রাসূল (ﷺ) বলেছেন আমার এ উম্মাত আল্লাহর রহমাতপ্রাপ্ত উম্মত তাদের পরকালে শাস্তি হবে না হাদীসটির সঠিক ব্যাখ্যা

প্রশ্ন: রাসূল (ﷺ) বলেছেন; আমার এ উম্মাত আল্লাহর রহমাতপ্রাপ্ত উম্মত, তাদের পরকালে শাস্তি হবে না। তবে ইহকালে তাদের আযাব হলো ফিতনাহ, ভূমিকম্প ও হত্যাযজ্ঞ। (আবু দাউদ; ৪২৭৮)। হাদীসটির সঠিক ব্যাখ্যা কি?
▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: যে হাদীসটি সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন হাদীসটি হলো, বিখ্যাত সাহাবী আবু মূসা রাদিয়াল্লাহু আ’নহুর সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, أُمَّتِي هَذِهِ أُمَّةٌ مَرْحُومَةٌ، لَيْسَ عَلَيْهَا عَذَابٌ فِي الْآخِرَةِ، عَذَابُهَا فِي الدُّنْيَا الْفِتَنُ، وَالزَّلَازِلُ، আমার এই উম্মত দয়াপ্রাপ্ত। (তাদের উপর আল্লাহর একটি দয়া হচ্ছে, গুনাহের কারণে) পরকালে তাদের কোনো শাস্তি হবে না। আর ইহকালে তাদের শাস্তি হচ্ছেঃ নানা ধরণের ফিতনাহ বা পরীক্ষা, ভূমিকম্প ও হত্যা।”(সুনানে আবু দাউদ হা/৪২৭৮)। তাহক্বীক: উপরোক্ত হাদীসটি ইমাম আহমেদ তার মুসনাদে আহমেদ ইমাম হাকিম তার মুস্তাদরাক হাকেম এবং ইমাম আবু দাউদ তার সুনানে আবু দাউদ হা/ ৪২৭৮, আলবানী তার সিলসিলা সহীহায় হা/৯৫৯ হাদীসটি বর্ননা করেছেন। হাদীসটির সনদ সহীহ নাকি জয়ীফ এটি নিয়ে আহালুল ইমামগনের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। যেমন ইমাম হাকিম,ইমাম যাহাবী ও ইমাম নাসিরুদ্দিন আলবানী হাদীসটির সনদ সহীহ বলেছেন অপরদিকে শেখ শুয়াইব আল-আরনাউত এটিকে দুর্বল হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করেছেন। তবে বিশুদ্ধ মতে হাদীসটি সহীহ। (islamweb net ফাতাওয়া নং-২৫৫৯৮২)
.
হাদীসটির ব্যাখ্যা: হাদীসে রাসূল (أُمَّتِي هَذِهِ)বাক্য দ্বারা বর্তমানে বিদ্যমান আমার এই উম্মতেরা অথবা সাধারণভাবে আমার উম্মাত।(أُمَّةٌ مَرْحُومَةٌ) অর্থাৎ আমার উম্মত সকল নবীর উম্মতের চাইতে অতিরিক্ত রহমতপ্রাপ্ত, কেননা আমাদের নবী ছিলেন রহমাতুল্লিল আলামীন তথা সারা বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ। তারপর (لَيْسَ عَلَيْهَا عَذَابٌ فِي الْآخِرَةِ) অর্থাৎ পরকালে তাদের কঠিন শাস্তি হবে না। তাদের অপরাধগুলো দুনিয়ার মেহনত, রোগ বালাই এবং বিভিন্ন বালা-মুসীবাতের মাধ্যমে প্রতিদান হিসেবে বিবেচিত হবে। অর্থাৎ দুনিয়াতের যাদের শাস্তি হয়ে যাবে পরকালে তাদের কাফিরদের মতো শাস্তি হবে না। তাই তো মহান আল্লাহ বলেন, (…مَنۡ یَّعۡمَلۡ سُوۡٓءًا یُّجۡزَ بِهٖ…) “…যে ব্যক্তি কোন মন্দকাজ করবে তাকে তার প্রতিফল দেয়া হবে। (সূরা নিসা; ৪/১২৩)। উক্ত কথার সমর্থন হিসেবে হাদীসের পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে, (عَذَابُهَا فِي الدُّنْيَا: الْفِتَنُ وَالزَّلَازِلُ وَالْقَتْلُ) তাদের শাস্তি হলো তাদের পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ, দুনিয়াতে বিগ্রহ, বিপদাপদ ভয়-ভীতি, অন্যায়ভাবে একে অপরকে হত্যা করা। মূলত দুনিয়ার শাস্তি পরকালে শাস্তির চাইতে অনেক হালকা। অথবা হাদীসটি ঐ সমস্ত লোকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যাদের কোন কবীরাহ গুনাহ নেই। অথবা এর মাধ্যমে হয়তো একটি বিশেষ দল তথা সাহাবীদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। যেহেতু তিনি ঘোষণা করেছেন, (اِنَّ اللّٰهَ لَا یَغۡفِرُ اَنۡ یُّشۡرَکَ بِهٖ وَ یَغۡفِرُ مَا دُوۡنَ ذٰلِکَ لِمَنۡ یَّشَآءُ) “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করা ক্ষমা করবেন না, এটা ছাড়া অন্য সব যাকে ইচ্ছে মাফ করবেন।”(সূরা নিসা; ৪/৪৮)
.
আল্লামাহ ইমাম মুযহির (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ হাদীসটি মুশকিল তথা সন্দেহপূর্ণ হাদীসের অন্তর্ভুক্ত।কেননা হাদীসের বক্তব্য হচ্ছে, এই উম্মতের কাউকে শাস্তি প্রদান করা হবে না যদিও তারা কবীরাহ সহ অন্যান্য গুনাহ করে থাকে। অথচ অন্য হাদীসে কবীরাহ্ গুনাহকারীদের জন্য শাস্তির কথা বলা হয়েছে। তবে আমরা যদি হাদীসের ব্যাখ্যা এভাবে করি তাতে সমস্যা দূরীভূত হয়। তা হলো এখানে উম্মত বলতে তাদেরকেই উদ্দেশ্য করা হয়েছে যারা নবী (ﷺ) -কে যথাযথভাবে অনুসরণ করে এবং আল্লাহ তা’আলার আদেশ-নিষেধকে পুরোপুরি মেনে চলে। যেমন; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার উম্মতের সকল লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে। কিন্তু যে অস্বীকার করেছে (সে জান্নাতবাসী হতে পারবে না)। জিজ্ঞাসা করা হলো কে অস্বীকার করেছে, হে রাসূল! উত্তরে বললেন; যে আমার অনুসরণ করল সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি আমার অনুসরণ করল না, সে অস্বীকার করল। (সহীহ বুখারী হা/৭২৮০)
.
আল্লামাহ ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, হাদীসটিতে খাস করে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উম্মতের প্রশংসা করা হয়েছে। আর অন্যান্য সকল উম্মতের চাইতে এই উম্মতের প্রতি আল্লাহ তা’আলার বিশেষ অনুগ্রহ প্রকাশ পেয়েছে। দুনিয়াতে তারা যদি কোন মুসীবতে পতিত হয় এমনকি দুনিয়াতে যদি তাদের পায়ে কাটা বিধে, পরকালে এর বিনিময়ে আল্লাহ তা’আলা তাদের গুনাহ মোচন করে দিবেন, যা অন্যান্য উম্মাতের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে নেই। এর প্রমাণ হলো হাদীসের ভাষ্য (مَرْحُومَةٌ) (অনুগ্রহপ্রাপ্ত)। (আওনুল মা’বুদ ৭/৪২৭২, মিরক্বাতুল মাফাতীহ হা/ ৫৩৭৪)(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)
___________________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।