কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক বার্তা প্রচার করাই হল এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

বিয়ের পূর্বে বিবাহেচ্ছু পাত্র-পাত্রী একে অপরকে দেখার গুরুত্ব, পদ্ধতি ও সীমারেখা

বিয়ের পূর্বে বিবাহেচ্ছু যুবক-যুবতী একে অপরকে দেখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, আল্লাহ যদি তাদের মাঝে বিয়ে নির্ধারণ করে রাখেন তাহলে এই দেখা-দেখিটা তাদের দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বন্ধন সৃষ্টিতে অনেক সহায়ক হয়। অনেক ছেলে-মেয়ে বাবা-মা বা আত্মীয়স্বজনের দেখার উপর ভিত্তি করেই বিয়ে করে নেয়। এটা উচিত নয়। কারণ প্রত্যেকটি মানুষের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পছন্দ-অপছন্দ রয়েছে।
সুতরাং যে দুটি হৃদয় পরস্পরের সাথে চিরজীবনের জন্য ভালোবাসার সম্পর্কের বাঁধনে আবদ্ধ হতে যাচ্ছে তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, আগ্রহ-অনাগ্রহ এবং পছন্দ-অপছন্দের বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তাই তারা নিজেরা একে অপরকে দেখে পছন্দ করবে। তবে অবশ্যই তা হবে শরিয়তের গণ্ডির মধ্যে।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বর্তমানে বহু মুসলিম যুবক যুবতী বিয়ের পূর্বে একে অপরের সাথে পরিচিত হওয়ার নামে অনৈতিক হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। নির্জনে দেখা সাক্ষাৎ, ঘোরাঘুরি, লং ড্রাইভ, ডেটিং ইত্যাদি করে থাকে। এমনকি শারীরিক সম্পর্ক জড়াতেও কুণ্ঠাবোধ করে না!
ইসলামের দৃষ্টিতে এগুলো সবই হারাম। তবে একে অপরকে দেখা-দেখি করতে বা বিয়ে সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলতে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু অবশ্যই তা হতে হবে শরিয়তের সীমারেখার মধ্যে।

নিম্নে বিবাহে আগ্রহী পুরুষ-নারী একে অপরকে দেখা সংক্রান্ত একাধিক হাদিস উল্লেখপূর্বক তারা একে অপরকে কিভাবে, কতটুকু দেখবে বা এ ক্ষেত্রে ইসলামি সীমারেখা কতটুকু সে বিষয়ে সম্মানিত আলেমদের মতামত উপস্থাপন হল:

🔹 বিয়ের পূর্বে বিবাহেচ্ছু পাত্র পাত্রী একে অপরকে দেখার গুরুত্ব সম্পর্কে কিছু হাদিস:

▪️ আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত। মুগিরাহ ইবনে শুবাহ রা. এক মহিলাকে বিয়ে করার ইচ্ছা করলে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন,
فَانْظُرْ إِلَيْهَا فَإِنَّهُ أَحْرَى أَنْ يُؤْدَمَ بَيْنَكُمَا
“তুমি তাকে দেখে নাও। কেননা তা তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টিতে সহায়ক হবে।”
অতঃপর তিনি তাই করলেন এবং তাকে বিয়ে করলেন। পরে তাঁর নিকট তাদের দাম্পত্য সম্প্রীতির কথা উল্লেখ করা হয়। [তিরমিযি ১০৮৭, নাসায়ি ৩২৩৫, দারেমি ২১৭২, সহিহাহ ১/১৫১-১৫২।]

▪️ অপর একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,

: عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ – رضي الله عنه: أَنَّ النَّبِيَّ – صلى الله عليه وسلم – قَالَ لِرَجُلٍ تَزَوَّجَ امْرَأَةً: «أَنَظَرْتَ إِلَيْهَا?» قَالَ: لَا. قَالَ: اذْهَبْ فَانْظُرْ إِلَيْهَا
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত যে, একজন মহিলাকে বিবাহ করতে যাচ্ছেন এমন একজন সাহাবীকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
তুমি কি মেয়েটিকে দেখেছ?
সাহাবি বললেন, না।
তিনি বললেন, “যাও, তাকে দেখ।” [মুসলিম ১৪২৪,]

▪️ আরেকটি হাদিসে এসেছে,

জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা. বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِذَا خَطَبَ أَحَدُكُمُ الْمَرْأَةَ فَقَدِرَ أَنْ يَرَى مِنْهَا بَعْضَ مَا يَدْعُوهُ إِلَيْ نكاحها فَلْيَفْعَلْ
“তোমাদের কেউ যখন কোন মেয়েকে বিয়ে করার ইচ্ছা করে তখন যতদূর সম্ভব তাকে দেখে নিয়ে এ মর্মে নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত যে, মেয়েটির মধ্যে এমন কিছু আছে যা তাকে বিয়ে করার প্রতি আকৃষ্ট করে।” [আহমদ ও আবু দাউদ। সনদ হাসান-সহিহুল জামে, হা/৫০৬]

❑ বর-কনে একে অপরকে দেখাদেখি বিষয়ে ইসলামি সীমারেখা ও পদ্ধতি:

এ বিষয়ে শাইখ বিন বাজ ও উসাইমিন রাহ. এর ফতোয়া উপস্থাপন করা হল:

প্রশ্ন: পূর্ণ সাজসজ্জা সহকারে এবং মাথায় হিজাব ব্যতিরেকে পাত্রীকে পাত্রের দেখার বিধান কি?
উত্তর:
এতে দোষের কিছু নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাত্রীকে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই পাত্রের জন্য সুন্নত হল, পাত্রীকে দেখা-তার মুখমণ্ডল, চুল, হস্তদ্বয়, পদযুগল দেখা। এগুলো দেখতে কোনও সমস্যা নেই। তবে নির্জনে নয়। নির্জনতা ব্যতিরেকে তার বাবা, মা ইত্যাদি লোকজনের উপস্থিতে দেখবে। অথবা ঘরের ছিদ্র, দেয়ালের আড়াল বা এ জাতীয় দূরবর্তী কোনও স্থান থেকে দেখবে। এতে কোনও অসুবিধা নেই। কিন্তু নির্জন স্থানে বা একাকী তাকে দেখা জায়েজ নয়। যদি সে তার মায়ের সাথে বা বোনের সাথে বা ফুফুর সাথে থাকা অবস্থায় তার সাথে একত্রিত হয় তাহলে তাতে দোষের কিছু নেই। বরং এটি উত্তম। সে তাকে দেখবে। কারণ এই দেখাদেখিটা বিয়ের ক্ষেত্রে আল্লাহর তাওফিক লাভ এবং তাদের মাঝে ভালবাসা সৃষ্টির অন্যতম একটি কারণ।
– সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি আল্লামা শাইখ আব্দুল্লাহ বিন বায রাহ. [binbaz]

🗨️ শাইখের আরও একটি ফতোয়া:

প্রশ্ন: কোনও যুবক যদি কোনও যুবতীকে বিয়ে করতে চায় তাহলে কি তাকে দেখা ওয়াজিব? অনুরূপভাবে উক্ত যুবতীর জন্য তার মাথার চুল খোলা কি জায়েজ আছে যেন বরের নিকট তার সৌন্দর্য আরও ভালোভাবে প্রকাশিত হয়?

উত্তর:
দেখতে অসুবিধা নেই তবে তা ওয়াজিব নয়। বরং একে অপরকে দেখা মোস্তাহাব। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন যে, বিবাহেচ্ছু পাত্র যেন পাত্রীকে দেখে নেয়। এটা তাদের মাঝে সম্প্রতি সৃষ্টিতে সহায়ক।
অতএব যদি সে তার মুখমণ্ডল, হস্তদ্বয় ও মাথার কাপড় খুলে তাহলে অধিক বিশুদ্ধ মতে কোনও সমস্যা নেই। কোনও কোনও আহলুল ইলম (আলেম) বলেন যে, শুধু চেহারা ও দু হাতের কব্জি দেখাই যথেষ্ট। তবে সঠিক হল, মাথা, মুখমণ্ডল, দু হাতের তালু, দু পায়ের পাতা দেখতে কোনও অসুবিধা নেই- উল্লেখিত হাদিসের আলোকে।
তবে তার সাথে নির্জনতা অবলম্বন করা জায়েজ নয়। বরং অবশ্যই তার বাবা, ভাই ইত্যাদি সাথে থাকতে হবে। কারণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا وَمَعَهَا ذُو مَحْرَمٍ
“কোনও পুরুষ কোনও নারীর সঙ্গে নির্জনতা অবলম্বন করবে না মাহরাম পুরুষ সাথে থাকা ব্যতিরেকে” [বুখারি ও মুসলিম]

তিনি আরও বলেছেন,
«ألا لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ»
“সাবধান! কোন পুরুষ কোনও মহিলার সাথে একান্তে নির্জনে গেলেই তাদের সাথে তৃতীয় জন হবে শয়তান।” [আহমদ ও তিরমিযি। সহিহুল জামে ২৫৪৬-আলবানি]

🗨️ শাইখ উসাইমিন রহ. বলেন,
والذي يجوز للخاطب أن ينظر إليه من مخطوبته مثل الوجه والقدمين والرأس والرقبة بشرط ألاّ يخلو بها،
“পাত্রের জন্য পাত্রীকে যা দেখা জায়েজ তা হল, যেমন: চেহারা, দু পায়ের পাতা, মাথা ও ঘাড়। শর্ত হল, তার সাথে নির্জনতা অবলম্বন করবে না।”
الله اعلم
অনুবাদ ও গ্রন্থনা:
♦️আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল♦️

Translate In English