কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক বার্তা প্রচার করাই এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

বিবাহের জন্য পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের মানদণ্ড

বিবাহের জন্য পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের মানদণ্ড। অর্থাৎ বিবাহের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের কোন কোন গুণাবলী থাকা আবশ্যক।
▬▬▬▬▬▬▬💠💠💠▬▬▬▬▬▬▬
ইসলামি শরীয়তে পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্দেশনা হল: বিবাহের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম পাত্র ও পাত্রী উভয়ের ধার্মিকতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আল্লাহ বলেন, তোমরা মুশরিক মেয়েদের বিয়ে করো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। নিশ্চয়ই একজন ঈমানদার মেয়ে মুশরিক মেয়ের চেয়ে উত্তম। যদিও সে তোমাদেরকে মোহিত করে। তোমরা মুশরিক পুরুষদের বিয়ে করো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। নিশ্চয়ই একজন ঈমানদার পুরুষ মুশরিক পুরুষের চেয়ে উত্তম। তারা জাহান্নামের দিকে আহবান করে। আর আল্লাহ জান্নাত ও ক্ষমার দিকে আহবান করেন…(সূরা বাক্বারাহ ২২১)।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ)বলেন, নারীকে বিবাহ করা হয় চারটি কারণে:
(১) তার সম্পদের কারণে
(২) তার বংশ মর্যাদার কারণে
(৩) তার সৌন্দর্যের কারণে এবং
(৪) তার দ্বীনদারীর কারণে। এর মধ্যে তোমরা দ্বীনদার নারীকে অগ্রাধিকার দাও। নইলে ধ্বংস হও’(সহীহ বুখারী,মুসলিম, মিশকাত হা/৩০৮২)

অতঃপর অপর বর্ননায় রাসূল (ﷺ) পাত্র সম্পর্কে বলেন, যখন তোমাদের কাছে এমন কোন ছেলে বিবাহের পয়গাম দেয়, যার দ্বীনদারী এবং সচ্চরিত্রতার ব্যাপারে তোমরা সন্তুষ্ট, তখন ঐ ছেলের সাথে তোমাদের মেয়েকে বিয়ে দাও। যদি না দাও, তাহ’লে পৃথিবীতে ফিৎনা ও বড় ধরনের ফাসাদ সৃষ্টি হবে’(তিরমিযী, মিশকাত হা/৩০৯০

উপরোক্ত দু’টি হাদীসে ছেলে ও মেয়ে উভয়ের বিবাহের মূলনীতি বর্ণিত হয়েছে। এক্ষণে দ্বীনদারীকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাকীগুলি যথাসম্ভব সামঞ্জস্য রেখে পারস্পরিক বিবাহ সম্পাদন করাই শরী‘আত সম্মত। তবে সর্বদিক দিয়ে নিজের মান যেমন, ঠিক সেই সমপর্যায় মান ও পরিবেশের পাত্র-পাত্রী পছন্দ করা উচিৎ। এতে করে কেউ কারোর উপর গর্ব প্রকাশ না করতে পেরে কথার আঘাতে প্রেমের গতি বাধাপ্রাপ্ত হবে না। পজিশন, শিক্ষা, সভ্যতা, অর্থনৈতিক অবস্থা, বংশ প্রভৃতি উভয়ের সমান হলে সেটাই উত্তম। যেমন: উভয়ের বয়সের মধ্যে বেশী তারতম্য থাকা উচিৎ নয়। নচেৎ ভবিষ্যতে বিভিন্ন জোয়ার-ভাটা দেখা দিতে পারে। এজন্য রাসূল ﷺ বলেন, তোমরা বিবাহের জন্য উপযুক্ত পাত্রী নির্বাচন কর এবং সমতা দেখে বিবাহ কর (ইবনু মাজাহ হা/১৯৬৮; সিলসিলা সহীহাহ হা/১০৬৭)।
.
▪️পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে সঠিক মানদণ্ড হল দুটি। যথা: চরিত্র ও দ্বীনদারি। অর্থাৎ কোন পুরুষের মধ্যে বিয়ের পূর্বে সর্ব প্রথম তার চরিত্র অত:পর দ্বীনদারি দেখা উচিৎ। সুতরাং যদি কোনও ছেলের মধ্যে উক্ত দুটি বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায় তাহলে শরিয়ত সম্মত পন্থায় বিয়ের জন্য অগ্রসর হোন। তারপর যদি তার দ্বীনদারি ঠিক থাকে তাহলে বিয়ে করুন; অন্যথায় বর্জন করুন।পাত্র নির্বাচন সম্পর্কে বিগত শতাব্দীতে সৌদি ‘আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন,পাত্র নির্বাচন করার ক্ষেত্রে একজন নারীর যে গুণগুলো দেখা উচিত সেগুলো হচ্ছে– চরিত্র ও দ্বীনদারি। আর সম্পদ ও বংশ দ্বৈয়তিক বিষয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে– পাত্র দ্বীনদার ও চরিত্রবান হওয়া। কারণ দ্বীনদার ও চরিত্রবান লোকের কাছে নারী কোন কিছু হারাবে না। যদি সে ব্যক্তি তার সাথে সংসার করে তাহলে সদ্ভাবে সংসার করবে। আর ছেড়ে দিলেও ইহসানের সাথে ছেড়ে দিবে। তাছাড়া দ্বীনদার ও চরিত্রবান ব্যক্তি তার জন্য ও তার সন্তানসন্ততিদের জন্য বরকতময় হবেন। সন্তানেরা তার থেকে আখলাক ও দ্বীনদারি শিখবে।আর যদি সে রকম কেউ না হয় তাহলে নারীর উচিত এমন ব্যক্তি থেকে দূরে থাকা। বিশেষত: কিছু কিছু লোক যারা নামাযের ব্যাপারে গাফেল কিংবা মদ্যপ হিসেবে পরিচিত (আমরা আল্লাহ্‌র আশ্রয় চাই)। আর যারা মোটেই নামায পড়ে না তারা কাফের। মুমিন নারীরা তাদের জন্য বৈধ নয় এবং তারাও মুমিন নারীদের জন্য বৈধ নয়। সারকথা হল, একজন নারী চরিত্র ও দ্বীনদারিকে প্রাধান্য দিবে। বংশ মর্যাদা যদি পাওয়া যায় ভাল। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যদি এমন কোন পাত্র আসে তোমরা যার দ্বীনদারি ও চরিত্রের ব্যাপারে সন্তুষ্ট তাহলে তার কাছে বিয়ে দাও”। কিন্তু যদি কুফু বা সমস্তরের পাওয়া যায় তাহলে সেটা উত্তম। (সূত্র: শাইখ উছাইমীনের “ফাতাওয়াল মারআ থেকে সংকলিত)
.
▪️পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সঠিক মানদণ্ড হল দুটি। যথা: সৌন্দর্য এবং দীনদারি। অর্থাৎ কোন নারীকে বিয়ের পূর্বে সর্ব প্রথম তার সৌন্দর্য অত:পর দীনদারি দেখা উচিৎ। সুতরাং যদি কোনও মেয়ের প্রতি মনে প্রবল আকর্ষণ অনুভব করেন তাহলে শরিয়ত সম্মত পন্থায় বিয়ের জন্য অগ্রসর হোন। তারপর যদি তার দ্বীনদারি ঠিক থাকে তাহলে বিয়ে করুন; অন্যথায় বর্জন করুন। অর্থাৎ তাকে গ্রহণ ও বর্জন যেন হয় দ্বীনদারিকে কেন্দ্র করে-যেমনটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মহান ইমাম,শাইখুল ইসলাম আবু আব্দুল্লাহ আহমাদ বিন মুহাম্মাদ বিন হাম্বাল আশ-শাইবানী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ২৪১ হি.] বলেছেন,
কোন পুরুষ যদি কোনও নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় তাহলে সর্বপ্রথম তার সৌন্দর্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে। যদি এ ব্যাপারে তার প্রশংসা করা হয় তাহলে তার দ্বীন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে। দ্বীনের ক্ষেত্রে যদি প্রশংসিত হয় তাহলে বিয়ে করবে; অন্যথায় দীনের কারণে প্রত্যাখ্যান করবে। কিন্তু এমনটি করা ঠিক নয় যে, প্রথমেই দীন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে। এ ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় হলে তারপরে তার সৌন্দর্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে। তারপর সৌন্দর্যের ব্যাপারে প্রশংসনীয় না হলে ফিরিয়ে দিবে। তাহলে এ প্রত্যাখ্যান হবে সৌন্দর্যের কারণে; দীনের কারণে নয়।” (শরহু মুনতাহাল ইরাদাত-ইমাম ভূতি ২/৬২১ ইসলামি সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৮৩৭৭৭)
.
পরিশেষে, পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে উভয়ের মধ্যে কুফু বজায় রাখতে হবে। কুফু”(كُفُو) একটি আরবী শব্দ; যার অর্থ সমান, সমতুল্য, সমতা, সমকক্ষ। ইসলামী পরিভাষায় বর-কনের দ্বীন-দুনিয়ার যাবতীয় কিছুতে সমান সমান বা কাছাকাছি হওয়াকে “কুফু” বলে। কুফুর বিষয়টি দ্বীনদারির ক্ষেত্রে খুবই জরুরি। কারণ একজন পাপাচারী ব্যক্তির সাথে একজন দ্বীনদার ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য অনিবার্য। আর, দ্বীনদারি ঠিক থাকলে বংশমর্যাদা বা অন্য বিষয়গুলো মানিয়ে নেওয়া যায়। তবুও বংশমর্যাদার বিষয়টি ফেলনা নয়। বিশেষত, বর্তমান সময়ে তো প্রকৃত দ্বীনদার পাওয়াই কঠিন। সেজন্য দুটো পরিবারের মাঝে উত্তম বন্ধন কায়েম রাখার স্বার্থে বংশমর্যাদা এবং অন্যান্য দিকে কিছুটা হলেও নজর দেওয়া ভালো। তবে, অবশ্যই অবশ্যই দ্বীনদারিকে সবার আগে রাখতে হবে। তবে, জেনে রাখবেন,কুফু জিনিসটা বিয়ে হওয়া বা না হওয়ার মতো কিছু নয়। এটি উচিত-অনুচিত ও উত্তম-অনুত্তমের ব্যাপার মাত্র। কুফু না মেনে বিয়ে করলেও বিয়ে হয়ে যাবে। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)
_______________________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।