কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক বার্তা প্রচার করাই হল এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

লাল বাতি জ্বালালে নামাজ পড়া নিষেধ এরকম লেখা কি ইসলাম অনুমোদন করে?

?প্রশ্নঃ অনেক মসজিদে লেখা থাকে ‘লাল বাতি জ্বালালে নামাজ পড়া নিষেধ’ এরকম লেখা কি ইসলাম অনুমোদন করে?

?উত্তরঃ’লাল বাতি জ্বলাকালে সুন্নতের নিয়ত করবেন না’, ‘লাল বাতি জ্বললে নামাজ পড়া নিষেধ’_ এ জাতীয় নিষেধাজ্ঞামূলক লেখা কিছু মসজিদে ঠিক লাল বাতির নিচে দেখা যায়। প্রশ্ন হলো, লাল বাতি জ্বালিয়ে সুন্নত পড়তে, নামাজ আদায় করতে নিষেধ করার ওই লেখা কি ধর্ম ও শরিয়তসম্মত বা কোরআন-হাদিস সমর্থিত? নাকি ধর্ম ও শরিয়ত-অসম্মত, কোরআন-হাদিসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক? আগে ফজরের পর নিষিদ্ধ সময়ে কেউ নামাজ পড়তে চাইলে সচেতন নামাজিরা একে অন্যকে নিষেধ করতেন। বর্তমানে মসজিদের ভেতরে আগের মতো নিষিদ্ধ সময়ের নিষেধাজ্ঞা হিসেবে নয়, প্রতি ওয়াক্তেই (তবে ফজরের ওয়াক্ত ছাড়া) ফরজ নামাজের পাঁচ মিনিট আগে সুন্নত নামাজ না পড়ার নিষেধাজ্ঞা হিসেবে লাল বাতি জ্বালানো হয়। ওয়াক্তমতো নামাজ আদায় করা যেমন ধর্মীয় দায়িত্ব, আবার নিষিদ্ধ সময়ে নামাজ আদায় করা থেকে বিরত থাকাও ধর্মীয় দায়িত্ব। আসলে ধর্ম হচ্ছে দুটি বিষয়ের সমষ্টি_ একটি হচ্ছে পালন করা, অন্যটি হলো বর্জন করা। শুধু পালন করা যেমন ধর্ম নয়, কেবল বর্জন করাও ধর্ম নয়। ইমানদারের জীবনে এ দুটিই থাকতে হবে। জেনে বা না জেনে নিষিদ্ধ সময়ে কেউ নামাজের নিয়ত করলে তাকে বারণ করাও ধর্মীয় দায়িত্ব। তাই বলে ফরজ নামাজের পাঁচ মিনিট আগে সুন্নত নামাজ পড়তে নিষেধ করাও কি ধর্মীয় দায়িত্ব?

সূরা বাকারার ১১৪ নম্বর আয়াতে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর মসজিদগুলোতে আল্লাহর নাম নিতে বাধা দেয় এবং সেগুলোকে উজাড় করতে চেষ্টা করে, তার চেয়ে বড় জালেম আর কে?’ আল্লাহর নাম নিতে বাধা দেওয়া মানে কী? এর মানে হচ্ছে সব ধরনের নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত ও তাসবিহ আদায়ে নিষেধ করা, বাধা দেওয়া, মসজিদে গমন করতে বাধা দেওয়া, মসজিদে হট্টগোল করা অথবা মসজিদের আশপাশে আওয়াজ, গান-বাজনা করে মুসলি্লদের নামাজ ও তেলাওয়াতে বাধা দেওয়ার যত পন্থা হতে পারে_ সবই হারাম। একইভাবে মসজিদে নামাজির সংখ্যা যাতে হ্রাস পায় সেই লক্ষ্যে পরিচালিত সব ধরনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কাজকর্ম এবং পদক্ষেপও হারাম। নেক সুরতে হলেও বর্তমানে যেসব মসজিদে লাল বাতি জ্বালিয়ে সুন্নত নামাজ পড়তে নিষেধ করা হয়, এ নিষেধ কি নামাজ আদায়ে বাধা দেওয়ার আওতাভুক্ত নয়? ফরজ নামাজের জামাতের আগে লাল বাতি জ্বালিয়ে সুন্নত নামাজ পড়তে নিষেধ করার পদ্ধতি যে বা যারা চালু করেছেন বা এখনও করছেন তারা কি বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখেছেন?

এ ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখা জরুরি, কোরআন ও হাদিসে নামাজের নিষিদ্ধ সময় ছাড়াও কোন কোন সময়ে (উদাহরণ_ জুমার খুতবা চলাকালে, ফরজ নামাজের ইকামত দেওয়া হলে) সুন্নত বা নফল নামাজের নিয়ত করতে নিষেধ করা হয়েছে_ এ রকম সুস্পষ্ট নিষেধের উল্লেখ ছাড়া মনগড়া যেনতেন কারণে নামাজের নিয়ত করতে বাধা দেওয়ার এখতিয়ার কি কারও আছে? ফরজ নামাজের জামাতের পাঁচ মিনিট আগে সুন্নত নামাজের নিয়ত করা যাবে না, এ মর্মে কি কোনো বর্ণনা বা সমর্থন কোথাও আছে? কোরআন-হাদিসের কোথাও কি এ জাতীয় নিষেধের তথ্য পাওয়া যাবে? কোরআনের বর্ণনার সঙ্গে বিষয়টি কি সাংঘর্ষিক নয়? বুখারি শরিফে বর্ণিত হাদিস হচ্ছে, ‘তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে সে যেন বসার আগে দুই রাকাত সালাত আদায় করে নেয়।’ (সালাত অধ্যায়, হাদিস নম্বর-৪৩১)। হাদিসের আলোকে সুস্থ-স্বাভাবিক অবস্থায় (অসুস্থ-অপারগ বা শ্রান্ত-ক্লান্ত হলে ভিন্ন কথা) কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে আগে নামাজ পড়া এবং নামাজের শেষে বসাই ধর্মের নিয়ম বা নির্দেশ। লাল বাতি যখন জ্বলে অথচ ফরজ নামাজের ইকামতও হচ্ছে না তখন কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে নামাজ না পড়ে বসতে বাধ্য হওয়া কি হাদিসের বর্ণনার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক নয়? দুই মিনিট সময়ই তো হাদিসের ওপর আমল করার জন্য যথেষ্ট।

লাল বাতি জ্বলাকালে জামাত শুরু হওয়ার আগে ২-৩ মিনিট সময় থাকতে কেউ নামাজের নিয়ত করলে অতি উৎসাহী হয়ে ‘লাল বাতি জ্বলে, দেখেন না’ বা ‘লাল বাতি জ্বলে, তারপরও তিনি নিয়ত করছেন’_ এ জাতীয় কথা বলা থেকে বিরত থাকা দরকার। শ্রদ্ধেয় আলেম-ওলামা, মুফতি-ফকিহ, খতিব, ইমাম, পীর-মাশায়েখ, মসজিদ কমিটির প্রধানসহ সর্বস্তর ও সব পর্যায়ের ধর্মীয় খেদমতের সঙ্গে জড়িত এবং যারা ধর্ম যথাযথভাবে পালনে সচেষ্ট সবার কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ_ ধর্মের কথা ধর্মীয় মূলনীতি বজায় রেখে বলুন এবং ধর্মীয় মূলনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে তা পালন করুন। অত্যুক্তি নয় যে, কোরআন ও হাদিস থেকে জানতে চেষ্টা না করে আমরা এমন অনেক নেক আমল করছি, যাতে সওয়াব না হয়ে গোনাহ হচ্ছে।

আমি একটি দলীল দিলাম দেখুন কিভাবে সহীহ হাদীসকে লাল বাতি জ্বালিয়ে দুরে ঠেলে দেয়া হয়েছে :

হাদীস:১- আবু কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত । তিনি বলেন ,রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন ,যখন তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করবে ,তখন সে যেন দু’রাকাত সালাত আদায় করা ব্যতীত না বসে ।
( বুখারী হা/৪৪৪ , ১১৬৭ ; মুসলিম হা/ ৭১৪ ; তিরমিযী হা/ ৩১৬ ; নাসাঈ হা/ ৭৩০ ; আবু দাউদ হা/ ৪৬৭ ; ইবনু মাজাহ হা/ ১১২৩ ; আহমাদ হা/ ২২০১৭ , ২২০৭২ , ২২০৮৮ , ২২১৪৬ ;দারেমী হা/ ১৩৯৩ ; রিয়াদুস সালেহীন হা/ ১১৫১)

হাদীস:২: জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত । তিনি বলেন ,নবী করীম (সাঃ) এর খুৎবা দানকালে সেখানে এক ব্যক্তি আগমন করেন । তিনি তাকে বলেন , হে অমুক ! তুমি কি ( তাহিয়াতুল মাসজিদ ) সালাত পড়েছ ? ঐ ব্যক্তি বলেন , না । নবী ( সাঃ ) বলেন , তুমি দাঁড়িয়ে সালাত আদায় কর । অন্য হাদীসে বলা হয়েছে তুমি সংক্ষিপ্ত ভাবে দুই রাকাআত ( তাহিয়াতুল মাসজিদ ) সালাত আদায় কর ।
( বুখারী হা/৮৮৩ , ৮৮৪ ; মুসলিম হা/১৮৯৫ , ১৮৯৬ , ১৮৯৭ , ১৮৯৮ , ১৮৯৯ , ১৯০০ ; তিরমিযী ; ইবনে মাজাহ ; নাসাঈ হা/১৪০৩ ; আবু দাউদ হা/১১১৫ , ১১১৬ , ১১১৭)

প্রথম হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাহিয়াতুল মাসজিদ সালাতের গুরুত্ব বুঝিয়েছেন এবং এই সালাত না আদায় করে বসতে নিষেধ করেছেন ।

দ্বিতীয় হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিজে খুৎবা চলাকালীন অবস্থায় আগত ব্যক্তিকে দাঁড় করিয়ে দুই রাকাত তাহিয়াতুল মাসজিদ সালাত আদায় করিয়ে এই সালাতের গুরুত্বের প্রমাণ দিয়েছেন ।

আর আমাদের মসজিদ গুলিতে লাল বাতি জ্বালিয়ে নিষেধ করা হয় যে লাল বাতি জ্বলা কালীন কোন নামায পড়া নিষেধ। কারণ আপনাদের মাযহাবে তাহিয়াতুল মসজিদ নফল । আার খুৎবা ওয়াজিব । যে ওয়াজিব খুৎবা থামিয়ে তাহিয়াতুল মসজিদ নামায পড়ানো হল সেটা নফল হয় কি করে ?

একটু ভেবে দেখুন অন্ধ অনুসরণ করতে গিয়ে আমরা সহীহ হাদীসের সাথে যে আচরণ করছি তার পরে নবী (সাঃ) এর সামনে দাঁড়াতে পারবো তো ?

কৃতজ্ঞতাঃ শাহেদ কাজী

Share This Post
Translate In English