কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক বার্তা প্রচার করাই এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

বর-কনের জন্য গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান করার বিধান

প্রশ্ন: বিবাহ উপলক্ষ্যে বিবাহের আগের দিন বা ২-৩ দিন পূর্বে বর-কনের জন্য গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান করা যাবে কি? এছাড়া এসব অনুষ্ঠানে মেয়েরা পর্দার মধ্যে হলুদ শাড়ী পরতে পারবে কি?
▬▬▬▬▬▬▬💠💠💠▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি অনুযায়ী হলুদের বিধান হলো, হলুদ খাওয়া এবং প্রয়োজনে ব্যবহার করা জায়েজ। তাই স্বাভাবিক ভাবে নারী-পুরুষের শরীরের রঙ সুন্দর করে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা, ত্বকের বলিরেখা, মুখের তেলতেলে ভাব নিয়ন্ত্রণ এবং ব্রণের হাত থেকে ত্বককে পরিচর্যা করতে বর-কনে অথবা যে কোন ব্যক্তি বিয়ের আগে কিংবা পরে যেকোন সময়ে কোন আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া নিজেই নিজেদের শরীরে অথবা মাহরাম ব্যক্তি কর্তৃক শরীরে কাঁচা হলুদ ব্যবহার করতে পারে। এবং বিবাহ অনুষ্ঠানে নারীরা পর্দার মধ্যে যেকোন রং-এর শালীন পোষাক পরিধান করতে পারে। এতে শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে কোন আপত্তি নেই ইনশাআল্লাহ। কিন্তু বিবাহের সময় গায়ে হলুদের নামে আমাদের সমাজে বিবাহের দু’একদিন পূর্বে বর ও কনের সর্বাঙ্গে মাহরাম নন-মাহরাম ভেদাভেদ চিন্তা ভাবনা না করে বর-কনের ভাবী, চাচাতো বোন, খালাতো বোন, ফুফাতো বোন, অথবা মামাতো বোনেরা মিলে মেয়েরা ছেলেদের গায়ে হলুদ লাগানো, সাথে গান-বাজনা বাজানো, এবং হলুদ মেখে শরীর পবিত্র করার হিন্দুয়ানী বিশ্বাসে রীতি বা অনুষ্ঠান করা হয়, তা ইসলামী শরীয়তের সম্পূর্ণ বিপরীত। যা বিজাতীয় কুসংস্কার হিন্দুদের সংস্কৃতি থেকে এসেছে। মূলতঃ গায়ে হলুদ হিন্দুদের বৈবাহিক রীতি। বৈদিক যুগ থেকে ভারতীয় হিন্দুসমাজে গাত্রহরিদ্রা বা অধিবাস বিবাহ অনুষ্ঠানের অবশ্য পালনীয় শাস্ত্রাচার ও লোকাচার হিসাবে পালিত হয়ে এসেছে। পুরাণ মতে বিয়ের আগে গায়ে হলুদ সর্বপ্রথম মাখানো হয়েছিল পার্বতীকে শিবরাত্রির আগে, সেই থেকেই এই অনুষ্ঠানের জন্ম। হিন্দু সমাজে বর-কনের দাম্পত্য জীবনকে যেকোন ধরনের অকল্যাণ বা অপশক্তির অনিষ্ট থেকে মুক্ত রাখার কামনা থেকে যেসব লোকাচার পালন করা হয়, গায়ে হলুদ এসবেরই একটি। ভারতবর্ষে মুসলমানরা আসার পর তারাও এসব রীতিপদ্ধতি অনুসরণ করতে থাকে। (বাংলা পিডিয়া; দৈনিক আনন্দবাজার, কলিকাতা)। ইসলামী শরীয়তে বিজাতীয়দের সাদৃশ্য অবলম্বন করা সম্পূর্ণভাবে হারাম।
.
আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে ব্যক্তি সেই সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে।’(আবু দাঊদ, হা/৪০৩১ মিশকাত হা/৪৩৪৭, ‘পোষাক’ অধ্যায়)। উক্ত হাদীসের আলোকে শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ্ (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘‘আস্ সিরাত আল মুসতাকিম’’ গ্রন্থে বলেন, ইমাম আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ)-সহ অনেকেই এ হাদীস দ্বারা দলীল দেন যে, কাফির-মুশরিকদের সাদৃশ্য অবলম্বন করা হারাম। যেমনটা আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّه مِنْهُمْ ‘‘আর তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে নিশ্চয় তাদেরই একজন।’’ (সূরাহ্ আল-মায়িদাহ্; ৫:৫১)
.
উল্লেখ যে, আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুর রহমান ইবনু আওফ (রাঃ)-এর শরীরে হলুদের চিহ্ন দেখে জিজ্ঞেস করলেন, কিসের রং এটা? তিনি বললেন, আমি জনৈকা (আনসারী) নারীকে খেজুর দানার সমপরিমাণ স্বর্ণের বিনিময়ে বিয়ে করেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আল্লাহ তা‘আলা তোমার বিয়েকে বরকতময় করুন। একটি বকরী দিয়ে হলেও তুমি ওয়ালীমাহ্ কর। (সহীহ বুখারী হা/৫১৪৮, সহীহ মুসলিম হা/১৪২৭, নাসায়ী ৩৩৭২, তিরমিযী ১০৯৪, ইবনু মাজাহ ১৯০৭, আহমাদ ১৩৩৭০, দারিমী ২২৫০)

উপরোক্ত হাদীসের আলোকে অনেকে বিবাহে বর-কনের গায়ে হলুদ দেওয়ার দলিল হিসেবে উল্লেখ করেন। অথচ উপরোক্ত হাদীস দ্বারা বর-কনের জন্য হলুদ মাখার বৈধতার দলীল প্রমানিত হয়না। উক্ত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুর রহমান ইবনু আওফ-এর শরীরে অথবা কাপড়ে (জা‘ফরানের) হলোদে চিহ্ন লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করলেন, একি? অর্থাৎ এ হলুদ রং কোত্থেকে এলো? উত্তরে আবদুর রহমান ইবনু আওফ বললেন,আমি একজন মহিলাকে বিয়ে করেছি। আল্লামা ত্বীবী বলেনঃ প্রশ্ন ছিল গায়ে বা কাপড়ে রং লাগার কারণ কি? উত্তরে যা বলার তাই বললেন। মূলতঃ এটা ছিল استفهام انكارى অর্থাৎ অস্বীকৃতি জ্ঞাপক প্রশ্ন, তিনি যেন এটা অস্বীকার ও অপছন্দ করছিলেন। তিনি সুগন্ধ মিশ্রিত তৈল মাখতে নিষেধ করতেন। এর উত্তরে আবদুর রহমান ইবনু আওফ যেন বললেন, এটা তার মাখানো কোনো সুগন্ধযুক্ত তেলের রং নয় বরং তার নব বিবাহিতা স্ত্রীর সাথে বাসর উদযাপনের ফলে তার সংস্পর্শে লাগা রং বিশেষ, এটা ইচ্ছাজনিত নয় এবং অসাবধানতাজনিত বিষয়। (ফাতহুল বারী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২০৪৯; শারহে মুসলিম ৯/১০ম খন্ড, হাঃ ১৪২৭)
.
এছাড়াও বিবাহ উপলক্ষে মুসলিম সমাজে আরো বেশকিছু অনৈসলামী রীতি রয়েছে। যেমন; (১). বিবাহের জন্য শুভ অশুভ মনে করে নিদিষ্ট তারিখ নির্ধারণ (২). যৌতুক দাবি (৩). আংটি পরানো (৪). বিউটি পারলারে গিয়ে অনৈসলামী সাজগোজ করা (৫). থুবড়া প্রথা অর্থাৎ বাংলাদেশের কোন কোন অঞ্চলে বর ও কনেকে বিবাহের দু’তিন দিন পূর্বে নিজ নিজ বাড়ীতে নির্দিষ্ট আসনে বসিয়ে রাতের প্রথমাংশে মাহরাম, গায়রে মাহরাম পুরুষ-নারী, যুবক-যুবতী সকলে মিষ্টি, ফল-মূল ও পিঠা-পায়েস ইত্যাদি মুখে তুলে খাওয়ায়। সেই সাথে নব যুবতীরা গীত গেয়ে পয়সা আদায় করে যা সমাজে থুবড়া প্রথা নামে প্রচলিত, অথচ এসব রীতি ইসলাম সমর্থন করে না। বরং এর মাধ্যমে যুবক-যুবতীরা অবাধ মেলামেশার সুযোগ পায় এবং পর্দাহীনতা ও যেনার দিকে ধাবিত হয়। আবার কোন কোন অঞ্চলে বিবাহের অনুষ্ঠানে বাঁশের কুলায় চন্দন, মেহেদি, হলুদ, কিছু ধান-দূর্বা ঘাস, কিছু কলা, সিঁদুর ও মাটির চাটি নিয়ে মাটির চাটিতে তৈল দিয়ে আগুন জ্বালানো হয়। তারপর বর-কনের কপালে তিনবার হলুদ মাখায়। এমনকি মূর্তিপূজার ন্যায় কুলাতে রাখা আগুন জ্বালানো, বর-কনের মুখে আগুনের ধোঁয়া ও কুলা হেলিয়ে-দুলিয়ে বাতাস দেওয়া হয়। কোন কোন এলাকায় বর-কনেকে গোসল করতে নিয়ে যাওয়ার সময় মাথার উপরে বড় চাদরের চার কোণা চারজন ধরে নিয়ে যায়। বিবাহ করতে যাওয়ার সময় বরকে পিঁড়িতে বসিয়ে বা সিল-পাটায় দাঁড় করিয়ে দুধ-ভাত খাওয়ানো হয়। সম্মানের নামে বর-কনে মুরববীদের কদমবুসি করে। এছাড়া বিবাহের পর বর দাঁড়িয়ে সবাইকে সালাম করে। এসব প্রথা ইসলামে নেই। এতদ্ব্যতীত আজকাল মহিলারা তাদের চোখের ভুরু উঠায়, মাথায় কৃত্রিম চুল লাগায়, দাঁতের মাঝে কেটে ফাঁকা করে, হাত-পায়ের নখ বড় রাখে, যা শরী‘আত সমর্থিত নয়।
.
পরিশেষে বলা যায়, বিবাহ একটি সামাজিক অনুষ্ঠান। যা ইসলামী শরী‘আত কর্তৃক নির্দেশিত। এতে পার্থিব ও পরকালীন কল্যাণ রয়েছে। কিন্তু তা পূর্ণ ইখলাছ সহকারে শরী‘আতসিদ্ধ পন্থায় সম্পন্ন হতে হবে। অন্যথা তা ইহকালে যেমন কল্যাণ বয়ে আনবে না; পরকালেও কোন সওয়াব বা বিনিময় পাওয়া যাবে না। তাই এ বিষয়ে সকলকে সজাগ ও সচেতন হতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদেরকে বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুসরণ-অনুকরণ এবং যাবতীয় কুসংস্কার থেকে হেফাজত করুন। আমীন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)
_______________________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।