কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক বার্তা প্রচার করাই এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

সুন্নত সালাতের ক্বাযা আদায় করা যাবে কি

প্রশ্ন: সুন্নত সালাতের ক্বাযা আদায় করা যাবে কি? সালাতের নিষিদ্ধ সময় কয়টি এবং উক্ত নিষিদ্ধ সময় কি সকল সালাতের জন্য নাকি শুধুমাত্র নফল সালাতের জন্য?কাযা সালাত পড়ার ক্ষেত্রে আযান ইকামত দিতে হবে কি?
▬▬▬▬▬▬▬💠💠💠▬▬▬▬▬▬▬

◾সুন্নত সালাতের ক্বাযা আদায় করা যাবে কি? __________________________________
যেকোন সুন্নাত সালাত ছুটে গেলে তা পরে ক্বাযা আদায় করা যায় [সহীহ বুখারী, হা/১২৩৩]। বরং যারা নিয়মিত এ সালাতগুলো আদায় করে তাদের ছুটে গেলে বা ব্যস্ততায় সময় না পেলে আদায় করে নেয়া মুস্তাহাব। ইমাম শাফেঈ (রাহিমাহুল্লাহ) ও আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) এর মতে পড়াই উত্তম [মাজমূ‘ঊল ফাতাওয়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৪৩]। শায়খ সালেহ আল-উসায়মীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, যদি সুন্নাত সালাত ছুটে যায়, তাহলে সেটা ক্বাযা আদায় করাও আরেকটি সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদা ঘুমে থাকা অবস্থায় সূর্য উঠে যায় অথচ ফযর আদায় করেননি। এ অবস্থায় ঘুম থেকে উঠে প্রথমে সুন্নাত অতঃপর ফরজ আদায় করেন [সহীহ মুসলিম, হা/৬৮১]। কেউ যদি মনে করে এমন অবস্থায় কোন সালাত আগে আদায় করব? পূর্বেরটা প্রথমে না-কি যোহরের পরেরটাই প্রথমে? এক্ষেত্রে স্বাধীনতা রয়েছে সে যেকোন একটি আগে আদায় করতে পারে।[উন্মুক্ত সাক্ষাৎ, ইবনু উছায়মীন, বৈঠক নং ৭৪, প্রশ্ন নং ১৮; ইমাম শাওকানী, নায়লুল আওতার, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫]।
.
◾কাযা সালাত পড়ার ক্ষেত্রে আযান ইকামত দেওয়ার বিধান:
__________________________________
ক্বাযা নামায পড়ার জন্য আযান ও ইকামত বিধেয়। কয়েক ওয়াক্তের নামায কাযা পড়তে হলে, প্রথমবার আযান ও তারপর প্রত্যেক নামাযের জন্য পূর্বে ইকামত বলা কর্তব্য।যেমন খন্দকের যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবীদেরকে নিয়ে মাগরিবের পর যোহর, আছর, মাগরিব ও এশা এই চার ওয়াক্ত সালাত এক আযান ও চারটি পৃথক ইক্বামতে পরপর জামা‘আতের সাথে আদায় করেন। উক্ত সালাতগুলো স্ব স্ব ওয়াক্তে যেভাবে আদায় করতেন ঐ নিয়মেই আদায় করেন।[সহীহ বুখারী হা/৫৯৬ ও ৫৯৮, ১/৮৪ পৃঃ,ইঃফাঃ হা/৫৬৯ ও ৫৭১, ২/৩৫-৩৬ পৃঃ), ‘সালাতের সময়’ অধ্যায়,ওয়াক্ত পার হয়ে যাওয়ার পর রাসূল (সাঃ) জামা‘আতের সাথে সালাত আদায় করেছেন। [সহীহ মুসলিম হা/১৪৬২, ১/২২৭ নাসাঈ হা/৬৬১]

◾সালাতের নিষিদ্ধ সময় কয়টি এবং নিষিদ্ধ সময় কি সকল সালাতের জন্য নাকি শুধুমাত্র নফল সালাতের জন্য?
___________________________________
হাদীসের সালাতের ৫ টি নিষিদ্ধ সময় বর্ণিত হয়েছে। যেমন:

উক্ববা বিন আমের (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদেরকে তিন সময়ে নামায পড়তে এবং মুর্দা দাফন করতে নিষেধ করতেন;
▪️(১) ঠিক সূর্য উদয় হওয়ার পর থেকে একটু উঁচু না হওয়া পর্যন্ত,
▪️(২) সূর্য ঠিক মাথার উপর আসার পর থেকে একটু ঢলে না যাওয়া পর্যন্ত এবং
▪️(৩) সূর্য ডোবার কাছাকাছি হওয়া থেকে ডুবে না যাওয়া পর্যন্ত।[সহীহ মুসলিম ১৯৬৬, আহমাদ ১৭৩৭৭, আবূ দাঊদ ৩১৯৪, তিরমিযী ১০৩০, নাসাঈ ৫৬০, ইবনে মাজাহ ১৫১৯, মিশকাত ১০৪০ হাদিস সম্ভার,১৩৩]

অপর বর্ননায় সালাতের নিষিদ্ধ সময় পাঁচটিঃ
▪️১. সূর্যোদয়ের সময়
▪️২. সূর্যাস্তের সময়
▪️৩. ফজরের (ফজরের) সালাতের পর
▪️৪. ‘আসরের সালাতের পর
▪️৫. সূর্য ঠিক মাথার উপরে থাকার সময়[সহীহ বুখারী ৫৮৫, ৩২৮৩, মুসলিম ৮২৮ মিশকাত,১০৩৯]

▪️উপরোক্ত হাদীস দুটির ব্যাখ্যায়: ইমাম মালিক, ইমাম শাফিঈ, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল ও ইমাম ইসহাক (রহঃ) বলেন,ফরজ সালাতের ক্বাযা আদায়ের কোন নিষিদ্ধ সময় নেই।বরং একাধিক হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, স্মরণে আসা কিংবা ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার সাথে সাথে পড়ে নিতে হবে,এটাই বিশুদ্ধ কথা। অন্য যে হাদীসে তিনটি সময়ে সালাত আদায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সে হাদীস সাধারণ অর্থবোধক। আর স্মরণ হওয়ার সাথে সাথে আদায় করার হাদীস বিশেষ অর্থবোধক। তাই এ দু’ হাদীসের মধ্যে কোন বৈপরীত্য নেই।এবং স্মরণ হওয়ার সাথে সাথে আদায় করার হাদীস দ্বারা দু’টি বিষয় প্রমাণিত হয়, এক- সালাত আদায় ব্যতীত এর কোন প্রতিকার নেই। দুই- সালাত আদায় ভুলে গেলে কোন জরিমানা, অতিরিক্ত কিছু বা সদাক্বাহ্ (সাদাকা) ইত্যাদি আদায় করা আবশ্যক নয়, যেমনটি সওম ছেড়ে দিলে করতে হয়।[মিশকাতুল মাসাবি,৬০৩ নং হাদীসের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য]
.
ইবনু কুদামাহ, (রহঃ) বলেন,তিনটি সময়ে সালাত আদায় করতে নিষেধ করা হয়েছে, তা মূলতঃ সাধারণ নফল সালাতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ক্বাযা সালাত, জানাযার ছালাত, তাহিয়াতুল মাসজিদ, ত্বাওয়াফ শেষে দু’রাক‘আত নফল সালাত প্রভৃতি বিশেষ কারণযুক্ত সালাতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।[ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী ২/৮১]
.
শায়খ ইবনে উসাইমিন (রহঃ) বলেন,ক্বাযা সালাত আদায় করতে দেরী করা এবং নিষিদ্ধ সময়ে ক্বাযা সালাত আদায় করা যাবে না মর্মে যে ধারণা সমাজে চালু আছে তা সহীহ হাদীসের বিরোধী। বরং যখনই স্মরণ হবে কিংবা ঘুম থেকে জাগ্রত হবে তখনই ধারাবাহিকভাবে ক্বাযা সালাত আদায় করে নিবে।[সহীহ বুখারী হা/৫৯৬-৫৯৭, ১/৮৪ পৃঃ, ইঃফাঃ হা/৫৬৯ ও ৫৭১, ২/৩৫-৩৬ পৃঃ ফতোয়ায় আরকানুল ইসলাম প্রশ্ন নং ২০৯]

শায়খ নাসির উদ্দীন আলবানী (রহঃ) বলেন,যে,ক্বাযা সালাতের জন্য কোন নিষিদ্ধ ওয়াক্ত নেই।[আলবানী, মিশকাত হা/৬০২-এর টীকা দ্রঃ ১ম খন্ড, পৃঃ ১৯১]

▪️উল্লেখ্য যে,সূর্যোদয়ের সময় ফজরের এক রাকাআত এবং সূর্য অস্তের সময় আসরের এক রাকাত পেলে পরিপূর্ণ সালাত পেয়েছে বলে গণ্য হবে।কেননা,রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, তোমাদের কেউ যদি সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্বে আছরের ছালাতের এক সিজদা পায়, তাহ’লে সে যেন ছালাত পূর্ণ করে নেয়। আর যদি সূর্য উদিত হবার পূর্বে ফজরের ছালাতের এক সিজদা পায়, তাহ’লে সে যেন ছালাত পূর্ণ করে নেয় [সহীহ বুখারী হা/৫৫৬; মিশকাত হা/৬০২]

▪️হাদীসটির ব্যাখ্যা: জমহূরের মতে যে ব্যক্তি সূরাহ্ আল ফাতিহাহ্ পড়া সহ এক রাকআতের অন্যান্য ওয়াজিব যেমন, রুকূ’ ও সাজদাসমূহ পূর্ণভাবে আদায় করে ফজরের (ফজরের) এক রাক্‘আত সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) সূর্য উদয়ের পূর্বে পেল সে যেন পূর্ণ সালাতই নির্ধারিত ওয়াক্তে পেল। এক রাক্‘আতের কম পেলে সেটা ওয়াক্তের মধ্যে গণ্য হবে না। তার ঐ সালাত ক্বাযা হবে। এটাই জমহূরের মত।

ইমাম নাবাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,আলিমগণ এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, সূর্য উদয়কাল কিংবা অস্তকাল পর্যন্ত সালাতকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করা বৈধ নয়। সূর্য উদয়ের পূর্বে এক রাক্‘আত পেলে এবং সূর্য উদয়ের পরে এক রাক্‘আত পড়লে তার সালাত পূর্ণ হয়ে যাবে। জমহূর ‘আলিমগণের এ মতের পক্ষে এ সম্পর্কে বায়হাক্বীতে দু’টি স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। সেখানে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি সূর্য উদয়ের পূর্বে ফাজরের (ফজরের) সালাতের এক রাক্‘আত পেল এবং এক রাক্‘আত সূর্য উদয়ের পরে পড়ল, সে যেন পূর্ণ সালাতই নির্দিষ্ট ওয়াক্তে পেল। বায়হাক্বীতে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্বে ‘আসরের এক রাক্‘আত আদায় করলো এবং বাকী অংশ সূর্যাস্তের পর আদায় করলো, তার ‘আসরের সালাত নষ্ট হলো না। তিনি ফাজরের (ফজরের) সালাতের ক্ষেত্রেও একই কথা বলেছেন। বুখারীর বর্ণনায় এ হাদীসের শেষে উল্লেখ রয়েছে, ‘‘সে যেন তার সালাতকে পূর্ণ করে’’। নাসায়ীর বর্ণনায় রয়েছে, যে ব্যক্তি সালাতের (নির্দিষ্ট সময়ে) এক রাক্‘আত পেল সে যেন পূর্ণ সালাতই পেল। তবে যে রাক্‘আত আদায় করতে পারেনি সে তা ক্বাযা করবে’’।

এ হাদীস প্রমাণ করে যে, যে ব্যক্তি সূর্য উদয়ের পূর্বে ফাজরের (ফজরের) সালাতের এক রাক্‘আত পেল সে যেন ফাজরের (ফজরের) পূর্ণ সালাতই পেল এবং সূর্য উদয়ের ফলে তার সালাত বাতিল হবে না। এমনিভাবে যে ব্যক্তি সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্বে ‘আসরের সালাত পেল এবং সূর্য অস্ত যাওয়ার ফলে তার সালাত বাতিল হবে না। ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ, আহমাদ, ইসহাক (রহঃ)-এর মত এটিই, আর এটিই সঠিক মত।[শারহুন নাবাবী সহীহ মুসলিমের ৬০১ নং হাদীসের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য ]

ইমাম আবূ হানীফাহ্ এ হাদীসের বিরোধী মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি ফাজরের (ফজরের) সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) আদায় করছে এমতাবস্থায় সূর্য উদিত হলো তাহলে তার সালাত বাতিল হয়ে যাবে। তিনি তিন সময়ে সালাত আদায় নিষিদ্ধ হওয়ার হাদীস দ্বারা তার মতের পক্ষে দলীল প্রদান করেছেন। এর উত্তরে বলা যায় যে, সূর্য উদয়ের সময় সালাত আদায় নিষিদ্ধ হওয়া সম্পর্কিত বিধান ‘আম্ তথা ব্যাপক আর আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)-এর এ হাদীস খাস তথা বিশেষ হুকুম জ্ঞাপক।
[মিরক্বাতুল মাফাতীহ ৬০২ নং হাদীসের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য ]
.
পাশাপাশি এটাও জেনে রাখা ভালো যে,উলামাগণের মতামতের মধ্যে গ্রহণযোগ্য মত হচ্ছে, কারণ বিশিষ্ট নফল সালাত সমূহ আদায় করার ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ সময় বলতে কোন কিছু নেই। নিষিদ্ধ সময়েও তা আদায় করতে কোন বাধা নেই। যেমন:তাহিয়্যাতুল ওযূ; ওযূ করলে পড়তে হয়। তাহিয়্যাতুল মসজিদ; মসজিদে প্রবেশ করলেই না বসে পড়তে হয়।[সহীহ বুখারী, হা/১১৬৩; সহীহ মুসলিম, হা/৭১৪]মাক্বামে ইবরাহীমের পিছনে দুই রাকা’আত সালাত; তওয়াফ করলে পড়তে হয় ইত্যাদি।সুতরাং যখনই সাবাব তথা কারণ ঘটবে, তখনই সেই সালাত আদায় করা যাবে।
.
অনুরূপভাবে ঘুম বা ভুল বশত: ঘুমের কারণে অথবা ভুলে যাবার জন্য ছুটে যাওয়া যে কোন ওয়াক্তের ফরজ সালাত,এবং ফজরে দু রাকাআত সুন্নাত সালাত (তবে ফজরের দু রাকআত সুন্নত সূর্য উঠার পর পড়াই অধিক উত্তম), সূর্য গ্রহণ ও চন্দ্র গ্রহণের সালাত, জানাযার সালাত ইত্যাদি এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে। অর্থাৎ এগুলো নিষিদ্ধ সময়েও পড়া জায়েয আছে। এ ব্যাপারে এটাই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য অভিমত। (আল্লাহ্‌ই অধিক জ্ঞাত আছেন)।
▬▬▬▬💠💠💠▬▬▬▬
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।