শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে কাদের জানাযা পড়া নিষিদ্ধ এবং কোন কোন অপরাধের কারণে মুসলিম ব্যক্তির জানাযা পড়া যাবে না

প্রশ্ন: শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে কাদের জানাযা পড়া নিষিদ্ধ এবং কোন কোন অপরাধের কারণে মুসলিম ব্যক্তির জানাযা পড়া যাবে না। অর্থাৎ ইমাম বা পরহেযগার ব্যক্তি জানাযা পড়তে পারবে না?
▬▬▬▬▬▬▬▬●◈●▬▬▬▬▬▬▬▬
প্রথমত: শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে জানাযা পড়া হবে শুধুমাত্র ঐ মৃতের যিনি মুসলমান অবস্থায় ঈমানের উপর মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু যে সকল পাপ করলে মানুষ জন্মগত মুসলিম হলেও পরবর্তীতে দ্বীন থেকে বেরিয়ে মুরতাদ হয়ে যায় অতঃপর উক্ত পাপ থেকে তওবা করে পুনরায় মুসলিম হওয়ার পূর্বেই মৃত্যু বরন করে তাদের জানাযা পড়া যাবে না। যেমন: কাফের, মুশরিক, নাস্তিক-মুরতাদ, জাদু প্রদর্শনকারী বা গায়েবি ইলমের দাবিদার গণক, সালাত পরিত্যাগকারী, আক্বীদাগত (বড়) মুনাফিক, আক্বীদাগত বিদআতী যা তাদেরকে কুফর পর্যন্ত নিয়ে যায় ইত্যাদি ব্যক্তিদের মৃত্যুর পর তাদেরকে গোসল করানো হবে না, তাদের জানাযার সালাত পড়ানো হবে না এবং তাদেরকে মুসলমানদের গোরস্থানে দাফন করা হবে না, তাদের জন্য গোপনে বা প্রকাশ্যে কোন প্রকার ক্ষমা প্রার্থনার দুআ করা যাবে না। বরং তাদেরকে কাফেরদের মত মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে।(বিস্তারিত জানতে দেখুন; সূরা আত-তাওবাহ: ৮৪, ১১৩; আল-মাজমূঊ লিন-নাবাবী, ৫/২৫৮; আল-মাওসূ‘আতিল ফিক্বহিয়্যাহ, ৪১/২১ পৃ.; সহীহ মুসলিম হা/৮২; তিরমিযী, হা/২৬২১, ২৬২২; ইবনু মাজাহ, হা/১০৮০, ৮৯২; মাজমূঊল ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ,খন্ড: ২০ পৃষ্ঠা: ৯৭; আস-সালাতু ওয়া আহকামু তারিকীহা,পৃষ্ঠা: ৬৪ সহীহ বুখারী হা/২৭৬৬, ৬৮৫৭; মাজমূঊ ফাতাওয়া লি ইবনে বায, খন্ড: ৮ পৃষ্ঠা: ১১১)।
.
মৃত কাফের-মুশরিক মুরতাদের জন্য রহমত ও মাগফিরাতের জন্য দুআ করা জায়েজ নেই। এই মর্মে দলিল হচ্ছে আল্লাহ তাআলা বলেন,مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَن يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَىٰ مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ “নবী ও মুমিনদের জন্য উচিত নয় মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা যদিও তারা নিকটাত্মীয় হয় একথা সুস্পষ্ট হওয়ার পর যে তারা জাহান্নামী।” (সূরা তওবা: ১১৩) সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, হুদাইবিয়া সন্ধির সময় প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের সাথে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সাথে আছে এক হাজার ঘোড় সওয়ার। মক্কা ও মদিনার মাঝে অবস্থিত আবওয়া নামক স্থানে তাঁর প্রাণ প্রিয় মা-জননী চির নিদ্রায় শায়িত আছেন। সে পথ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি যাত্রা বিরতি করে তাঁর মা’র কবর যিয়ারত করতে গেলেন। কবরের কাছে গিয়ে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। তার চতুর্দিকে দাঁড়িয়ে থাকা সাহাবীগণও কাঁদতে লাগলেন। অতঃপর তিনি বললেন,اسْتَأْذَنْتُ رَبِّي في أَنْ أَسْتَغْفِرَ لَهَا فَلَمْ يُؤْذَنْ لِي، وَاسْتَأْذَنْتُهُ في أَنْ أَزُورَ قَبْرَهَا فَأُذِنَ لِي، فَزُورُوا القُبُورَ فإنَّهَا تُذَكِّرُ المَوْتَ“আমি আল্লাহর দরবারে আমার মা’র জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুমতি চেয়েছিলাম কিন্তু অনুমতি দেয়া হয়নি। কিন্তু তার কবর জিয়ারতের জন্য অনুমতি প্রার্থনা করলে তিনি তাতে অনুমতি দেন। সুতরাং তোমরা কবর যিয়ারত কর। কারণ কবর জিয়ারত করলে পরকালের কথা স্মরণ হয়।” (সহীহ মুসলিম হা/২১৪৯) উক্ত হাদীসের আলোকে ইমাম নববী রহ. বলেন,الصلاة على الكافر والدعاء له بالمغفرة : حرام بنص القرآن والإجماع .“কোনো কাফিরের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া (funeral) করা এবং তার জন্য মাগফিরাতের দুআ করা কুরআনের আয়াত ও উম্মতের ইজমা দ্বারা হারাম” (নববী আল মাজমু: ৫/১১৯) শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,فإن الاستغفار للكفار لا يجوز بالكتاب والسنَّة والإجماع “নিশ্চয় কাফিরদের জন্য ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করা কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমায়ে উম্মত অনুযায়ী নাজায়েয।”(মাজমুঊল ফাতাওয়া: খন্ড: ১২, পৃষ্ঠা: ৪৮৯)
.
সৌদি আরবের বর্তমান গ্র্যান্ড মুফতি আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ আলুশ শাইখ (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৬২ হি./১৯৪৩ খ্রি.] বলেছেন, “এটা সুবিদিত যে, কাফিরের জন্য দোয়া করা যাবে না। কাফিরের জন্য দোয়াও করা যাবে না, ক্ষমাপ্রার্থনাও করা যাবে না। যেমন আল্লাহ বলেছেন, ‘নাবী ও মুমিনদের জন্য শোভনীয় নয় তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করবে; যদিও মুশরিকরা তাদের জ্ঞাতিবর্গ হয়ে থাকে।’ (সূরা তাওবা: ১১৩) সুতরাং যে গাইরুল্লাহর ইবাদত করে, আল্লাহর সাথে অন্যের শরিক স্থাপন করে, তার প্রতি আমি রহমতের দোয়া করব না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তির বিদ‘আত ‘কাফির সাব্যস্তকারী বিদআত’ নয়, আর তার বিদ‘আত তাকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেয়নি, সে একজন পাপী মুসলিম। আমি আল্লাহর কাছে তার জন্য মুক্তি চাইব।” [গৃহীত: আল-আথারি (alathary) ডট নেট]
.
নাস্তিক-মুরতাদ, বড় মুনাফিকী, পরিপূর্ণ সালাত ত্যাগকারী ইত্যাদি ব্যক্তিদের জানাযার সালাত আদায় করা হারাম হওয়ার বিষয়টি শরীয়তের সুস্পষ্ট দলিল দ্বারা প্রমাণিত। মহান আল্লাহ বলেন,وَ لَا تُصَلِّ عَلٰۤی اَحَدٍ مِّنۡهُمۡ مَّاتَ اَبَدًا وَّ لَا تَقُمۡ عَلٰی قَبۡرِهٖ ؕ اِنَّهُمۡ كَفَرُوۡا بِاللّٰهِ وَ رَسُوۡلِهٖ وَ مَا تُوۡا وَ هُمۡ فٰسِقُوۡنَ “আর তাদের মধ্যে কারো মৃত্যু হলে আপনি কখনো তার জন্য জানাযার সালাত পড়বেন না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবেন না; তারা তো আল্লাহ ও তার রাসূলকে অস্বীকার করেছিল এবং ফাসেক অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়েছে”।(সূরা তওবাহ: ৮৪) এই আয়াত যদিও মুনাফিক্বদের সর্দার আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে, তবুও এর নির্দেশ ব্যাপক। প্রত্যেক সেই ব্যক্তি যার মৃত্যু কুফরী ও মুনাফিক্বীর উপরেই হয়ে থাকে, সে এরই অন্তর্ভুক্ত। উক্ত আয়াতের তাফসিরে ইমাম কুরতুবি রহ বলেন, هٰذَا نَصٌّ فِيْ الامْتِنَاعِ مِنَ الصَّلاٰةِ عَلىٰ الْكُفَّا
“এটি সকল কাফেরের জানাযা নিষিদ্ধ হওয়ার সুস্পষ্ট দলিল।(আলজামি’ লিআহকামিল কুরআনিল কারীম: খন্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ১৪০) কাফের, মুরতাদ, বেনামাজি, জাদুকর, মুনাফেকিদের জানাযা পড়া জায়েজ নয় মর্মে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ফাতওয়া যেমন:
.
আবু ইসহাক সিরাজী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: وإن مات كافر لم يصل عليه ، لقوله عز وجل: (وَلا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِنْهُمْ مَاتَ أَبَداً وَلا تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ) التوبة/84، ولأن الصلاة لطلب المغفرة ، والكافر لا يغفر له، فلا معنى للصلاة عليه “যদি কোন কাফির মারা যায়, তার জানাযা পড়া যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন: (সুরা তওবা: ৮৪) যেহেতু জানাযার সালাতে ক্ষমা চাওয়া হয়, আর কাফিরকে ক্ষমা করা হবে না, তাহলে তার জন্য দোয়া করার কোন অর্থ নেই। (মুহাজ্জাব: খন্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৫০)শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন,”وَأَجْمَعُوا عَلَى تَحْرِيمِ الصَّلَاةِ عَلَى الْكَافِرِ “কাফেরের জানাযার সালাত আদায় করা হারাম এ বিষয়ে তাঁরা ঐক্যমত পোষণ করেছেন।(নববী আল মাজমু: খন্ড; ৫, পৃষ্ঠা:২৫৮)
.
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮] বলেন; أَمَّا تَارِكُ الصَّلَاةِ. فَهَذَا إنْ لَمْ يَكُنْ مُعْتَقِدًا لِوُجُوبِهَا فَهُوَ كَافِرٌ بِالنَّصِّ وَالْإِجْمَاعِ، ‘সালাত পরিত্যাগকারী যদি এর ফরযিয়াতকে অস্বীকার করে; তাহলে সে কুরআন- সুন্নাহর দলীল ও ইজমা দ্বারা কাফের সাব্যস্ত হবে।(আল-ফাতাওয়াল কুবরা: ২/১৮) শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন; تَارِكُ الصَّلَاةِ فَإِنْ كَانَ مُنْكِرًا لِوُجُوبِهَا فَهُوَ كَافِرٌ بِإِجْمَاعِ الْمُسْلِمِينَ خَارِجٌ مِنْ مِلَّةِ الْإِسْلَامِ সালাত পরিত্যাগকারী যদি এর ফরযিয়াতকে অস্বীকার করে তাহলে সে মুসলিমদের ঐক্যমতে কাফের এবং মুসলিম মিল্লাত থেকে বহিষ্কৃত। (শরহুন নববী আলা মুসলিম, খন্ড: ২ পৃষ্ঠা: ৭০). সৌদি আরবের ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) আলিমগণ বলেছেন, تارك الصلاة جحدا لوجوبها كافر بإجماع أهل العلم، وتاركها تساهلا وكسلا كافر على الصحيح من قولي أهل العلم، وعليه فلا تجوز الصلاة عليه، ولا تشييع جنازته من العلماء ولا غيرهم، ولا دفنه في مقابر المسلمين. ‘ফরযিয়াতকে অস্বীকার করে সালাত পরিত্যাগকারী ব্যক্তি বিদ্বানগণের ঐক্যমতে কাফের। আর অলসতা বা উদাসীনতা বশত সালাত পরিত্যাগকারী ব্যক্তি বিদ্বানদের বিশুদ্ধ মতে কাফের। এই ফাতওয়া মতে তার জানাযার সালাত আদায় করা যাবে না, কোন আলেম বা অন্য কেউ তার জানাযার অনুগমন করবে না এবং মুসলমানদের কবরস্থানে তাকে দাফন করা যাবে না। (ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; গ্রুপ: ২; খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৪১৩)
.
মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ,কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষে বলা হয়েছে,كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّي عَلَى الْمُنَافِقِينَ وَيَسْتَغْفِرُ لَهُمْ، حَتَّى نَزَل قَوْل اللَّهِ تَعَالَى: (اسْتَغْفِرْ لَهُمْ أَوْ لاَ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ إِنْ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ سَبْعِينَ مَرَّةً فَلَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ) . فَلَمْ يَكُنْ يُصَلِّي عَلَيْهِمْ بَعْدَ ذَلِكَ ، وَلاَ يَسْتَغْفِرُ لَهُمْ.وَكَانَ مَنْ مَاتَ مِنْهُمْ صَلَّى عَلَيْهِ الْمُسْلِمُونَ الَّذِينَ لاَ يَعْلَمُونَ أَنَّهُ مُنَافِقٌ ، وَمَنْ عُلِمَ أَنَّهُ مُنَافِقٌ لَمْ يُصَل عَلَيْهِ.وَكَانَ عُمَرُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ إِذَا مَاتَ مَيِّتٌ لَمْ يُصَل عَلَيْهِ ، حَتَّى يُصَلِّيَ عَلَيْهِ حُذَيْفَةُ ؛ لأِنَّ حُذَيْفَةَ كَانَ قَدْ عَلِمَ أَعْيَانَ الْمُنَافِقِينَ ”
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুনাফিকদের জানাযার সালাত আদায় করেছিলেন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন যতক্ষণ না নিম্নোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ বলেন,”(হে মুহাম্মাদ) আপনি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন অথবা তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা না করুন একই কথা; আপনি সত্তর বার তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেও আল্লাহ তাদেরকে কখনই ক্ষমা করবেন না”।(সূরা তওবা: ৮০) অতঃপর এরপর থেকে আর তাদের জানাযার সালাত আদায় করেননি এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেননি। আর যে সকল মুনাফিকদের ওপর মুসলিমরা জানাযার সালাত আদায় করেছেন মূলত তারা জানতেন না যে সে মুনাফিক। আর যার ব্যাপারে তারা জানতেন যে সে মুনাফিক তার জানাযার সালাত আদায় করেননি। কেউ মারা গেলে প্রখ্যাত সাহাবী ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) তার জানাযা পড়াতেন না যতক্ষণ না হুজাইফা (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) তার জানাযা পড়তেন, কারণ হুজাইফা (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) জানতেন কারা মুনাফিক।(আল-মাওসুআতুল ফিক্বহিয়্যাহ খন্ড: ৪১, পৃষ্ঠা: ২১)
.
শাইখ ইবনে বায (রাহিমাহুল্লাহ)কে জাদুকর ব্যক্তির উপর জানাযার সালাত আদায় করা এবং তাকে হত্যা করার পর মুসলিমদের গোরস্থানে দাফন করার বিধান সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে, তিনি উত্তরে বলেন:-” إذا قتل لا يصلى عليه ، ولا يدفن في مقابر المسلمين ، يدفن في مقابر الكفرة ، ولا يدفن في مقابر المسلمين ، ولا يصلى عليه ، ولا يغسل ولا يكفن “যখন তাকে হত্যা করা হবে তার জানাজার সালাত আদায় করা হবে না এবং মুসলিমদের গোরস্থানে তাকে দাফন করা যাবে না। তাকে কাফেরদের গোরস্থানে দাফন করতে হবে। আর মুসলিমদের গোরস্থানে দাফন করা হবে না এবং তার ওপর জানাযার সালাত আদায় করা হবে না। তাছাড়াও তাকে গোসল দেওয়া ও কাফন দেওয়াও যাবে না”।(ইবনে বাজ: মাজমু’ল ফাতওয়া: খন্ড: ৮, পৃষ্ঠা:১১১; ফাতওয়া নং: ১৩৯৪১)।
.
▪️দ্বিতীয়ত: যেসকল গুনাহগার মুসলিমদের জানাযা পড়া জায়েজ: উপরোক্ত ব্যক্তিবর্গ ছাড়া অন্যরা যারা পাপী কিন্তু ইসলাম থেকে খারিজ হয় না যেমন: সালাত ও যাকাত ফরয জানা ও মানা সত্ত্বেও মাঝে মধ্যে দুই একবার যে তা ত্যাগ করে, যিনা-ব্যভিচার করে, সুদ ভক্ষণ করে, মদ্য পান করে, খেয়ানত করে, আত্মহত্যা করে, চুরি করে, মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করে, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া ,অবৈধ ভাবে কাউকে হত্যা করে, অলসতা বসত মাঝে অথবা অনুরূপ কোন পাপ করে মারা যাওয়া ব্যক্তিরা যদি এই পাপগুলো হালাল মনে না করে শয়তানের ধোকায় পড়ে লিপ্ত হয় এবং তওবা ব্যতীত মৃত্যুবরণ করে তাহলে সে ব্যক্তি কাফের নয়। বরং তিনি কবিরা গুনাহগার ফাসিক মুসলিম। অতএব তার মৃত্যুর পর একজন মুসলিমের ন্যায় গোসল, জানাযা ইত্যাদি যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। তার জন্য দু‘আ করতে হবে। সে কবিরা গুনাহর জন্য নির্ধারিত প্রতিদান তথা শাস্তির হকদার হবে। তবে সে জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে না। তার বিষয়টি আল্লাহর কাছেই অর্পিত থাকবে।আল্লাহ চাইলে তাঁকে ক্ষমা করতে পারেন আবার শাস্তিও দিতে পারেন। যদি তিনি শাস্তি প্রদান করেন তাহলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শাস্তি প্রদান করার পর তাঁর ঈমানের কারণে তাকে জান্নাত দিবেন এবং তার উপর থেকে চিরস্থায়ী জাহান্নামের শাস্তি তুলে নিবেন। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন, إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করা ক্ষমা করবেন না। এছাড়া অন্য সব (গুনাহ) যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন।” (সূরা আন-নিসা: ৪৮) ইমাম জারীর আত্ব-ত্বাবারী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘এ আয়াত প্রমাণ করে যে, কাবীরা গুনাহগারদের বিষয়গুলো আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছাধীন বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত: তিনি ইচ্ছা করলে তাকে এর জন্য ক্ষমা করবেন এবং যদি তিনি চান তবে তিনি তাকে এর জন্য শাস্তি দেবেন যতক্ষণ না তার বড় পাপ আল্লাহর সাথে শরীক করা (শিরক) না হয়।(তাফসীরে আত-তাবারী: খন্ড: ৮ পৃষ্ঠা: ৪৫০)
.
কাবীরাহ গুনাহে লিপ্ত মুসলিমদের জানাযা পড়া জায়েজ এ ব্যাপারে আলেমদের ইজমা‘ রয়েছে। যেমন: ক্বাযী আয়ায, ইমাম ইবনে আব্দিল বার্র, ইমাম কুরতুবী ও ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুমুল্লাহ) বলেন, ‘মুসলিম মৃত ব্যক্তির জানাযার সালাত আদায় করতে হবে, এটি দিবালোকের উজ্জ্বল সূর্যের ন্যায় প্রতিষ্ঠিত বিধান। ইসলামের স্বর্ণযুগে কোন মুসলিম ব্যক্তির জানাযার সালাত ছেড়ে দেয়া হয়নি। তবে কিছু মানুষ সম্পর্কে রাসূল (ﷺ) বলেছিলেন আমি পড়ব না কিন্তু তোমরা পড়ে নাও। সুতরাং উলামা, ইমাম ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের উচিত, এমন লোকদের জানাযা না পড়া। যাতে ওদের ন্যায় জীবিত অন্যান্য পাপীরা এ থেকে শিক্ষা ও উপদেশ পায়।যেমনটি নবী (ﷺ) করেছিলেন। তিনি আত্মহত্যা কারী, ঋণগ্রস্ত, গাণীমতের মাল আত্মসাৎকারী ব্যক্তির জানাযা নিজে পড়া থেকে বিরত ছিলেন তবে তিনি সাহাবীাদের সম্বোধন করে বলেছিলেন, صَلُّوْا عَلَى صَاحِبِكُمْ “তোমাদের সাথীর জানাযার সালাত তোমরাই আদায় করে নাও”’ (সহীহ বুখারী, হা/২২৯৫; আহকামুল জানায়িয লিল আলবানী, পৃ. ১০৩; আবূ দাঊদ, হা/২৭১০)।(আরো বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইকমালুল মু’লিম বি ফাওয়াঈদি মুসলিম, ৩/৪৫৪ ও ৫/৫২৩; নববী শারহুন সহীহ মুসলিম,খন্ড;৭; পৃষ্ঠা; ৪৭-৪৮; আত-তামহীদ,খন্ড: ৬; পৃষ্ঠা:৩৩১-৩৩২; তাফসীরে কুরতুবী, ৮/২২১; বাদায়িউস সানায়ী, খন্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩১১; ফাৎহুল আযীয, ৫/১৪৪; রাওযাতুত্ব ত্বালিবীন, ২/১১৬; কাশ্শাফুল ক্বিন‘খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১২৩; আত-তামহীদ,খন্ড: ২৪ পৃষ্ঠা: ১৩২; আল-মুহাল্লা,৩/৪০১)।

হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম তাক্বিউদ্দীন আবুল আব্বাস আহমাদ বিন আব্দুল হালীম বিন তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন: আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহ এই বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছে যে, তাওহীদপন্থী (মুসলিম) কাবীরা গোনাহকারীর ব্যাপারে শাফা‘আত করা হবে এবং সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না। পক্ষান্তরে খাওয়ারেজ ও মু‘তাযিলারা এটা অস্বীকার করে। (মাজমূঊল ফাতাওয়া, খন্ড: ১ পৃষ্ঠা: ১০৮).
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন, ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের নিকট কাবীরা গুনাহগাররা কাফির নয়। তারা জাহান্নামে চিরস্থায়ীভাবে থাকবে না‌। বরং তাদের বিষয়গুলো আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছাধীন বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত।(শারহুন নববী, খন্ড: ১১; পৃষ্ঠা: ১৬৭)
.
সৌদি আরবের ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) আলিমগণ বলেছেন,

عقيدة أهل السنة والجماعة : أن من مات من المسلمين مصرا على كبيرة من كبائر الذنوب كالزنى والقذف والسرقة يكون تحت مشيئة الله سبحانه إن شاء الله غفر له ، وإن شاء الله عذبه على الكبيرة التي مات مصرا عليها، ومآله إلى الجنة؛ لقوله سبحانه وتعالى: (إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ) النساء/48 ، وللأحاديث الصحيحة المتواترة الدالة على إخراج عصاة الموحدين من النار، ولحديث عبادة بن الصامت رضي الله عنه: (كنا عند النبي صلى الله عليه وسلم فقال: أتبايعوني على ألا تشركوا بالله شيئا ولا تزنوا ولا تسرقوا…. فمن وفى منكم فأجره على الله، ومن أصاب في ذلك شيئا فعوقب فهو كفارة له، ومن أصاب منها شيئا من ذلك فستره الله فهو إلى الله ، إن شاء عذبه وإن شاء غفر له) .
وبالله التوفيق. وصلى الله على نبينا محمد، وآله وصحبه وسلم”

“আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো: মুসলিমদের মধ্যে কেউ যদি ব্যভিচার, মিথ্যা অপবাদ-আরোপ, চুরি, মিথ্যা সাক্ষ্য ইত্যাদির মত কাবিরা গুনাহ-তে উপর্যুপরি লিপ্ত অবস্থায় মারা যায় তাহলে সে ব্যক্তি আল্লাহ্‌র ইচ্ছার অধীন থাকবে। তিনি চাইলে তাকে ক্ষমা করে দিবেন। অথবা তিনি চাইলে তাকে উপর্যুপরি লিপ্ত কবিরা গুনাহটির জন্য শাস্তি দিবেন। তবে তার শেষ পরিণতি হবে জান্নাত। যেহেতু আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন; নিশ্চয় আল্লাহ তার সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। এছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন।(সূরা নিসা, আয়াত: ৪৮)। এবং এই মর্মে সহীহ ও মুতাওয়াতির হাদিস রয়েছে; যে হাদিসগুলো প্রমাণ করে যে গুনাহগার ঈমানদারদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে। উবাদাহ ইবনুুস সামিত (রাঃ) হাদিসে এসেছে,তিনি বলেন,তোমরা আমার নিকট এই মর্মে বায়’আত গ্রহণ কর যে, আল্লাহর সঙ্গে কোন কিছুকে অংশীদার সাব্যস্ত করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, তোমাদের সন্তানদের হত্যা করবে না, কারো প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করবে না এবং সৎকাজে নাফরমানী করবে না। তোমাদের মধ্যে যে তা পূর্ণ করবে, তার পুরস্কার আল্লাহর নিকট রয়েছে। আর কেউ এর কোন একটিতে লিপ্ত হলো এবং দুনিয়াতে তার শাস্তি পেয়ে গেলে, তবে তা হবে তার জন্য কাফ্‌ফারা। আর কেউ এর কোন একটিতে লিপ্ত হয়ে পড়লে এবং আল্লাহ তা অপ্রকাশিত রাখলে, তবে তা আল্লাহর ইচ্ছাধীন। তিনি যদি চান, তাকে মার্জনা করবেন আর যদি চান, তাকে শাস্তি প্রদান করবেন।(সহীহ বুখারী হা/১৮; ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খন্ড: ১ পৃষ্ঠা: ৭২৮)
.
উল্লেখ্য যে, আত্মহত্যা কারীর জানাযার সালাত আদায় করা জায়েজ নয় মর্মে অনেকে দলীল হিসাবে নিম্মোক্ত হাদীছটি পেশ করে থাকে। জাবির ইবনু সামুরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, أُتِىَ النَّبِىُّ ﷺ بِرَجُلٍ قَتَلَ نَفْسَهُ بِمَشَاقِصَ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيْهِ ‘নবী (ﷺ)-এর সমীপে এক ব্যক্তিকে আনা হল যে নিজের আত্মাকে চেপ্টা তীরের ফলা দ্বারা হত্যা করেছে। ফলে তিনি তার জানাযার সালাত আদায় করলেন না’ (সহীহ মুসলিম হা/৯৭৮)। অথচ এ হাদীসের ব্যাখ্যায় প্রখ্যাত হাদীস ব্যাখ্যাতা ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,وفي هذا الحديث دليل لمن يقول : لا يصلى على قاتل نفسه لعصيانه , وهذا مذهب عمر بن عبد العزيز والأوزاعي , وقال الحسن والنخعي وقتادة ومالك وأبو حنيفة والشافعي وجماهير العلماء : يصلى عليه , وأجابوا عن هذا الحديث بأن النبي صلى الله عليه وسلم لم يصل عليه بنفسه زجرا للناس عن مثل فعله , وصلت عليه الصحابة “এ হাদীসকে তাঁরা প্রমাণ হিসাবে পেশ করেন, যাঁরা মানুষকে সতর্ক করার জন্য আত্মহত্যাকারীর জানাযা পড়া হবে না বলে মত দেন। এটি উমার ইবনু আব্দুল আযীয ও আওযাঈ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মত। তবে হাসান বাছারী, ইবরাহীম নাখঈ, ক্বাতাদাহ, ইমাম মালিক, ইমাম আবু হানীফা, ইমাম শাফিঈ ও জমহুর আলেমের মতানুযায়ী ‘তার জানাযা পড়া হবে’। উপরিউক্ত হাদীছের ব্যাখ্যায় তাঁরা বলেন, রাসূল (ﷺ) মূলত অন্যদেরকে এ ধরনের গর্হিত অপরাধ ও মন্দ কাজ থেকে সতর্ক করার জন্যই আত্মহত্যাকারীর জানাযা পড়ানো থেকে বিরত থেকেছেন। আর সাহাবীগণ তাঁর স্থলে এমন ব্যক্তির জানাযা পড়েছেন (শারহুন নাবাবী; খন্ড: ৭ পৃষ্ঠা: ৪৭)।
.
শায়খ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, ‘আত্মহত্যাকারী ব্যক্তি কাফির নয়, বরং সে ইসলামের উপরই মৃত্যুবরণ করেছে। সেও আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহপ্রাপ্ত হতে পারে। সুতরাং তার জন্য দু‘আ করা তোমাদের উপর অপরিহার্য। সে ইসলাম বহির্ভূত নয়। বরং সে আল্লাহ তা‘আলার মাশিয়্যাতের (ইচ্ছার) উপর নির্ভরশীল’ (ইসলাম ওয়েব, ফৎওয়া নং-৩৮৯৩৬৮; ফিক্বাহ বিশ্বকোষ, ৬/২৯১-২৯২ পৃ.)।

শায়েখ আব্দুল আজিজ বিন বা’য রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: যে ব্যক্তি তার নিজেকে হত্যা করবে তাহলে কি তার জানাযার সালাত আদায় করা যাবে?

তিনি উত্তরে বলেন, يصلِّي عليه بعض المسلمين كسائر العصاة ؛ لأنه لا يزال في حكم الإسلام عند أهل السنة .
“কতিপয় মুসলিমলোক তার জানাযার সালাত আদায় করবে। যেমন অবাধ্যকারী সকল ব্যক্তি। কারন সে সর্বদাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের নিকট মুসলিম হিসেবে গণ্য।(ইবনে বায: মাজমু’ল ফাতওয়া: খন্ড: ১৩, পৃষ্ঠা: ১৬২)।(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
__________________________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Share: