যে সকল দেশে রাত বা দিন ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময়ে প্রলম্বিত অথবা ছয় মাস দিন ও ছয় মাস রাত থাকে সেসব দেশে সিয়াম পালনের বিধান

প্রশ্ন: যে সকল দেশে রাত বা দিন ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময়ে প্রলম্বিত অথবা এমন একটি দেশ যেখানে ছয় মাস দিন আর ছয় মাস রাত থাকে; সেসব দেশে কিভাবে সিয়াম পালন করতে হবে?
▬▬▬▬▬▬▬▪️🌻▪️▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: বর্তমান পৃথিবীতে কমপক্ষে ২০০ টির অধিক দেশ রয়েছে। তারমধ্যে কিছু কিছু দেশে দিন বা রাত ২৪ ঘন্টারও বেশি সময় ধরে অব্যাহত থাকে। এমনকি কোনো কোনো দেশে ৬ মাস পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হয়। আর যেসকল দেশে সময়ের পার্থক্য দেখা যায় সেসব দেশে যে সময় হিসাব করে সালাতের সময় নির্ধারণ করতে হবে, সে বিষয়ে আহালুল আলেমগণের মধ্যে কোন মতভেদ নেই। কিন্তু কীভাবে সময় নির্ধারণ করতে হবে, সে ব্যাপারে আহালুল ইমামগণের মতামত পর্যালোচনা করলে তিনটি মত পাওয়া যায়। যেমন:
.
(১). প্রথম মত: জমহুর ওলামায়ে কেরামের মতে, ঐসব দেশের সবচেয়ে কাছাকাছি যেসব দেশে রাত-দিনের স্বাভাবিক আবর্তন ঘটে এবং শরীআত নির্ধারিত আলামত অনুযায়ী সালাত ও সাওমের সময় জানা যায়, সেসব দেশের হিসাব অনুযায়ী সময় নির্ধারণ করতে হবে। ‘রাবেত্বাতুল আলাম আল-ইসলামী’-এর প্রতিষ্ঠান ‘ইসলামী ফিকহ একাডেমী’ এই মতের পক্ষাবলম্বন করেছে। সঊদী আরবের উচ্চ উলামা পরিষদও এজাতীয় মত প্রকাশ করেছে। (নিচে ফাতওয়া অনুবাদ করা হয়েছে)
.
(২). দ্বিতীয় মত: স্বাভাবিক হিসাব অনুযায়ী সময় নির্ধারণ করতে হবে। অর্থাৎ রাতকে ১২ ঘন্টা এবং দিনকে ১২ ঘন্টা হিসাব করতে হবে। হাম্বলী মাযহাবের কোনো কোনো আলিম এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তারা বলেন, যেহেতু ঐসব দেশে স্বাভাবিক সময় অনুযায়ী রাত-দিন হয় না, সেহেতু সেগুলোতে মধ্যমপন্থী কোনো এলাকার সময় অনুযায়ী সময় নির্ধারণ করতে হবে। ঠিক ইস্তেহাযাগ্রস্ত নারীর মতো, যার হায়েযের সময়ের নির্ধারিত কোনো সময়সীমা নেই এবং সে রক্ত দেখে হায়েয ও ইস্তেহাযার মধ্যে পার্থক্য করতে অক্ষম। (তাকে যেমন মধ্যম সময় অর্থাৎ সর্বোচ্চ সময় হায়েয হিসেবে ধরে বাকী সময় সালাত আদায় করতে হয় তেমনি এ ব্যক্তিরাও তাই করবে)।
.
(৩). তৃতীয় মত: কতিপয় ফকীহের মতে, মক্কার সময় অনুযায়ী সময় নির্ধারণ করতে হবে। কেননা মক্কা হচ্ছে ‘উম্মুল ক্বুরা’ বা জনপদসমূহের মা এবং মুসলিমদের কিবলা, সেখান থেকে ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়েছে।নোট ইসলাম হাউস থেকে)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-এর উপস্থিতিতে পবিত্র মক্কায় ১২/০৪/১৩৯৮ হিজরীতে এ সম্পর্কে বিজ্ঞ আলিমদের নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক উলামা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং সকলের সম্মতিক্রমে ৬১ নং রেজুলেশন জারি করা হয়। সেখানে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে একটি ছিল প্রশ্নে উল্লেখিত বিষয়টি। অর্থাৎ প্রশ্নটি ছিল; যে সকল দেশে রাত বা দিন ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময়ে প্রলম্বিত, অথবা এমন একটি দেশ যেখানে ছয় মাস দিন আর ছয় মাস রাত থাকে সেসব দেশে কিভাবে সিয়াম পালন করতে হবে? উক্ত প্রশ্নের জবাবে সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটি ও শায়খ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি এমন একটি দেশে বসবাস করে, যেখানে গ্রীষ্মকালে সূর্যাস্ত হয় না, আবার শীতকালে সূর্যোদয় হয় না, অথবা এমন একটি দেশ যেখানে ছয় মাস দিন আর ছয় মাস রাত থাকে। তাদের উপর প্রত্যেক ২৪ ঘণ্টায় পাঁচ ওয়াক্তের সালাত আদায় করা অপরিহার্য। এক্ষেত্রে তাদের করণীয় হলো, সর্বাধিক নিকটস্ত যেসব দেশে রাত ও দিন স্বাভাবিক গতিতে আবর্তিত হয়, সেসব দেশের সময় অনুযায়ী তাদের সময় নির্ধারণ করা। যেমন; মি‘রাজের রজনীতে মহান আল্লাহ বলেন, يَا مُحَمَّدُ إِنَّهُنَّ خَمْسُ صَلَوَاتٍ كُلَّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ ‘হে মুহাম্মাদ! তাদের উপর দিনে ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত নির্ধারণ করা হলো।’ (সহীহ মুসলিম, হা/১৬২; মুসনাদে আহমাদ, হা/১২৫২৭)।
.
তাছাড়া দাজ্জাল সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসে যখন সাহাবীগণ রাসূল (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! সে পৃথিবীতে কয়দিন অবস্থান করবে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, চল্লিশ দিন পর্যন্ত। এর প্রথম দিনটি হবে এক বছরের সমান, দ্বিতীয় দিনটি এক মাসের সমান এবং তৃতীয় দিনটি এক সপ্তাহের সমান হবে। অবশিষ্ট দিনগুলো তোমাদের দিনসমূহের মতই হবে। আমরা প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! যেদিন এক বছরের সমান হবে, সেটাতে এক দিনের সালাতই কি আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে? উত্তরে তিনি বললেন, না, বরং তোমরা এদিন হিসাব করে তোমাদের দিনের (২৪ ঘণ্টা) পরিমাণ নির্দিষ্ট করে নিবে। (সহীহ মুসলিম, হা/২৯৩৭)। উপরিউক্ত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এক বছরের সমান যে দিনটি হবে, সেই দিনে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়ের অনুমতি দেননি, বরং তিনি প্রত্যেক ২৪ ঘণ্টায় পাঁচ ওয়াক্তের সালাত আদায় করতে বললেন। অনুরূপ ভাবে তাদের উপর রামাযান মাসের সিয়াম পালন করাও অপরিহার্য এবং তারা সিয়াম পালনের জন্য রামায়ান মাসের শুরু এবং শেষ নির্ধারণ করবে, সেই সাথে সাহরী এবং ইফতারের সময়ও নির্ধারণ করবে। এ ক্ষেত্রে তারা তাদের সর্বাধিক নিকটস্থ যেসব দেশে রাত ও দিন স্বাভাবিক গতিতে আবর্তিত হয়, সেসব দেশের সময় অনুযায়ী তাদের সময় নির্ধারণ করবে এবং সেই প্রতিবেশী দেশের সময় অনুয়ায়ী পুরো এক মাসের সিয়াম পালন করবে। (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ৬/১৩৬ পৃ.; মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনে বায, ১০/৩৯৪ ও ১৫/২৯২-৩০০ পৃ.; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১০৬৫২৭)।
.
সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেন, ‘যদি সেখানে রাত ও দিন হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে তা লম্বা হোক অথবা খাটো, তা কিন্তু রাত ও দিন হিসাবেই ধর্তব্য হবে। এমনকি যদি ধরে নেয়া হয়, রাত মাত্র ৪ ঘণ্টা আর দিন ২০ ঘণ্টা, তবুও রাতকে রাত এবং দিনকে দিন হিসাবেই ধরতে হবে। তবে যদি সেখানে রাত ও দিনের ব্যাপার না থাকে, সেক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী দেশের সময় অনুযায়ী সময় হিসাব করতে হবে। যেমন; সুমেরু ও কুমেরুর অঞ্চলসমূহ। (মাজমূঊ ফাতাওয়া লিইবনি উসাইমীন, ১৬/৩০৯ পৃ.; লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, লিক্বা নং-২০৪)।
.
পরিশেষে উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথার প্রমাণ পাওয়া যায়, যে সকল দেশে রাত বা দিন ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময়ে প্রলম্বিত অথবা যেসকল দেশে ৬ মাস দিন ৬ মাস রাত তাদের ক্ষেত্রে করনীয় হল, তারা তাদের পার্শ্ববর্তী সর্বাধিক নিকটস্ত যেসব দেশে রাত ও দিন স্বাভাবিক গতিতে আবর্তিত হয়, সেসব দেশের সময় অনুযায়ী তাদের সময় নির্ধারণ করে সেসকল দেশের সাথে মিলিয়ে সালাত ও সিয়াম পালন করবে। কারণ আল্লাহ তা‘আলা দিনে ও রাতে মোট ৫ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন।(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)
_________________________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Share On Social Media