি দিয়েছেন তিনি খোদ ওই সত্তা যিনি এ কথাগুলো বলেছেন এবং আল্লাহ তা‘আলা তাঁর উদ্দেশ্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। অতএব আমরা যদি এখানে অসুস্থ হওয়া, খাবার চাওয়া, পানি পান করতে চাওয়া- যা আল্লাহর দিকে নিসবত করে উল্লেখ করা হয়েছে- তার ব্যাখ্যায় যদি বলি যে, এখানে মূলত, বান্দার অসুস্থতা, খাবার চাওয়া ও পানি পান করতে চাওয়াকে বুঝানো হয়েছে, তবে এতে বাণীর যে বাহ্যিক অর্থ তা থেকে সরে যাওয়া হবে না; কারণ যিনি এ বাণীগুলো বলেছেন, তিনি নিজে এসবের ব্যাখ্যা এভাবেই দিয়েছেন। যেমন নাকি তিনি শুরুতেই কথাগুলো এভাবেই বলেছেন। হ্যাঁ, আল্লাহ তা‘আলা নিজের দিকে সম্পৃক্ত করে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন মানুষকে আগ্রাহান্বিত ও উৎসাহিত করার উদ্দেশে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা এক আয়াতে বলেন:
﴿ مَّن ذَا ٱلَّذِي يُقۡرِضُ ٱللَّهَ ﴾ [البقرة: ٢٤٥]
কে আছে, যে অল্লাহকে ঋণ দেবে? (সূরা আল বাকারা: ২: ২৪৫)
অতএব উক্ত হাদীসটি তাবিলপন্থীদের বিরুদ্ধে একটি বড় প্রমাণ; কেননা তাবিলপন্থীরা আল্লাহ তা‘আলার সিফাত সংবলিত বক্তব্যগুলোকে, কুরআন-সুন্নাহর কোনো প্রমাণ ব্যতীতই, বাহ্যিক অর্থ থেকে সরিয়ে নেয়। তারা কিছু অমূলক যুক্তি দাঁড় করিয়ে তাহরীফ তথা অর্থবিকৃতির আশ্রয় নেয়। কেননা সেসব বক্তব্যের উদ্দেশ্য বাহ্যিকভাবে যা বুঝা যায় তা না হয়ে যদি অন্যকোনো উদ্দেশ্য হতো – অর্থাৎ তারা যেভাবে দাবি করে সেভাবে হতো- তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা অথবা তাঁর রাসূল তা বর্ণনা করতেন। যদি সেসব বক্তব্যের বাহ্যিক অর্থ আল্লাহর ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ হতো – যেমন তারা ধারণা করেছে -তবে নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা এবং তার রাসূল তা বর্ণনা করতেন যেভাবে উক্ত হাদীসে বর্ণনা করেছেন। যদি এসব বক্তব্যের বাহ্যিক অর্থ আল্লাহর জন্য উপযোগীভাবে নেওয়া আল্লাহর ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ হতো, তাহলে বলতে হবে যে, কুরআন ও সুন্নাহয় আল্লাহ তা‘আলা এমন সব অগণিত গুণে নিজেকে গুনান্বিত করেছেন যা তাঁর ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ। আর এটি কখনো সম্ভব হতে পারে না।
উল্লিখিত উদাহরণগুলোর মাধ্যমেই আমার বক্তব্য শেষ করতে চাই এ আশায় যে তা অন্যান্য ক্ষেত্রে পথনির্দেশিকার কাজ করবে। অন্যথায়, এক্ষেত্রে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের নীতি সুস্পষ্ট। অর্থাৎ সিফাত-বিষয়ক আয়াত ও হাদীসসমূহকে তার বাহ্যিক অর্থেই বহন করা, কোনো বিকৃতিসাধন, বাতিলকরণ, ধরনধারণ নির্ণয়করণ এবং উদাহরণ নির্ণয়করণ ব্যতীতই।
সিফাত-বিষয়ক বক্তব্য সংক্রান্ত নীতিমালাসমূহে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সকল প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্য যিনি সৃষ্টিকুলের রব।

পঞ্চম অধায়
উপসংহার
যদি কোনো প্রশ্নকারী এ প্রশ্ন করে যে: তাবিলপন্থীদের মাযহাব যে বাতিল তা আমরা সিফাত অধ্যায়ে বুঝতে পেরেছি। আর এটা জানা যে আশ‘আরী সম্প্রদায় তাবিলপন্থীদের অন্তর্ভুক্ত। তাহলে কি আশ‘আরীদের মাযহাব বাতিল? অথচ বলা হয়ে থাকে যে, মুসলিমদের মধ্যে শতকরা পঁচানব্বই জনই আশ‘আরী।
যেখানে ইমাম আবুল হাসান আল-আশ‘আরী, আশ‘আরীদের অনুসরণীয় আদর্শ, সেখানে তাদের মাযহাব কি করে বাতিল হতে পারে? তাদের মাযহাব কি করে বাতিল হতে পারে, যেখানে তাদের মধ্যে অমুক অমুক আলেম রয়েছেন, যারা আল্লাহ তা‘আলা, তাঁর কিতাব, তাঁর রাসূল, মুসলিমদের ইমামগণ ও সাধারণ মুসলিমদের জন্য কল্যাণপ্রত্যাশী ছিলেন?
প্রথম প্রশ্নের উত্তরে বলব যে, অন্যান্য মুসলিম সম্প্রদায়ের তুলনায় আশ‘আরীদের সংখ্যা এত বিশাল হবে এটি এমন একটি দাবি যা প্রমাণ করার জন্য সূক্ষ্ণ পরিসংখ্যান প্রয়োজন।
যদি আমরা মেনেও নিই যে আশ‘আরীদের সংখ্যা উল্লিখিত পরিমাণেই আছে, অথবা তার চেয়েও বেশি, তবু আমরা বলতে পারি না যে তারা ভুল থেকে মুক্ত। কারণ যা ভুলমুক্ত তা হলো মুসলিমদের ইজমা, সংখ্যায় অধিক হলেই ভুলমুক্ত হবে, তা জরুরি নয়। আর মুসলিমগণ প্রাচীনকালে যে বিষয়ে ইজমা করেছেন তা তাবিলপন্থীদের বিপরীত। সালাফে সালেহীন যারা এই উম্মতের পুরোভাগে ছিলেন – যেমন সাহাবায়ে কেরাম, তাবে‘ঈন এবং তৎপরবর্তী হিদায়েতের দিশারি ইমামগণ তারা সকলেই এ ব্যাপারে ঐক্যমত্য পোষণ করেছেন যে, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নিজের জন্য যে নাম ও সিফাতসমূহ সাব্যস্ত করেছেন, অথবা আল্লাহ তা‘আলার জন্য তাঁর রাসূল যেসব নাম ও সিফাতসমূহ সাব্যস্ত করেছেন, তা আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা হবে। আর এ সংক্রান্ত মূলবক্তব্যকে আল্লাহর জন্য উপযোগীভাবে তার বাহ্যিক অর্থেই নেওয়া হবে, কোনো বিকৃতিসাধন, বাতিলকরণ, ধরন-ধারণ নির্ধারণকরণ ও উদাহরণ নির্ণয়করণ ব্যতীতই।
আর তারা হলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা অনুযায়ী, উত্তম যুগের মানুষ। তাদের ঐকমত্য আবশ্যিকভাবে মান্য প্রমাণ। কেননা তাদের ইজমায় প্রতিফলিত হয়েছে কুরআন-সুন্নাহর দাবি। সিফাত-বিষয়ক মূলবক্তব্যে আলোচনাকালে চতুর্থ নম্বর মূলনীতিতে তাদের ইজমার বিষয়টি উল্লিখিত হয়েছে।
ইমাম আবুল হাসান আশ‘আরী এবং অন্যান্য ইমামগণ নিজেদেরকে ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে মনে করতেন না। বরং তারা তো দ্বীনের ইমাম বনার মর্যাদা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন নিজেদের কদর যথার্থরূপে বুঝা এবং নিজেদেরকে যথার্থ স্থানে রাখতে পারার কারণেই। তাদের অন্তরে ছিল আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নতের তা‘যীম। যার কারণেই তারা ইমাম হওয়ার যোগ্য হয়েছিলেন। ইরশাদ হয়েছে:
﴿ وَجَعَلۡنَا مِنۡهُمۡ أَئِمَّةٗ يَهۡدُونَ بِأَمۡرِنَا لَمَّا صَبَرُواْۖ وَكَانُواْ بِاَلشيَٰتِنَا يُوقِنُونَ ٢٤ ﴾ [السجدة: ٢٤]
আর আমি তাদের মধ্য থেকে বহু নেতা করেছিলাম, তারা আমার আদেশানুযায়ী সৎপথ প্রদর্শন করত, যখন তারা ধৈর্যধারণ করেছিল। আর তারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখত। (সূরা আস্সাজদাহ: ৩২: ২৪)
আল্লাহ তা‘আলা ইব্রাহীম আ. সম্পর্কে বলেন:
﴿ إِنَّ إِبۡرَٰهِيمَ كَانَ أُمَّةٗ قَانِتٗا لِّلَّهِ حَنِيفٗا وَلَمۡ يَكُ مِنَ ٱلۡمُشۡرِكِينَ ١٢٠ شَاكِرٗا لِّأَنۡعُمِهِۚ ٱجۡتَبَىٰهُ وَهَدَىٰهُ إِلَىٰ صِرَٰطٖ مُّسۡتَقِيمٖ ١٢١ ﴾ [النحل: ١٢٠، ١٢١]
নিশ্চয় ইব্রাহীম ছিলেন এক উম্মত , আল্লাহর একান্ত অনুগত ও একনিষ্ঠ। তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। সে ছিল তার নিয়ামতের শুকরকারী। তিনি তাকে বাছাই করেছেন এবং তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন। (সূরা আন-নাহল: ১৬: ১২০- ১২১)
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরবর্তীযুগে যারা এসেছে এবং নিজেদেরকে ইমাম আশ‘আরীর অনুসারী বলে দাবি করে, তারা মূলত ইমাম আশ‘আরীকে যথার্থরূপে অনুসরণ করেনি; কারণ ইমাম আশ‘আরীর আকীদা তিনটি পর্যায় দিয়ে অতিক্রম করেছে।
প্রথম পর্যায়: মুতাযিলা মতবাদ পর্যায়: অর্থাৎ ইমাম আশ‘আরী চল্লিশ বছর পর্যন্ত মুতাযিলা সম্প্রদায়ের মতবাদ পোষণ করে চলেছেন। এ সময় তিনি মুতাযিলা মতবাদের পক্ষে অন্যদের সঙ্গে বিতর্ক করেছেন। এরপর তিনি মুতাযিলা মতবাদ থেকে ফিরে আসেন এবং মুতাযিলাদের গোমরাহ বলে আখ্যায়িত করে কঠোরভাবে তাদের যুক্তিতর্ক খণ্ডন করেন।
দ্বিতীয় পর্যায়: মুতাযিলা ও আহলে সুন্নতের মাঝামাঝি পর্যায়।
এ পর্যায়ে তিনি আবু মুহাম্মদ আবদুল্লাহ ইবনে কুল্লাব এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেন। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, ‘আশ‘আরী এবং তার মতো যারা আছেন তারা হলেন সালাফ এবং জাহমিয়াদের মাঝামাঝি পর্যায়ে অবস্থিত। তারা সালাফদের কাছ থেকে বিশুদ্ধ কথা গ্রহণ করেছেন এবং জাহমিয়াদের কাছ থেকে যুক্তিভিত্তিক মতবাদসমূহ গ্রহণ করেছেন, যা তাদের কাছে বিশুদ্ধ বলে মনে হতো, কিন্তু আসলে তা ছিল অশুদ্ধ।’
তৃতীয় পর্যায়: আহলে সুন্নতের মতাদর্শ আপন করে নেয়ার পর্যায়, যাদের ইমাম হলেন আহমদ ইবনে হাম্বল রা.। ইমাম আশ‘আরী এ কথাটি তার সর্বশেষ কিতাব الإبانة في أصول الديانة (আল ইবানাহ ফী উসূলিদ্দিয়ানাহ) তে উল্লেখ করেছেন।
ইমাম আশ‘আরী র. এ কিতাবের ভুমিকায় বলেছেন, ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সম্মানিত কিতাব নিয়ে আমাদের কাছে এসেছেন। যে কিতাবের আগে-পিছে কোনো বাতুলতা আসে না। যা প্রজ্ঞাময়, সপ্রশংসিত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। যে কিতাবে পূর্বের সকল ইলম একত্র হয়েছে। যে কিতাব দ্বারা দ্বীন ও অবশ্য পালনীয় বিধানসমূহ পরিপূর্ণ করে দেওয়া হয়েছে। আর তা আল্লাহ তা‘আলার সরল পথ। শক্ত রজ্জু। যে এ কিতাবকে আঁকড়ে ধরবে সে নাজাত পাবে। আর যে তার বিপক্ষে যাবে সে পথভ্রষ্ট ও গোমরাহ হয়ে যাবে, অজ্ঞতায় নিপতিত হবে। আর আল্লাহ তা‘আলা তার এ কিতাবে রাসূলের সুন্নত আঁকড়ে ধরার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَمَآ ءَاتَىٰكُمُ ٱلرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَىٰكُمۡ عَنۡهُ فَٱنتَهُواْۚ﴾ [الحشر: ٧]
রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও। (সূরা আল হাশর ৫৯: ৭)
ইমাম আশ‘আরী র. তাঁর ভুমিকায় আরো বলেছেন যে, ‘আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে তাঁর রাসূলের আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন নির্দেশ দিয়েছেন তাঁর নিজের আনুগত্য করার। অনুরূপভাবে তিনি তাঁর কিতাব অনুযায়ী আমল করার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে যারা ভাগ্যহারা, শয়তান যাদের ওপর চড়াও হয়েছে, তারা আল্লাহর নবীর সুন্নতকে পেছনে ছুড়ে মেরেছে, পরিত্যাগ করেছে। তারা তাদের কিছু পূর্বসূরির প্রতি ধাবিত হয়েছে যাদের মতাদর্শ তারা অন্ধভাবে মেনে অনুসরণ করেছে, যাদের দ্বীনকে তারা নিজেদের দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং তারা রাসূলের সুন্নতকে বাতিল করে দিয়েছে, তারা তা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং অস্বীকার করেছে। তারা আল্লাহর ওপর মিথ্যা রটনা করতে গিয়েই এরূপ করেছে। অতএব কুরআনের ভাষায় (তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং হিদায়েতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।) (সূরা আন-আনআম: ৬: ১৪০)
এরপর ইমাম আশ‘আরী র. বিদআতপন্থীদের একটি নীতির কথা উল্লেখ করেন এবং তা বাতিল বলে ইঙ্গিত করেন। তারপর তিনি বলেন:
‘যদি কেউ আমাকে এ প্রশ্ন করে বলে যে, আপনি তো মুতাযিলা, জাহমিয়াহ, হারুরিয়া, রাফেযা, মুরজিয়াহ- এদের সকলের কথাকে অস্বীকার করলেন। তাহলে আপনার নিজস্ব বক্তব্য এবং আপনি যে মতাদর্শ বহন করেন সে ব্যাপারে কি আমাদের বলবেন?
এ জাতীয় প্রশ্নকারীর উত্তর দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা যে কথা বলি এবং মতাদর্শ বহন করি তা হলো – আল্লাহর কিতাবকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরা, আমাদের নবীর সুন্নতকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরা, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, হাদীসের ইমামগণ যা বলেছেন তা মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরা। আমরা এগুলোকে শক্তভাবে ধরে থাকি। আর আবু আবদুল্লাহ আহমদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে হাম্বল- আল্লাহ তার চেহারা উজ্জ্বল করুন, তার দরজা বুলন্দ করুন, তাকে অঢেল প্রতিদানে ভূষিত করুন- যা বলতেন আমরাও তা বলি। আর যারা তার বিপরীতে যায় আমরা তাদের এড়িয়ে চলি; কেননা তিনি একজন মর্যাদাবান ইমাম ও পূর্ণাঙ্গ নেতা।’
এরপর তিনি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল র. এর মাধ্যমে যে সত্য প্রকাশিত হয়েছে তার জন্য তার প্রশংসা করেন এবং সিফাতসমূহ আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত হওয়া, তাকদীর সম্পর্কে কিছু মাসআলা, শাফাআত এবং কিছু ওহীনির্ভর বিষয়ের কথা উল্লেখ করেন এবং তিনি তা ওহী ও যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণিত করেন।

পরবর্তী যুগে যারা এসেছে এবং ইমাম আশ‘আরীর অনুসারী বলে দাবি করেছে তারা তার আকীদাগত জীবনের দ্বিতীয় পর্যায়ের কথাগুলো নিয়েছে এবং সকল সিফাতের ক্ষেত্রে তাবীলের পথ বেছে নিয়েছে। তারা কেবল সাতটি সিফাত আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করেছে যা নিম্নোক্ত কবিতায় সন্নিবিষ্ট:
حــي عليـم قدير والكلام لـــه إرادة وكذلك السمع والبصر
অর্থাৎ -চিরঞ্জীব, সর্বজ্ঞ, সর্বক্ষমতাবান, কথা, ইচ্ছা, শ্রবণ ও দর্শন।
এ সিফাতগুলো সাব্যস্ত করার ধরণ কি হবে সে ব্যাপারেও আহলে সুন্নত ও তাদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে।
আশ‘আরিয়া সম্প্রদায় সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা উল্লেখ করে ইমাম ইবনে তাইমিয়া র. বলেন: ‘যারা আশ‘আরিয়াদের সমালোচনা করেছেন তাদের উদ্দেশ্য হলো ওইসব আশ‘আরী যারা আল্লাহ তা‘আলার ওইসব সিফাতসমূহকে নাকচ করে দেয় যার সংবাদ কুরআন-সুন্নাহয় এসেছে। আর ইমাম আশ‘আরী তাঁর শেষ জীবনে ‘আল ইবানা’ নামক যে গ্রন্থটি লিখেছিলেন সে গ্রন্থের বক্তব্য যারা মেনে নেয় তারা আহলে সুন্নতের মধ্যে শামিল।’ (মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৫৯)
ইমাম ইবনে তাইমিয়া এর পূর্বে পৃষ্ঠা নং ৩১০-এ বলেছেন: ‘আশআরিয়ারা হলো তাদের বিপরীত (অর্থাৎ ইমাম আবুল হাসান আল আশ‘আরীর প্রকৃত অনুসারীদের বিপরীত)। তাদের কথা তা‘তীল (আল্লাহর সিফাত বাতিল করে দেওয়া)-কে আবশ্যক করে দেয়। তারা বলে যে, আল্লাহ তা‘আলা না এ মহাবিশ্বের ভিতরে, না তার বাইরে। তারা বলে যে আল্লাহর সকল কথার অর্থ এক। আয়াতুল কুরসী যে অর্থ ব্যক্ত করে, ঋণ বিষয়ক আয়াতও অভিন্ন অর্থ ব্যক্ত করে। তাওরাত ও ইঞ্জীলও একই অর্থ বহন করে। আর এটা স্পষ্ট বাতিল কথা।’
ইমাম ইবনুল কাইয়েম তার এক কবিতায় বলেন:
واعلم بأن طريقهم عكس الـ ـطريق المستقيم لمن له عينان
জেনে রাখুন যে তাদের পথ সিরাতুল মুস্তাকিম থেকে আলাদা
দুচোখ আছে যার তার কাছে।
শায়খ মুহাম্মদ আমীন আশ্শানকিতী তার তাফসীর গ্রন্থ ‘আদওয়াউল বায়ান’- এ সূরায়ে আ‘রাফে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক আরশের ওপরে ওঠা বিষয়ক আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘জেনে রাখুন যে, পরবর্তী যুগের অসংখ্য মানুষ এই বিষয়ে ভুল করেছে। তারা ধারণা করেছে যে, ‘ইস্তিওয়া’ এবং ‘হাত’ শব্দের বাহ্যিক যে অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে মাথায় আসে, তা সৃষ্টিজীবের গুণের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে মনে হয়। তারা বলেছে যে, ‘এ শব্দদ্বয়কে বাহ্যিক অর্থ থেকে সরিয়ে নেওয়া ইজমায়ে উম্মত অনুযায়ী ওয়াজিব।’
তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তির সামান্য আকল-বুদ্ধি আছে, তার কাছে এ কথাটি অত্যন্ত পরিস্কার যে, উল্লিখিত কথার মর্ম হলো, আল্লাহ তা‘আলা, আল কুরআনে, নিজেকে এমনসব গুণে গুণান্বিত করেছেন যার তাৎক্ষণিক বাহ্যিক অর্থ আল্লাহর প্রতি কুফরী করা এবং আল্লাহর ব্যাপারে এমন কথা বলা হিসেবে সাব্যস্ত হয় যা আল্লাহর ক্ষেত্রে উপযোগী নয়। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যার ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿وَأَنزَلۡنَآ إِلَيۡكَ ٱلذِّكۡرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيۡهِمۡ [النحل: ٤٤]
এবং আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি কুরআন, যাতে তুমি মানুষের জন্য স্পষ্ট করে দিতে পার, যা তাদের প্রতি নাযিল হয়েছে। (সূরা আন্-নাহল: ১৬: ৪৪)
সেই নবী এ ব্যাপারে একটি অক্ষরও স্পষ্ট করলেন না, অথচ নির্ভরযোগ্য আলেমদের ইজমা অনুযায়ী, যে সময় কোনো আয়াতের বক্তব্যকে স্পষ্ট করতে হবে সে সময় থেকে স্পষ্টকরণ প্রক্রিয়াকে পিছিয়ে দেওয়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য জায়েয নয়। আর তা যদি আকীদার ব্যাপারে হয় যার বাহ্যিক অর্থ কুফরী এবং স্পষ্ট গোমরাহী, তবে তো স্পষ্ট করার গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট করলেন না, এমনকি পরিশেষে ওইসব অজ্ঞ লোকদের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়ে যারা ধারণা করেছে যে, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নিজের ওপর এমন সিফাত আরোপ করেছেন যার বাহ্যিক অর্থ আল্লাহর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়টি অব্যক্ত রেখে গেলেন যে, এ বাণীগুলোর বাহ্যিক অর্থ কুফরী ও গোমারাহী। এটা কিছুতেই হতে পারে না। অতএব তারা যা করেছে তা কেবলই খেয়াল-খুশি মুতাবেক করেছে, তারা এ ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর আশ্রয়ে যায়নি। এটা এক মিথ্যাচার যা থেকে আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র। এটা সবচেয়ে বড় গোমারাহী এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর চরম মিথ্যাচার।
যে ব্যক্তির সামান্যতম আকলবুদ্ধি আছে, সে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ করে না যে, প্রত্যেক ওই গুণ যা দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা নিজেকে গুণান্বিত করেছেন, অথবা যা দ্বারা রাসূল তাঁকে গুণান্বিত করেছেন, যে ব্যক্তির অন্তরে সামান্য পরিমাণ ঈমানও রয়েছে, এ গুণগুলো শোনামাত্র তাৎক্ষণিকভাবে তার মাথায় যে বিষয়টি আসে তা হলো আল্লাহ তা‘আলার গুণকে মাখলুকের গুণের সাদৃশ্যতা থেকে পবিত্র মনে করে বাহ্যিক অর্থটাকে বুঝা। সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টবস্তু থেকে সত্তায় ও গুণে সম্পূর্ণ আলাদা, এ বিষয়টি কি কেউ অস্বীকার করতে পারে? না, পারে না। যারা সত্যকে অমান্য করে তারা ব্যতীত এ বিষয়টিকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না।
আর ওই অজ্ঞ মিথ্যাচারী ব্যক্তি, যে মনে করে যে, সিফাত-বিষয়ক আয়াতের বাহ্যিক অর্থ আল্লাহর জন্যে উপযোগী নয়; কেননা তা তার কাছে কুফরী ও তাশবীহ (মাখলুকের সঙ্গে সাদৃশ্যকরণ), সে এরূপ কথা এ জন্য বলতে পেরেছে যে, তার অন্তর খালেক ও মাখলুকের মধ্যে সাদৃশ্যকরণের পঙ্কিলতায় নাপাক হয়ে আছে। তাই সাদৃশ্যকরণের আপদ তাকে আল্লাহর সিফাত অস্বীকার করার দিকে নিয়ে গেছে। আল্লাহর সিফাতের প্রতি ঈমান না আনার দিকে নিয়ে গেছে। অথচ আল্লাহ তা‘আলা স্বয়ং নিজেকে এসব গুণে গুণান্বিত করেছেন। অতএব এই জাহেল প্রথমে নিজে মুশাবিবহ তথা সাদৃশ্যকারী হয়েছে, এবং পরবর্তীতে মু‘আত্তিল তথা আল্লাহর সিফাত বাতিলকারী হয়েছে। অতএব আল্লাহর জন্য যা উপযোগী নয়, এমন কথা বলার পাপে সে শুরুতে যেমনি শেষেও তেমনি, জড়িয়ে পড়েছে। যদি তার অন্তর যথার্থরূপে আল্লাহ তা‘আলাকে চিনতে পারত। আল্লাহ তা‘আলাকে যথার্থরূপে তা‘যীম করতে জানত, তাহলে সে তাশবীহ (সাদৃশ্যকরণ) এর পঙ্কিলতা থেকে নিজেকে পবিত্র করে নিত। সে আল্লাহ তা‘আলার গুণবাচক বাণীসমূহের বাহ্যিক অর্থকে মাখলুকের সঙ্গে সকল সাদৃশ্যতা থেকে ঊর্ধ্বে বলে বিশ্বাস করত এবং তার অন্তর কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত আল্লাহ তা‘আলার সকল সিফাতে কামালের প্রতি ঈমান আনার জন্য প্রস্তুত থাকত। পাশাপাশি সে আল্লাহর সকল গুণকে মাখলুকের গুণের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ ভাবা থেকে পবিত্র থাকত। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ ١١ ﴾ [الشورى: ١١]
তাঁর মত কিছু নেই, আর তিনি হলেন সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। (আশশূরা: ৪২: ১১)’
আর ইমাম আবুল হাসান আল আশ‘আরী র. তার শেষ জীবনে, আহলে সুন্নত ও আহলে হাদীসের মাযহাবের ওপর ছিলেন। আর তা হলো আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কিতাবে তাঁর নিজের জন্য যেসব সিফাত সাব্যস্ত করেছেন অথবা রাসূলের মাধ্যমে যেসব সিফাত সাব্যস্ত করেছেন, সেসব সিফাতকে কোনো বিকৃতি সাধন, বাতিলকরণ, ধরন-ধারণ নির্ধারণকরণ এবং উদাহরণ নির্ণয়করণ ব্যতীতই মেনে নেওয়া। আর মানুষের মাযহাব হলো সেটা যা সে শেষ জীবনে লালন করে, যদি তার কথা এ ব্যাপারে পরিষ্কার থাকে যে, এর বাইরে তার কোনো বক্তব্য নেই, যেমনটি করেছেন আবুল হাসান আশ‘আরী র.। ‘আল ইবানা’ গ্রন্থে থাকা আশ‘আরী এর বক্তব্য থেকে আমরা এটাই বুঝতে পারি। অতএব পরিপূর্ণরূপে ইমাম আশ‘আরী র. এর অনুসরণ করতে হলে তিনি তার জীবনের শেষ ভাগে যার ওপর ছিলেন তার অনুসরণ করতে হবে। আর তা হলো আহলে সুন্নত ও আহলে হাদীসের মাযহাব অনুসরণ করা। কেননা এটাই হলো সঠিক মাযহাব যার অনুসরণ ইমাম আবুল হাসান আল আশ‘আরী র. করেছেন।

তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর
দু‘ভাবে এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায়:
প্রথমত: সত্যকে ব্যক্তি দিয়ে মাপা হয় না, বরং ব্যক্তিকে সত্য দিয়ে মাপা হয়। আর এটাই হলো সঠিক মানদণ্ড। যদিও কোনো ব্যক্তির কথা মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে তার অবস্থান ও পদমর্যাদার প্রভাব থাকে, সে হিসেবে ন্যায়বান ব্যক্তির কথা মেনে নেওয়া হয়, পক্ষান্তরে যে ফাসিক তার কথা মেনে নেওয়া হয় না। তবে এটা সর্বাবস্থায় মানদণ্ড হিসেবে খাটে না। কেননা মানুষ তো মানুষই। তারা পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করতে অনেক সময়ই ব্যর্থ হয়। পরিপূর্ণরূপে বুঝতে তারা কখনো ব্যর্থ হয়। কখনো এমন হয় ব্যক্তি খুব ধার্মিক, চরিত্রবান কিন্তু তার জ্ঞান অপূর্ণ, তার বুঝার ক্ষমতা দুর্বল। অথবা সে বিশেষ পদ্ধতিতে বড় হয়েছে, অথবা বিশেষ মাযহাবের ওপর বড় হয়েছে এবং সে অন্যকোনো মাযহাবকে জানে না। অতঃপর সে মনে করে যে, সে যা জানে তার মধ্যেই সত্য সীমিত।

দ্বিতীয়ত
আশ‘আরী মতবাদপন্থী আলেমদেরকে যদি সালাফপন্থী আলেমদের সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে আমরা দেখতে পাই যে, সালাফপন্থী আলেমগণ অধিক মর্যাদাবান, হিদায়েত ও সত্য পথে অধিক পরিচালিত; কেননা চার মাযহাবের চার ইমাম, যাদের মাযহাবকে অনুসরণ করা হয়, তারা আশ‘আরীপন্থী ছিলেন না।
আর যদি আপনি চার ইমামকে অতিক্রম করে আরো ওপরে যান তবে দেখতে পাবেন যে, তাবে‘ঈগণের কেউই আশ‘আরীপন্থী ছিলেন না।
যদি আপনি আরো ওপরে সাহাবায়ে কেরাম ও খুলাফায়ে রাশেদার যুগে যান তবে দেখতে পাবেন তাদের কেউই আল্লাহর নাম ও সিফাতের ক্ষেত্রে পরবর্তী যুগের আশ‘আরীপন্থীরা যে মতাদর্শ পোষণ করে তা পোষণ করতেন না।
আমরা অস্বীকার করি না যে, আশ‘আরীপন্থী কিছু আলেম এমন আছেন ইসলামে যাদের অবস্থান খুব সুসংহত। ইসলাম প্রতিরক্ষা, আল্লাহর কিতাবের যতœ নেয়া, সুন্নতের সার্বিক যতœ নেয়া, মুসলিমদের হিদায়েত ও উপকার পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কাজ করে যাওয়ার বিষয়ে যাদের ভুমিকা স্বীকৃত। কিন্তু এর আবশ্যিক দাবি হিসেবে এটা আসে না যে, তারা ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে এবং তাদের সকল কথাই গ্রহণযোগ্য। পাশাপাশি এটাও আবশ্যক নয় যে, তাদের ভুলত্রুটি দেখিয়ে দেওয়া যাবে না এবং সত্যকে বয়ান করা যাবে না অথবা মানুষকে সঠিক পথ দেখানো যাবে না।
আমরা এটাও অস্বীকার করি না যে কিছু আলেমের কাছে সঠিক ধারণা অস্পষ্ট থাকার ফলে, সদিচ্ছাবশতই তাদের মতাদর্শ লালন করে যাচ্ছেন। তবে কথা হলো, কোনো বক্তব্যকে গ্রহণ করে নেওয়ার জন্য, বক্তার সদিচ্ছা থাকাটাই মূল বিষয় নয়। বরং এক্ষেত্রে অন্যতম শর্ত হলো বক্তার বক্তব্য শরীয়তসম্মত হওয়া। আর যদি শরীয়তসম্মত না হয় তবে বক্তা যেই হোন না কেন, তার বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করা ওয়াজিব; কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন:
من عمل عملا ليس عليه أمرنا فهو رد
যে ব্যক্তি এমন কোনো কাজ করলো যে ব্যাপারে আমাদের কোনো নির্দেশ নেই, তবে তা প্রত্যাখ্যাত।
এরপর যদি বক্তা এমন হন যিনি কল্যাণকামী ও সত্যানুসন্ধানে ঐকান্তিক হওয়ার ব্যাপারে প্রসিদ্ধ, তাহলে সে যে সত্যের বিপরীতে কথা বলছে, সে ব্যাপারে তাকে অপারগ মনে করা হবে। এর অন্যথা হলে তার অসৎ ইচ্ছা এবং সত্যের বিরোধিতার কারণে সে যে ধরনের আচরণের উপযোগী তার সঙ্গে সে ধরনের আচরণই করা হবে।
তাবিলকারীদের বিধান
যদি কোনো প্রশ্নকারী বলে যে, আপনারা কি তাবিলপন্থীদের কাফির বা ফাসিক বলেন? তাহলে এর উত্তরে বলব যে, কাউকে কাফির বা ফাসিক হুকুম জারি করার আধিকার আমাদের নেই। তা বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অধিকার। অতএব এ জাতীয় হুকুমের উৎস হলো একমাত্র কুরআন-সুন্নাহ। সুতরাং এ ব্যাপারে খুব সতর্কতা এবং চূড়ান্ত পর্যায়ের যাচাই বাছাই করতে হবে এবং এমন ব্যক্তিকে কখনো কাফির বা ফাসিক বলা যাবে না যার কুফরী বা ফিসক কুরআন অথবা সুন্নাহ দ্বারা সাব্যস্ত নয়।
আর এ ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, যে মুসলিম বাহ্যত আদেল তথা ন্যায়পরায়ণ, তার আদালত তথা ন্যায়পরায়ণতা ততক্ষণ পর্যন্ত বিলুপ্ত হবে না যতক্ষণ না শরীয়তের কোনো দলিলের দাবি তা বিলুপ্ত করে দেয়। আর যখন শরীয়তের কোনো দলিল তার আদালত-সততাকে বিলুপ্ত করে দেবে, তখন তাকে কাফির কিংবা ফাসিক বলার ক্ষেত্রে কোনো শিথিলতা দেখানো যাবে না; কাফির কিংবা ফাসিক বলার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা দু‘কারনে জরুরি:
এক. এই হুকুমের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর মিথ্যাচারিতা এবং যে ব্যক্তির ওপর কুফরী বা ফিসকের হুকুম লাগানো হলো তার ওপরও মিথ্যাচারিতা।
দুই. যে ব্যক্তির ওপর কুফরী ও ফিসকের হুকুম লাগানো হলো সে যদি প্রকৃত অর্থে কাফের বা ফাসিক না হয়ে থাকে, তা হলে যে হুকুম লাগাল সেই তাতে পতিত হবে। সহীহ মুসলিমে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে এক বর্ণনায় এসেছে, নবী সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
إذا كفر الرجل أخاه فقد باء بها أحدهما
যদি কোনো ব্যক্তি তার ভাইকে কাফির বলে হুকুম লাগায়, তবে এ হুকুমটি তাদের দুজনের মধ্যে যেকোনো একজনের প্রতি ফিরে আসবে।
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে:
إن كان كما قال وإلا رجعت عليه
সে যা বলেছে ওই ব্যক্তি যদি তার উপযোগী হয় তো হলোই, অন্যথায় তা বক্তার প্রতি ফিরে আসবে।
সহীহ মুসলিমে আবু যর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে এক বর্ণনায় এসেছে, নবী সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
من دعا رجلا بالكفر أو قال عدو الله وليس كذلك إلا حار عليه
যে ব্যক্তি কোনো এক ব্যক্তিকে কাফির বলে ডাকল অথবা বলল যে সে আল্লাহর শত্রু, অথচ সে বাস্তবে সে রকম নয়, তাহলে তা বুমেরাং হয়ে তার প্রতিই ফিরে আসবে।
অতএব একজন মুসলিমকে কাফির বা ফাসিক বলে ডাকার আগে দুটি বিষয়ে মনোনিবেশ করতে হবে:
এক. কুরআন অথবা সুন্নাহয় এ ব্যাপারে নির্দেশনা থাকতে হবে যে এই কথাটি বললে বা এই কাজটি করলে অনিবার্যভাবে ব্যক্তি কাফির বা ফাসিক হয়ে যায়।
দুই. সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি, যে কুফরীপূর্ণ অথবা ফিসকপূর্ণ কোনো কথা বলেছে বা এ জাতীয় কোনো কাজ করেছে, তার ওপর এই হুকুমটি বর্তানো। অর্থাৎ কাফির অথবা ফাসিক হওয়ার সকল শর্ত ওই ব্যক্তির মধ্যে উপস্থিত থাকা এবং এ হুকুম লাগানোর পথে কোনো বাধা না থাকা।
যেসব শর্তসমূহ উপস্থিত থাকতে হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এ ব্যাপারে ব্যক্তির জ্ঞান থাকা যে, সে যা বলছে বা করছে, তার অনিবার্য পরিণতি হলো কাফির বা ফাসিক হয়ে যাওয়া। এর প্রমাণ আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
﴿ وَمَن يُشَاقِقِ ٱلرَّسُولَ مِنۢ بَعۡدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ ٱلۡهُدَىٰ وَيَتَّبِعۡ غَيۡرَ سَبِيلِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ نُوَلِّهِۦ مَا تَوَلَّىٰ وَنُصۡلِهِۦ جَهَنَّمَۖ وَسَآءَتۡ مَصِيرًا ١١٥ ﴾ [النساء: ١١٥]
আর যে রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে তার জন্য হিদায়াত প্রকাশ পাওয়ার পর এবং মুমিনদের পথের বিপরীত পথ অনুসরণ করে, আমি তাকে ফেরাব যেদিকে সে ফিরে এবং তাকে প্রবেশ করাব জাহান্নামে। আর আবাস হিসেবে তা খুবই মন্দ। (সূরা আন্-নিসা: ৪: ১১৫)
﴿ وَمَا كَانَ ٱللَّهُ لِيُضِلَّ قَوۡمَۢا بَعۡدَ إِذۡ هَدَىٰهُمۡ حَتَّىٰ يُبَيِّنَ لَهُم مَّا يَتَّقُونَۚ إِنَّ ٱللَّهَ بِكُلِّ شَيۡءٍ عَلِيمٌ ١١٥ إِنَّ ٱللَّهَ لَهُۥ مُلۡكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۖ يُحۡيِۦ وَيُمِيتُۚ وَمَا لَكُم مِّن دُونِ ٱللَّهِ مِن وَلِيّٖ وَلَا نَصِيرٖ ١١٦ ﴾ [التوبة: ١١٥، ١١٦]
আর আল্লাহ এমন নন যে, তিনি কোনো সম্প্রদায়কে হিদায়াত দানের পর তাদেরকে পথভ্রষ্ট করবেন। যতক্ষণ না তাদের জন্য সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করবেন, যা থেকে তারা সাবধান থাকবে। নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ে সর্বজ্ঞ। নিশ্চয় আল্লাহ, তাঁর জন্যই আসমানসমূহ ও জমিনের রাজত্ব। তিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান। আর আল্লাহ ছাড়া তোমাদের জন্য না আছে কোন অভিভাবক, না আছে কোন সাহায্যকারী। (সূরা আত্-তাওবাহ: ৯: ১১৫ -১১৬)
এ কারণেই আলেমগণ বলেছেন: ইসলামের সঙ্গে সম্পর্ক বেশি দিনের নয়, এমন কোনো ব্যক্তি যদি ফরজকর্মসমূহ অস্বীকার করে তবে তাকে কাফির বলা হবে না যতক্ষণ না তাকে স্পষ্টরূপে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
আর কাফের বা ফাসিক হিসেবে হুকুম লাগানোর পথে যেসব বাধা থাকে তার মধ্যে একটি হলো, অনিচ্ছাকৃতভাবে কারো পক্ষ থেকে কুফরী বা ফিসক সংঘটিত হওয়া। আর তা কয়েকভাবে হতে পারে:
যেমন: কাউকে কুফরী করতে বাধ্য করা হলো, অতঃপর তার অন্তর ঈমানে ভরপূর থাকা সত্ত্বেও সে বাধ্য হয়ে কুফরী করল। এমতাবস্থায় তাকে কাফির বলে হুকুম দেওয়া হবে না। এর প্রমাণ আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
﴿ مَن كَفَرَ بِٱللَّهِ مِنۢ بَعۡدِ إِيمَٰنِهِۦٓ إِلَّا مَنۡ أُكۡرِهَ وَقَلۡبُهُۥ مُطۡمَئِنُّۢ بِٱلۡإِيمَٰنِ وَلَٰكِن مَّن شَرَحَ بِٱلۡكُفۡرِ صَدۡرٗا فَعَلَيۡهِمۡ غَضَبٞ مِّنَ ٱللَّهِ وَلَهُمۡ عَذَابٌ عَظِيمٞ ١٠٦ ﴾ [النحل: ١٠٦]
যে ঈমান আনার পর আল্লাহর সাথে কুফরী করেছে এবং যারা তাদের অন্তর কুফরী দ্বারা উন্মুক্ত করেছে, তাদের উপরই আল্লাহর ক্রোধ এবং তাদের জন্য রয়েছে মহা আযাব। ঐ ব্যক্তি ছাড়া যাকে বাধ্য করা হয় (কুফরী করতে) অথচ তার অন্তর থাকে ঈমানে পরিতৃপ্ত। (সূরা আন্-নাহল: ১৬: ১০৬)
আরেকটি বাধা হলো কারও চিন্তাশক্তি থেমে যাওয়া। এমন হয়ে যাওয়া যে, সে কি বলছে বা না বলছে তা অনুভব করতে পারছে না। এটা হতে পারে সীমাতীত খুশির আতিশায্যে, অথবা প্রচণ্ডভাবে চিন্তাগ্রস্ত বা ভীত হয়ে পড়ার কারণে।
এর দলিল সহীহ মুসলিমে আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু এর বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
(নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দার তাওবায়, যখন সে তাওবা করে তাঁর কাছে ফিরে আসে, ওই ব্যক্তির চেয়েও অধিক খুশি হন যে মরুভূমিতে তার বাহনের ওপর থাকে, অতঃপর বাহনটি -যার ওপর তার খাদ্যসামগ্রী ও পানীয় ছিল – তার হাতছাড়া হয়ে যায় এবং সে তার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে পড়ে। অতঃপর সে একটি গাছের কাছে আসে এবং এর ছায়ায় শুয়ে পড়ে, এ অবস্থায় যে সে তার বাহনটি ফিরে পাওয়ার ক্ষেত্রে একেবারে নিরাশ। এরপর সে হঠাৎ করে দেখে যে বাহনটি তার কাছেই দাঁড়ানো। অতঃপর সে তার লাগামটি হাতে নেয় এবং সীমাতীত আনন্দে বলে ওঠে: হে আল্লাহ, তুমি আমার বান্দা আর আমি তোমার রব। সে প্রচণ্ড আনন্দের কারণে ভুল করে ফেলে।)
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, ‘কাউকে কাফির বলে হুকুম লাগানোর ক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতি হলো, যে ব্যক্তি সত্যকে পাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করল এবং সদিচ্ছা বহন করল, কিন্তু সে ভুল করল, তাহলে তাকে কাফির বলা হবে না। বরং তার ভুলটিকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। তবে যে ব্যক্তির সামনে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন, তা স্পষ্ট হয়ে গেল, কিন্তু সে হিদায়েত স্পষ্ট হওয়ার পরও তার বিরুদ্ধাচরণ করল এবং মুমিনদের পথ ছাড়া অন্যপথ অনুসরণ করল, তাহলে সে কাফির। আর যে ব্যক্তি তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করল এবং সত্যানুসন্ধানে শিথিলতা দেখালো এবং অজ্ঞতাবশত কথা বলল, তাহলে সে পাপী, গোনাহগার। এরপর সে হতে পারে ফাসিক অথবা তার পুণ্যের সংখ্যা পাপের চেয়ে অধিক।’
তিনি আরো বলেন, ‘অবশ্য আমি সব সময়ই সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে কাফির, ফাসিক বা গোনাহগার হিসেবে আখ্যায়িত করার ঘোর বিরোধী থেকেছি – যারা আমার কাছে বসে তারা আমার এ অবস্থান সম্পর্কে জানে -। হ্যাঁ, যদি ওই ব্যক্তির ওপর রিসালতের হুজ্জত কায়েম হওয়ার বিষয়টি জানা থাকে, যার বিপক্ষে গেলে মাত্রা বুঝে ব্যক্তি কখনো কাফির, কখনো ফাসিক এবং কখনো গোনাহগার হয়ে যায়, তবে তার কথা আলাদা। আর আমি স্বীকার করি যে, আল্লাহ তা‘আলা এই উম্মতের ভুলত্রুটি নিশ্চয় ক্ষমা করে দিয়েছেন, হোক তা কথাজাত মাসাইল সংক্রান্ত যা ওহীর মাধ্যমে আমরা পেয়েছি, অথবা প্রায়োগিক কোনো মাসাইল সংক্রান্ত। আমাদের পূর্বপুরুষগণ এসব মাসাইল বিষয়ে বিতর্ক অব্যাহত রেখেছিলেন, কিন্তু তাদের কেউ কাউকে কাফির, ফাসিক বা গোনাহগার বলে আখ্যায়িত করেননি।’
ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ র. এ ব্যাপারে কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে বলেন: ‘আমি এটা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করতাম যে, এই এই বললে কোনো ব্যক্তি কাফির হয়ে যাবে বলে সালাফ ও ইমামগণ যে বক্তব্য দিতেন তাও সত্য। তবে সাধারণভাবে কাফির বলা এবং সুনির্দিষ্টভাবে কোনো ব্যক্তিকে কাফির বলার মধ্যে পার্থক্য করা অত্যাশ্যক।’
তিনি বলেন: ‘তাকফীর তথা কাফির হয়ে যাওয়ার হুকুম লাগানো একটি হুঁশিয়ারি। কারণ যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো কথাকে অস্বীকার করল, হতে পারে যে সে নও-মুসলিম (ইসলামের সঙ্গে যার সম্পর্ক নতুন) অথবা হতে পারে যে সে দূরবর্তী কোনো মরুভূমিতে বড় হয়েছে। এমন ব্যক্তি যদি ইসলামের কোনো কিছু অস্বীকার করে, তাহলে তাকে কাফির বলা হবে না যতক্ষণ না তার ওপর হুজ্জত কায়েম হবে। এমনও হতে পারে যে, ব্যক্তি যেসব বিষয় অস্বীকার করল সেসব বিষয় সংক্রান্ত পবিত্র মূলবক্তব্য সে শোনেনি। অথবা শুনেছে কিন্তু তার কাছে তা প্রমাণিত হয়নি। অথবা ওই সব টেক্সটের বিপক্ষে তার কাছে অন্যকোনো টেক্সট আছে, যার কারণে সে এসব টেক্সটকে তাবিল করেছে, যদিও সে এক্ষেত্রে ভুল করেছে।
আর আমি সব সময়ই বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদীস উল্লেখ করতাম যেখানে একব্যক্তি বলেছেন যে: আমি যখন মারা যাব, আমাকে তোমরা জ্বালিয়ে দিও এরপর আমাকে পিশে ফেলিও, এরপর আমাকে সাগরে ছিটিয়ে দিও। আল্লাহর কসম! আল্লাহ যদি আমাকে ধরতে সক্ষম হন তাহলে তিনি আমাকে এমন শাস্তি দেবেন যা তিনি এ মহাবিশ্বে অন্যকাউকে দেননি। লোকেরা তার কথামতোই কাজ করল। আল্লাহ তা‘আলা ওই ব্যক্তিকে বললেন, ‘তুমি যা করলে তা কি জন্য করেছ। লোকটি বলল, আপনার ভয়ে আমি এরূপ করেছি। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাকে মাফ করে দিলেন।
এই লোকটি আল্লাহর ক্ষমতার ব্যাপারে সন্দেহ করেছে। তাকে সাগরে ছিটিয়ে দিলে আল্লাহ তাকে একত্র করে পুনরায় জীবন দানের ক্ষমতা রাখেন এ ব্যাপারে সে সন্দেহ করেছে। বরং সে বিশ্বাস করেছে যে, সে পুনরুত্থিত হবে না। আর এ ধরণের সন্দেহ বা বিশ্বাস মুসলিমদের ঐক্যমত্য অনুযায়ী কুফরী। তবে লোকটি জাহেল ছিল, এ ব্যাপারে তার জ্ঞান ছিল না। সাথে সাথে সে মুমিন ছিল, সে আল্লাহকে ভয় করত যে তিনি তাকে শাস্তি দেবেন। আর সে কারণেই আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।
আর যে ব্যক্তি ইজতিহাদের যোগ্যতা রাখে এবং সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুসরণের ব্যাপারেও আগ্রহী, সে যদি তাবিল করে তাহলে উল্লিখিত ব্যক্তির চেয়েও ক্ষমা পাওয়ার ব্যাপারে অধিক হকদার।’
এ থেকে আমরা জানতে পারলাম যে, বক্তব্য ও বক্তা, কর্ম ও কর্মসম্পাদনকারীর মধ্যে পার্থক্য আছে। অতএব যেকোনো কুফরীপূর্ণ বা ফিসকপূর্ণ কথা বা কাজ, বলামাত্র বা করামাত্রই, বক্তা বা কর্মসম্পাদনকারীকে কাফির বা ফাসিক বলা যাবে না।
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া র. মাজমুউল ফাতাওয়ায় বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো এই যে, যে কথাটি কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা অনুযায়ী কুফরী, সে ব্যাপারে সাধারণভাবে বলা হবে যে তা কুফরী, শরঈ দলিল যেভাবে কুফরী প্রমাণিত করেছে ঠিক সেভাবে; কারণ ঈমান হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল থেকে আহরিত বিধানসমূহের একটি। ঈমানের ব্যাপারে মানুষের ধারণা ও খেয়াল-খুশি মুতাবিক হুকুম লাগানো যাবে না। আর যে ব্যক্তি কোনো কুফরী কথা বলল, সে কাফির হয়ে গিয়েছে এ হুকুম ততক্ষণ পর্যন্ত লাগানো যাবে না যতক্ষণ না কাফির হয়ে যাওয়ার সকল শর্ত তার ওপর বর্তাবে এবং এ বিষয়ক সকল বাধা দূরিভূত হবে। উদাহরণত, যদি কেউ বলে যে মদ অথবা সূদ হালাল, আর সে ইসলামে নতুন প্রবেশকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়, অথবা সে দূরবর্তী কোনো মরুভূমিতে বড় হয়ে থাকে, অথবা সে কোনো একটি বাণী শুলন কিন্তু সে বিশ্বাস করল না যে তা আল কুরআনের বাণী, অথবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু এর হাদীস, যেমন সালাফদের কেউ কেউ কোনো কোনো বিষয় অস্বীকার করতেন যতক্ষণ না তাদের কাছে প্রমাণিত হত যে রাসূলুল্লাল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা বলেছেন।’
এরপর তিনি বলেছেন, এইসব লোকদেরকে ততক্ষণ পর্যন্ত কাফির বলা হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের ওপর রিসালতের হুজ্জত কায়েম হয়ে যায়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى ٱللَّهِ حُجَّةُۢ بَعۡدَ ٱلرُّسُلِۚ ﴾ [النساء: ١٦٥]
যাতে আল্লাহর বিপক্ষে রাসূলদের পর মানুষের জন্য কোন অজুহাত না থাকে। (সূরা আন্-নিসা: ৪: ১৬৫)
আর আল্লাহ তাআল এ উম্মতের ভুলত্রুটি ও ভুলে যাওয়াকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। অতএব বুঝা গেল যে, কথা বা কাজ কখনো কুফরী হয় এবং কখনো ফিসক। তবে যে ব্যক্তি এহেন কথা বলল বা এ জাতীয় কোনো কাজ করল তার কাফির বা ফাসিক হয়ে যাওয়া আবশ্যক নয়। হয়তো কাফির বা ফাসিক হওয়ার শর্ত নাকচ হওয়ার কারণে অথবা কোনো শরঈ বাধা আসার কারণে। তবে যারা ইসলাম ব্যতীত অন্যকোনো ধর্মে বিশ্বাস করে তাদের, এ পৃথিবীতে, কাফের হওয়ার হুকুম দেওয়া হবে। আর যে ব্যক্তির সম্মুখে সত্য প্রকাশিত হলো কিন্তু সে তার উল্টো চলতে দৃঢ়তা প্রদর্শন করল -কোনো বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে যা সে পূর্ব থেকেই বহন করে আসছে, অথবা তার কোনো গুরুর অনুসরণ করতে গিয়ে যাকে সে তা‘যীম করে, অথবা দুনিয়ার লোভে- তাহলে সে এই উল্টো চলার কারণে মাত্রা বুঝে কাফির অথবা ফাসিক হয়ে যাবে। অতএব মুমিনের ওপর জরুরি যে, সে তার আকীদা ও আমলকে আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নতের ওপর প্রতিষ্ঠিত করবে। কুরআন-সুন্নাহকে সে তার ইমাম বানাবে যা থেকে সে আলো সংগ্রহ করবে। কুরআন-সুন্নাহর পথ ও পদ্ধতি অনুসরণ করে চলবে। এটাই হলো সিরাতে মুস্তাকীম যার নির্দেশ আল্লাহ তা‘আলা নিম্নোক্ত আয়াতে দিয়েছেন:
﴿ وَأَنَّ هَٰذَا صِرَٰطِي مُسۡتَقِيمٗا فَٱتَّبِعُوهُۖ وَلَا تَتَّبِعُواْ ٱلسُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمۡ عَن سَبِيلِهِۦۚ ذَٰلِكُمۡ وَصَّىٰكُم بِهِۦ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ١٥٣ ﴾ [الانعام: ١٥٣]
আর এটি তো আমার সোজা পথ। সুতরাং তোমরা তার অনুসরণ কর এবং অন্যান্য পথ অনুসরণ করো না, তাহলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। এগুলো তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর। (সূরা আল আন‘আম: ৬: ১৫৩)
যারা তাদের আকীদা-বিশ্বাস ও আমলকে সুনির্দিষ্ট মাযহাবের ওপর স্থিত করেন, তাদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত যে, তারা যখন কুরআন-সুন্নাহর কোনো মূলবক্তব্য দেখেন যা তাদের মাযহাবের বিপরীত, সেটাকে তারা অনুচিত ব্যাখ্যা দিয়ে তাদের মাযহাবের পক্ষে আনার চেষ্টা করেন। অতঃপর তারা কুরআন-সুন্নাহকে অনুকরণীয় নয় বরং তাদের মাযহাবের অনুসারী বানিয়ে ফেলেন। কুরআন-সুন্নাহ ব্যতীত যা আছে সেগুলোকে তারা কুরআন-সুন্নাহর অনুসারী বানান না। এটা হলো প্রবৃত্তিপূজারীদের পথ। এটা হিদায়েত অনুসারীদের পথ নয়। এই পথকে আল্লাহ তা‘আলা ভৎর্সনা করেছেন। তিনি বলেছেন:
﴿ وَلَوِ ٱتَّبَعَ ٱلۡحَقُّ أَهۡوَآءَهُمۡ لَفَسَدَتِ ٱلسَّمَٰوَٰتُ وَٱلۡأَرۡضُ وَمَن فِيهِنَّۚ بَلۡ أَتَيۡنَٰهُم بِذِكۡرِهِمۡ فَهُمۡ عَن ذِكۡرِهِم مُّعۡرِضُونَ ٧١ ﴾ [المؤمنون: ٧١]
আর যদি সত্য তাদের কামনা-বাসনার অনুগামী হত, তবে আসমানসমূহ, জমিন ও এতদোভয়ের মধ্যস্থিত সব কিছু বিপর্যস্ত হয়ে যেত; বরং আমি তাদেরকে দিয়েছি তাদের উপদেশবাণী (কুরআন)। অথচ তারা তাদের উপদেশ হতে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। (সূরা আল মুমিনূন: ২৩: ৭১)
এ ক্ষেত্রে মানুষের অবস্থা যে পর্যবেক্ষণ করতে যাবে সে আজব ধরনের বিষয় দেখতে পাবে। সে বুঝতে পারবে যে, হিদায়েত ও সত্যের ওপরে থাকার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা এবং গোমরাহী ও পথভ্রষ্টতা থেকে বেঁচে থাকার জন্য আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া একজন বান্দার জন্য কতোই না প্রয়োজন।
আর যে ব্যক্তি সত্য হৃদয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবে, আল্লাহর কাছে নিজের অপারগতা প্রকাশ করবে -আল্লাহ তা‘আলার অমুখাপেক্ষিতার ব্যাপারে পূর্ণ জ্ঞান রেখে এবং সে যে আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী তা অন্তরে অনুভব করে -তাহলে অবশ্যই আশা করা যায় যে, আল্লাহ তা‘আলার বান্দার এ প্রার্থনাকে কবুল করবেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌۖ أُجِيبُ دَعۡوَةَ ٱلدَّاعِ إِذَا دَعَانِۖ فَلۡيَسۡتَجِيبُواْ لِي وَلۡيُؤۡمِنُواْ بِي لَعَلَّهُمۡ يَرۡشُدُونَ ١٨٦ ﴾ [البقرة: ١٨٦]
আর যখন আমার বান্দাগণ তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, আমি তো নিশ্চয় নিকটবর্তী। আমি আহবানকারীর ডাকে সাড়া দেই, যখন সে আমাকে ডাকে। সুতরাং তারা যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি ঈমান আনে। আশা করা যায় তারা সঠিক পথে চলবে। (সূরা আল বাকারা: ২: ১৮৬)
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন আমাদের ওই লোকদের অন্তর্ভুক্ত করেন যারা সত্যকে সত্য হিসেবে দেখে এবং তার অনুসরণ করে। এবং অসত্যকে অসত্য হিসেবে দেখে এবং তা বর্জন করে চলে। তিনি যেন আমাদেরকে হিদায়েতকারী ও হিদায়েতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি যেন আমাদের সৎ ও সংস্কারকারী বানান। তিনি যেন আমাদেরকে হিদায়েত করার পর আমাদের অন্তরকে সত্যচ্যুত না করেন। তিনি যেন আমাদেরকে রহমত দান করেন, নিশ্চয় তিনি সর্বদাতা।
সকল প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্য যিনি সৃষ্টিকুলে রব। যার অনুকম্পা ও নিয়ামতে সকল ভালো কাজ সম্পন্ন হয়। আর সালাত ও সালাম রহমতের নবীর ওপর, যিনি উম্মতকে প্ররাক্রমশালী ও সপ্রংশ আল্লাহ তা‘আলার পথ দেখিয়েছেন আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশেই। সালাত ও সালাম তার পরিবারবর্গের প্রতি, সাহাবীগণের প্রতি এবং যারা কিয়ামত পর্যন্ত তাদের অনুসরণ করবেন তাদের সকলের প্রতি।

সুত্রঃ Quraneralo

Share This Post
Translate In English