বর্তমানে বিশ্বে একই দিনে সিয়াম ও ঈদ পালন প্রসঙ্গ

বর্তমানে বিশ্বে একই দিনে সিয়াম ও ঈদ পালন করার জন্য কিছু লোকের মাঝে আগ্রহ, ব্যাকুলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে এটা সঠিক হবে কি? না হলে এর সমাধান কি?
▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: দুঃখজনক হলেও সত্য বহুদিন ধরে সারা পৃথিবীতে একই দিনে সিয়াম ও ঈদ পালন নিয়ে মতবিরোধ চলে আসছে। ঘোড়ার ডিম যেমন মানুষের মুখে মুখে শোনা যায় কিন্তু বাস্তবে এর কোন অস্তিত্ব নেই ঠিক তেমনি সারা পৃথিবীতে একই দিনে সিয়াম ও ঈদ পালন শুধু মুখে মুখেই শোনা যায়। ইতিহাস সাক্ষী, পৃথিবীর ইতিহাসে আজ পর্যন্ত সারা বিশ্বে একই দিন সিয়াম বা ঈদ পালিত হয় নি। আর এটা সম্ভবও নয়। কারণ আহালুল আলেমগণের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী কুরআন-সুন্নাহর মাধ্যমেও তা প্রমাণিত নয়। এমনকি ১৪০১ হিজরী সালে মক্কা মুকাররমায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনে OIC এর আল-ফিকহ একাডেমি এবং সৌদি সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদ সারা বিশ্বে একসাথে সিয়াম ও ঈদ পালনকে শরিয়ত, আকল, যুক্তি সব দিক দিয়ে অসম্ভব বলে মত প্রকাশ করেছে। কারণ একই দিনে ঈদ ও সিয়াম পালন এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি ছিল কেবলই যুক্তিনির্ভর; দলিল নির্ভর নয়। আর শরী‘আত কিংবা বাস্তবতার নিরিখে এর কোন ভিত্তি নেই। তবুও সাধারণ মানুষের মধ্যে যেহেতু এ নিয়ে গুঞ্জন সৃষ্টি হয়েছে, তাই শারঈ দৃষ্টিকোণ এবং বাস্তবতার নিরিখে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
.
আহালুল আলেমগণ ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, চাঁদের উদয়স্থল ভিন্ন ভিন্ন এবং উদয়কালও ভিন্ন ভিন্ন। আর এই ভিন্ন উদয়কালের ফলেই কোথাও চাঁদ দেখা যায়, কোথাও যায় না। এ ব্যাপারে কোন আলেম দ্বিমত করেন নি। এখন চাঁদের সে ভিন্ন ভিন্ন উদয়স্থল কি বিবেচনাযোগ্য; নাকি বিবেচনাযোগ্য নয়- এই মাসয়ালাতে আলেমগণ দুটি মত ব্যক্ত করেছেন:- আহালুল ইমামগনের একটি অংশ চাঁদের ভিন্ন ভিন্ন উদয়স্থল বিবেচনা করেছেন – অপর আরেকদল ভিন্ন ভিন্ন উদয়স্থল বিবেচনা করেননি। তাদের উভয়পক্ষ কুরআন ও সুন্নাহ থেকে দলিল দিয়েছেন। এমনকি একই দলিল উভয় পক্ষ তার মতের পক্ষে ব্যবহার করেছেন। কারণ সে দলিলটি উভয় মতের পক্ষে দলিল হিসেবে পেশ করা যায়। যেমন: মহান আল্লাহ বলেন, লোকেরা আপনাকে নতুন মাসের
চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি তাদেরকে বলে দিন এটা মানুষের (বিভিন্ন কাজ-কর্মের) এবং হজ্জের সময় নির্ধারণ করার জন্য। (সূরা বাক্বারা, ২/১৮৯)। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, তোমরা তা (নতুন চাঁদ) দেখে রোজা শুরু কর এবং সেটা (নতুন চাঁদ) দেখে রোজা ছেড়ে দাও। (সহিহ বুখারী হা/১৯০৯ ও সহীহ মুসলিম হা/১০৮১)। উভয় পক্ষের এ মতভেদের কারণ হলো প্রত্যেক পক্ষ দলিলটিকে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে বুঝেছেন এবং মাসয়ালা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা পথ অনুসরণ করেছেন। আমরা দালিলিকভাবে বিষয়টি পরিষ্কার করার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।
.
প্রিয় পাঠক! ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে যদি আমরা লক্ষ্য করি তাহলে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, কুরআন ও হাদীসে মাস গণনার জন্য চাঁদ দেখার নির্দেশনা এসেছে তা স্থানীয় তথা একটি নির্দিষ্ট জনসমষ্টির জন্য প্রযোজ্য, যাদের উপর চন্দ্র উদিত হয়েছে। যেমন: মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস (রামাযান) পাবে, সে যেন সিয়াম রাখে।’(সূরা বাকারাহ; ২/১৮৫)। তেমনিভাবে একই সূরার দু’টি আয়াত পরেই আল্লাহ আরো বলেছেন,‘তোমরা পানাহার কর যতক্ষণ রাত্রির কৃষ্ণরেখা হতে উষার শুভ্র রেখা প্রতিভাত না হয়। অতঃপর তোমরা রাত্রি পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ কর।’ (সূরা বাকারাহ; ২/১৮৭)। উপরোক্ত আয়াতদ্বয়ের প্রথম আয়াতটি চন্দ্রের সাথে সম্পৃক্ত,আর পরেরটি সূর্যের সাথে। এক্ষণে প্রথমটি অনুসরণ করা হবে আন্তর্জাতিক সময় অনুযায়ী, আর পরেরটি অনুসরণ করা হবে স্থানীয় সময় মোতাবেক, এটা স্পষ্টতই দ্বিমুখিতা নয় কী?? উপরোক্ত সূরা বাকারার, ১৮৫ নং আয়াতে ‘এ মাস পাবে’ অর্থ এ মাসের চাঁদ দেখতে পাবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘তোমরা চাঁদ দেখে সিয়াম রাখ ও চাঁদ দেখে সিয়াম ভঙ্গ কর। যদি চাঁদ তোমাদের নিকটে আচ্ছন্ন থাকে, তাহলে শাবান ত্রিশ দিন পূর্ণ করে নাও।’(সহীহ বুখারী হা/১৯০৯, মুসলিম হা/১০৮১, মিশকাত হা/১৯৭০, ‘সাওম’ অধ্যায়, ‘চাঁদ দেখা’ অনুচ্ছেদ)। এই হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, সারা দুনিয়ার মানুষ এক সাথে চাঁদ দেখতে পারে না। কারণ, কোন দেশে যখন ফজরের সময় হয় অন্য দেশে তখন গভীর রাত থাকে, (যেমন: মক্কার লোকেরা যখন সন্ধ্যায় চাঁদ দেখে বাংলাদেশে তখন ৩ ঘণ্টা বেশি হয়ে রাত হয়ে যায়)। তখন কিভাবে বাংলাদেশের মানুষকে বলা হবে যে, তোমরা চাঁদ না দেখলেও সিয়াম রাখ? অথচ হাদীসে রাসূল (ﷺ) আমাদেরকে চাঁদ দেখে সিয়াম রাখতে বলেছেন। এখন যদি বলেন, সঊদী আরবের সাথে বাংলাদেশের মাত্র ৩ ঘণ্টা সময়ের পার্থক্য থাকার কারণে পূর্ণ এক দিন পার্থক্য হবে কেন? উত্তরে বলব, ৩ ঘণ্টা কেন, ৩ সেকেন্ডের আগ-পিছের কারণেও তো একটি দিনের ব্যবধান হতে পারে। যেমন: একই সময়ে দু’টি শিশু জন্মগ্রহণ করল, একটি বাংলাদেশে এবং অপরটি সঊদী আরবে। বাংলাদেশে সময় তখন সন্ধ্যা ৭টা এবং আর সঊদী আরবে সময় তখন বিকাল ৪টা। এখন প্রশ্ন হলো, একই সময়ে জন্মগ্রহণ করা শিশু দু’টির আক্বীকা কি একই দিনে হবে, না দুই দিনে হবে? এর উত্তর হলো, অবশ্যই দুই দিনে। কারণ, সঊদী আরবে বিকেল ৪টায় জন্ম গ্রহণ করা শিশুর ৭ম দিন আর বাংলাদেশে সন্ধ্যা ৭টায় জন্ম গ্রহণ করা শিশুর ৭ম দিন একই দিনে হবে না। বরং সঊদী শিশুর ৭ম দিন হবে বাংলাদেশী শিশুর ৬ষ্ঠ দিন। এক্ষণে একই সময়ে জন্মগ্রহণ করা দুই শিশুর আক্বীকা যদি দু’দিনে হতে পারে, তাহলে ৩ ঘণ্টা সময়ের পার্থক্যের কারণে ১ দিন কি পার্থক্য হতে পারে না? এই সমাধান বের করার জন্য কেবল সুস্থ বিবেকই যথেষ্ট। সুতরাং হাদীস প্রমাণ করে বাংলাদেশে সিয়াম শুরু হবে পরদিন চাঁদ দেখার পরে। ঈদও হবে একদিন পরে। কেননা যোহরের সালাত যেমন ফজরের সময় আদায় করা যায় না, তেমনি মক্কার সঙ্গে ঢাকা মিলাতে গিয়ে একদিন পরের সিয়াম ও ঈদ একদিন আগে করা যায় না। এটি রাসূল (ﷺ)-এর আদেশের স্পষ্ট লংঘন। পাশাপাশি উপরোক্ত দলীলসমূহ দ্বারা এটাও প্রতীয়মান হয় যে, সিয়াম ও ঈদের জন্য চাঁদ দেখা শর্ত। যদি হাদীসে বর্ণিত এই নির্দেশটি স্থানীয় না হয়ে সমগ্র বিশ্বের জন্য প্রযোজ্য হতো, তাহলে চাঁদের সর্ব পশ্চিমের উদয়স্থল তথা বর্তমান আমেরিকা মহাদেশকে অথবা পৃথিবীর মধ্যস্থল হিসাবে সঊদী আরবকে শরীআতে মানদন্ড হিসাবে গ্রহণ করা হতো এবং সেখানে চাঁদ দেখা মাত্রই সমগ্র বিশ্বে একই সাথে সিয়াম ও ঈদ পালনের জন্য নির্দেশ দেয়া হতো। কিন্তু কুরআন ও হাদীসের কোথাও এর প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে কুরআনের ভাষাটি এসেছে এভাবে যে, ‘যারা এ মাস পাবে’ অর্থাৎ সকলেই নয়, বরং তারাই যারা চাঁদ দেখতে পাবে। (হাদীসের ব্যাখ্যা থেকে যা আরো সুস্পষ্ট হয়েছে)
.
অতএব রামাযানে সিয়াম রাখা ও রামাযান শেষে ঈদ পালন করার সাথে ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টির চাঁদ দেখা শর্ত। এটাই আরবী মাস বা চন্দ্রমাস নির্ণয়ের চিরাচরিত ও স্বতঃসিদ্ধ পদ্ধতি। আধুনিক যুগে স্যাটেলাইট আবিষ্কারের পূর্বে এ নিয়ে কখনও সেভাবে প্রশ্ন উঠেনি। মূলতঃ চন্দ্র ও সূর্য একই নিয়মে পৃথিবীর চতুর্পার্শ্বে ঘূর্ণায়মান। চন্দ্র হলো মাসের সময় নির্ধারক, আর সূর্য হল দিনের সময় নির্ধারক। কোন স্থানে সূর্য উদয়ের সাথে সাথে যেমন দিনের শুরু হয়, তেমনি অমাবস্যার পর চন্দ্র উদয়ের সাথে সাথে মাসের শুরু হয়। এটাই স্বতঃসিদ্ধ প্রাকৃতিক রীতি। এভাবেই চন্দ্র ও সূর্য প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এক্ষণে সিয়াম ও ঈদ পালনে এই প্রাকৃতিক চক্রকে (Natural cycle) অস্বীকার করা যেমন অবৈজ্ঞানিক, তেমনই অজ্ঞতার পরিচায়ক। এক্ষণে এই চাঁদ দেখার বিষয়টি অঞ্চল বিশেষের সঙ্গে সম্পৃক্ত না আধুনিক মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্বের যেকোন প্রান্তে দু’জন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি চাঁদ দেখার সংবাদ পেলেই পৃথিবীর সকল দেশের সকল মুমিনের জন্য তা প্রযোজ্য হবে? এ ব্যাপারে মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত যুক্তি-তর্ক বাদ দিয়ে সাহাবায়ে কেরামের আমলকে অগ্রাধিকার দেয়াই যথার্থ হবে। কুরাইব (রাঃ) বর্ণিত আছারে এসেছে যে, তিনি সিরিয়ায় রামাযানের সিয়াম রেখে মাস শেষে মদীনায় ফিরে এখানকার সিয়ামের সাথে এক দিন কমবেশ দেখতে পান। এ বিষয়ে ইবনু আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, তোমরা ওখানে কবে চাঁদ দেখেছিলে? আমি বললাম, শুক্রবার সন্ধ্যায়। তিনি বললেন, আমরা এখানে শনিবারে সন্ধ্যায় চাঁদ দেখেছি। অতএব এখানে আমরা সিয়াম চালিয়ে যাব, যতক্ষণ না ঈদের চাঁদ দেখতে পাব। অন্য বর্ণনায় এসেছে, আমরা ৩০ দিন পূর্ণ করব। তাঁকে বলা হলো, মুআবিয়ার চাঁদ দেখা ও সিয়াম রাখা কি আপনার জন্য যথেষ্ট নয়? তিনি বললেন, না। এভাবেই রাসূল (ﷺ) আমাদেরকে নির্দেশ দান করেছেন।’(সহীহ মুসলিম হা/১০৮৭)। এই হাদীসের ব্যখ্যায় শাফিঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন, এ হাদীস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, এক শহরের চন্দ্র দর্শন অন্য শহরে প্রযোজ্য নয় অধিক দূরত্বের কারণে। (মির‘আত হা/১৯৮৯-এর ব্যাখ্যা ৬/৪২৮ পৃঃ)
.
উল্লেখ্য যে, সিরিয়া মদীনা থেকে উত্তর-পশ্চিমে এক মাসের পথ এবং প্রায় ৭০০ মাইল দূরত্বে অবস্থিত। সময়ের পার্থক্য মদীনা থেকে ১৪ মিনিট ৪০ সেকেন্ড পরে। চন্দ্র পশ্চিম দিক থেকে আগে উঠে বিধায় সেখানে মদীনার একদিন পূর্বে চাঁদ দেখা গিয়েছিল। মিশকাতের ভাষ্যকার ওবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী বলেন, ‘আধুনিক হিসাব মতে পশ্চিম অঞ্চলে চাঁদ দেখা গেলে পশ্চিমাঞ্চলসহ সেখান থেকে অন্যূন ৫৬০ মাইল দূরত্বে পূর্বাঞ্চলের অধিবাসীদের জন্য ঐ চাঁদ গণ্য হবে। আর যদি পূর্বাঞ্চলে চাঁদ দেখা যায়, তাহলে পশ্চিমাঞ্চলের অনুরূপ দূরত্বের অধিবাসীদের জন্য উক্ত চাঁদ গণ্য হবে।’(মির‘আত ৬/৪২৯)। জ্যোতির্বিজ্ঞানের উক্ত হিসাব মতে, মক্কায় চাঁদ দেখা গেলে আশপাশের ৫৬০ মাইল পর্যন্ত উক্ত চাঁদ দেখতে পাওয়া সম্ভব। অতএব, উক্ত দূরত্বের অধিবাসীগণ উক্ত চাঁদের হিসাবে সিয়াম ও ঈদ পালন করতে পারেন, সারা পৃথিবীর মানুষ নয়। দু’জন মুসলিমের সাক্ষ্য ঐ অঞ্চলের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, যে অঞ্চলে একই দিনে চাঁদ দেখা সম্ভব। যারা উক্ত সহীহ আসারকে উপেক্ষা করে দু’জন মুসলিমের সাক্ষীকে দুনিয়ার সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য মনে করেন, তাদের উদ্দেশ্যে বলব, সঊদী আরবের পশ্চিমেও তো অনেক দেশ রয়েছে, যে দেশগুলোতে সৌদি আরবের পূর্বে চাঁদ দেখা যায়। যেমন গত ২০১৩ সালে উত্তর আমেরিকাতে ৮ জুলাই দিবাগত রাতে চাঁদ দেখা গেছে এবং ৯ জুলাই (মঙ্গলবার) প্রথম সিয়াম পালিত হয়েছে। তাহলে সৌদি আরবকে কেন আপনারা মানদন্ড হিসাবে গণ্য করছেন? চাঁদ তো পশ্চিমে সর্বপ্রথম উদিত হয় আমেরিকা মহাদেশে? আপনাদের এই দ্বিমুখী নীতিই কি আপনাদের দাবীর অসারতা প্রমাণে যথেষ্ট নয়? (নোট: আত-তাহরীক প্রশ্নোত্তর জানুয়ারী ২০০৫ প্রশ্ন নং ১/১২১; আগষ্ট ২০১১ প্রশ্ন নং ৩৩/৪৩৩; আগস্ট ২০১৩)
.
সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] কে প্রশ্ন করা হয়; মুসলিম জাতির একতার লক্ষ্যে কেউ কেউ চাঁদ দেখার বিষয়টিকে মক্কার সাথে সংশ্লিষ্ট করতে চায়। তারা বলে মক্কায় যখন রামাযান মাস শুরু হবে তখন বিশ্বের সবাই সাওম রাখবে। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী? উত্তরে শাইখ বলেন- বিষয়টি মহাকাশ গবেষণার দিক থেকে অসম্ভব। ইমাম ইবন তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) এর মতে, চন্দ্র উদয়ের স্থান বিভিন্ন হয়ে থাকে। এ বিষয়ে অভিজ্ঞ বিদ্বানগণ ঐকমত্য। আর এ বিভিন্নতার দাবী হচ্ছে প্রত্যেক এলাকায় ভিন্ন রকম বিধান হবে। একথার স্বপক্ষে দলীল কুরআন-হাদীস ও সাধারণ যুক্তি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ ٱلشَّهۡرَ فَلۡيَصُمۡهُۖ “অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাসে উপস্থিত হবে, সে যেন সিয়াম পালন করে।”(সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৫)। যদি পৃথিবীর শেষ সীমান্তের লোকেরা এ মাসে উপস্থিত না হয় অর্থাৎ চাঁদ না দেখে আর মক্কার লোকেরা চাঁদ দেখে, তবে কীভাবে এ আয়াত তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে যারা কিনা চাঁদই দেখে নি। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, صُومُوا لِرُؤْيَتِهِ وَأَفْطِرُوا لِرُؤْيَتِهِ “তোমরা চাঁদ দেখে সাওম রাখ, চাঁদ দেখে সাওম ভঙ্গ কর। (সহীহ বুখারী হা/১৯০৯ ও সহীহ মুসলিম হা/১০৮১)। মক্কার অধিবাসীগণ যদি চাঁদ দেখে তবে পাকিস্তান এবং তার পূর্ববর্তী এলাকার অধিবাসীদের কীভাবে আমরা বাধ্য করতে পারি যে তারাও সিয়াম পালন করবে? অথচ আমরা জানি যে, তাদের আকাশে চাঁদ দেখা যায় নি। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিয়ামের বিষয়টি চাঁদের সাথে সংশ্লিষ্ট করে দিয়েছেন। যুক্তিগত দলীল হচ্ছে, বিশুদ্ধ ক্বিয়াস; যার বিরোধিতা করার অবকাশ নেই। আমরা ভালোভাবে অবগত যে, পশ্চিম এলাকার অধিবাসীদের আগেই পূর্ব এলাকার অধিবাসীদের নিকট ফজর উদিত হয়। এখন পূর্ব এলাকায় ফজর উদিত হলে কি আমরা পশ্চিম এলাকার লোকদের বাধ্য করব একই সাথে খানা-পিনা থেকে বিরত হতে? অথচ তাদের ওখানে এখনও রাতের অনেক অংশ বাকী আছে? উত্তর: কখনই না। সূর্য যখন পূর্ব এলাকার অধিবাসীদের আকাশে অস্তমিত হয়, তখন পশ্চিম এলাকার দিগন্তে তো সূর্য দেখাই যাচ্ছে তাদেরকে কি আমরা ইফতার করতে বাধ্য করব? উত্তর: অবশ্যই না। অতএব, চন্দ্রও সম্পূর্ণরূপে সূর্যের মতই। চন্দ্রের হিসাব মাসের সাথে সংশ্লিষ্ট। আর সূর্যের হিসাব দিনের সাথে সংশ্লিষ্ট। আল্লাহ বলেছেন,সিয়ামের রাতে স্ত্রীর সাথে সহবাস করা তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে; তারা তোমাদের জন্য আবরণ এবং তোমরা তাদের জন্য আবরণ। তোমরা যে নিজেদের খিয়ানত করছিলে, আল্লাহ তা পরিজ্ঞাত আছেন। এ জন্যে তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করলেন এবং তোমাদের (ভার) লাঘব করে দিলেন। অতএব, এক্ষণে তোমরা (সিয়ামের রাত্রে ও) তাদের সাথে সহবাসে লিপ্ত হতে পার এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা লিপিবদ্ধ করেছেন তা অনুসন্ধান কর এবং প্রত্যুষে (রাতের) কালো রেখা হতে (ফজরের) সাদা রেখা প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত তোমরা খাও ও পান কর; অতঃপর রাত্রি সমাগম পর্যন্ত তোমরা সাওম পূর্ণ কর। তোমরা মসজিদে ই‘তিকাফ করার সময় (স্ত্রীদের) সাথে সহবাস করবে না; এটাই আল্লাহর সীমা। অতএব, তোমরা তার নিকটেও যাবে না। এভাবে আল্লাহ মানবজাতির জন্য নিজের আয়াতসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তারা মুত্তাকী হতে পারে (সূরা আল-বাকারাহ ২/ ১৮৭)। সেই আল্লাহই বলেন, فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمْ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ “অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাসে উপস্থিত হবে, সে যেন সিয়াম পালন করে।” অতএব, যুক্তি ও দলীলের নিরীখে সিয়াম ও ইফতারের ক্ষেত্রে প্রত্যেক স্থানের জন্য আলাদা বিধান হবে। যার সম্পর্ক হবে বাহ্যিক আলামত বা চিহ্ন দ্বারা যা আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সুন্নাতে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আর তা হচ্ছে চাঁদ প্রত্যক্ষ করা এবং সূর্য বা ফজর প্রত্যক্ষ করা। (ফাতাওয়া আরকানিল ইসলাম, মাসআলা নং ৩৯৩ পৃঃ ৪৫১)
.
পরিশেষে পাঠকদের উদ্দেশ্য বলবো, শরীয়তের দলিল-প্রমাণের প্রত্যক্ষ নির্দেশনা হচ্ছে— প্রত্যেক ব্যক্তি যে দেশে অবস্থান করছেন সে দেশের স্থানীয়দের সাথে সিয়াম রাখা তার উপর আবশ্যক। কারণ,রাসূল (ﷺ) বলেছেন, “সিয়াম হচ্ছে যে দিন তোমরা সিয়াম রাখ; ঈদুল ফিতর হচ্ছে যে দিন তোমরা রোযা ভঙ্গ কর এবং ঈদুল আযহা হচ্ছে যে দিন তোমরা কোরবানী কর।”(তিরমিযি হা/৬৯৭, ৮০২, সুনানে দারাকুতনী হা/২১৬০, ২১৬১, ২৪২৪, শারহুস সুন্নাহ ১৭২৫, ১৭২৬, মু’জামুল আওসাত ৩৩১৫)। এবং যেহেতু শরীয়ত থেকে একতাবদ্ধ থাকার নির্দেশ এবং বিচ্ছিন্ন হওয়া ও মতভেদ করা থেকে সাবধানকরণ জানা যায়। তাই বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি না করে নিজ নিজ দেশের নির্ধারিত দিনেই সিয়াম এবং ঈদ পালন করতে হবে; এটাই কুরআন-সুন্নাহর দাবী।আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক বিষয়টি অনুধাবন করার তাওফীক দান করুন। আমীন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Share: