একজন মুমিনের মৃত্যুর পূর্ব সময় থেকে শুরু করে কবরস্থ করার পর পর্যন্ত কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে করনীয় ও বর্জনীয় প্রথম পর্ব

সবকিছু অনিশ্চিত হলেও আপনার মৃত্যু সুনিশ্চিত।
▬▬▬▬▬▬▬💠💠💠▬▬▬▬▬▬▬
প্রত্যেক জীবকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। জন্ম ও মৃত্যু একটি অন্যটির সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। দু’টির কোনটির ক্ষমতা মানুষের হাতে নেই। আল্লাহর হুকুমেই জন্ম হয়। আল্লাহর হুকুমেই মৃত্যু হয়। কখন হবে, কোথায় হবে, কিভাবে হবে, তা কারো জানা নেই। জীবনের সুইচ তাঁরই হাতে, যিনি জীবন দান করেছেন। অতঃপর জীবনদাতার সামনে হাযিরা দিয়ে জীবনের পূর্ণ হিসাব পেশ করতে হবে। হিসাব শেষে জান্নাত বা জাহান্নাম নির্ধারিত হবে ও সেখানেই চিরকাল শান্তিতে বাস করবে অথবা শাস্তি ভোগ করবে।আল্লাহ তার প্রিয় রাসূলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আমরা তোমার পূর্বেও কোন মানুষকে অনন্ত জীবন দান করিনি। অতএব তোমার মৃত্যু হ’লে তারা কি চিরঞ্জীব হয়ে থাকবে? জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর আমরা তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি এবং আমাদের কাছেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।’ (সূরা আম্বিয়া ২১/৩৪-৩৫)।
.
তিনি আরো বলেন, ‘যে মৃত্যু হ’তে তোমরা পলায়ন করছ তা অবশ্যই তোমাদের সাথে সাক্ষাৎ করবে। তারপর তোমাদেরকে অদৃশ্য ও দৃশ্য সম্পর্কে পরিজ্ঞাত আল্লাহর কাছে ফিরিয়ে নেয়া হবে।’ (সূরা জুমু‘আ ৬২/৮)। সুতরাং সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান করলেও মৃত্যু কাউকে ছাড় দিবে না।’ (সূরা নিসা ৪/৭৮)।
.
আল্লাহ আরো বলেন,প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে এবং ক্বিয়ামতের দিন তোমরা পূর্ণ বদলা প্রাপ্ত হবে। অতঃপর যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে ও জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে ব্যক্তি সফলকাম হবে। বস্ত্ততঃ পার্থিব জীবন প্রতারণার বস্ত্ত ছাড়া কিছুই নয়।’ (সূরা আলে ইমরান ৩/১৮৫)।
.
আল্লাহর হুকুম ছাড়া কেউ মরতে পারে না। সেজন্য একটা নির্ধারিত সময় রয়েছে…’ (আলে ইমরান ৩/১৪৫)।আর কেউ জানে না আগামীকাল সে কি উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন মাটিতে তার মৃত্যু হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে সম্যক অবহিত।’ (সূরা লোকমান ৩১/৩৪)
.
সাহল বিন সা‘দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, জিব্রীল আঃ এসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বললেন, হে মুহাম্মাদ! যতদিন খুশী জীবন যাপন কর। কিন্তু মনে রেখ তুমি মৃত্যুবরণ করবে। যার সাথে খুশী বন্ধুত্ব কর। কিন্তু মনে রেখ তুমি তাকে ছেড়ে যাবে। যা খুশী তুমি আমল কর। কিন্তু মনে রেখ তুমি তার ফলাফল পাবে। জেনে রেখ, মুমিনের মর্যাদা হ’ল ইবাদতে রাত্রি জাগরণে এবং তার সম্মান হ’ল মানুষের মুখাপেক্ষী না হওয়ার মধ্যে’।(হাকেম হা/৭৯২১; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৮৩১)
.
রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, মৃত্যু সত্য, জান্নাত ও জাহান্নাম সত্য।’ (বুখারী ১১২০, ৭৪৪২, মুসলিম ৭৬৯ মিশকাত হা/১২১১)।
.
নবী-রাসূল ও রাজা-বাদশাহ সকলকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। মৃত্যু থেকে কেউ রেহাই পাবে না। মৃত্যুশয্যায় শায়িত এই উম্মতের শ্রেষ্ঠ সাহাবী আবুবকর (রাঃ)-কে দেখতে আসা ছাহাবীগণ বললেন, আমরা কি আপনার জন্য ডাক্তার আনব না? জওয়াবে তিনি বললেন, তিনি আমাকে দেখেছেন। ছাহাবীগণ বললেন, তিনি আপনাকে কি বলেছেন? জবাবে আবুবকর ছিদ্দীক (রাঃ) বললেন, তিনি (আল্লাহ) বলেছেন যে, আমি যা চাই তাই করি’ (কুরতুবী, ইবনু কাছীর)। এই মৃত্যু সম্পর্কেই নিম্নের হাদীছ-ইবনু শামাসা আল-মাহরী (রহঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা একদা আমর ইবনুল আছ (রাঃ)-এর মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে দেখতে গেলাম। তখন তিনি অনেকক্ষণ যাবত কাঁদলেন এবং মুখমন্ডল দেয়ালের দিকে ফিরিয়ে নিলেন। তাঁর পুত্র তাঁকে রাসূল (ছাঃ) প্রদত্ত বিভিন্ন সুসংবাদের উল্লেখ পূর্বক সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, আব্বা! রাসূল (ছাঃ) কি আপনাকে অমুক সুসংবাদ দেননি? রাসূল (ছাঃ) কি আপনাকে অমুক সুসংবাদ দেননি? রাবী বলেন, তখন তিনি পুত্রের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, আমার সর্বোৎকৃষ্ট পাথেয় হচ্ছে ‘লা ইলাহা ইল্লালাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’ এ কালিমার সাক্ষ্য দেয়া। আর আমি অতিক্রম করেছি আমার জীবনের তিনটি পর্যায়। এক সময় তো আমি এমন ছিলাম যে, রাসূল (ছাঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণে আমার চেয়ে কঠোরতর আর কেউই ছিল না। আমি যদি রাসূল (ছাঃ)-কে কবযায় পেতাম তাকে হত্যা করতাম, এ ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় ভাবনা। যদি সে অবস্থায় আমার মৃত্যু হ’ত, তবে নিশ্চিত আমাকে জাহান্নামে যেতে হ’ত। এরপর আল্লাহ যখন আমার অন্তরে ইসলামের অনুরাগ সৃষ্টি করে দিলেন, তখন আমি রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে উপস্থিত হয়ে অনুরোধ জানালাম যে, আপনার ডান হাত বাড়িয়ে দিন, আমি বায়‘আত করতে চাই। রাসূল (ছাঃ) তাঁর ডান হাত বাড়িয়ে দিলেন, তখন আমি আমার হাত টেনে নিলাম। রাসূল (ছাঃ)-বললেন, আমর! কি ব্যাপার? আমি বললাম, পূর্বেই আমি শর্ত করে নিতে চাই। রাসূল (ছাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, কি শর্ত করবে? আমি উত্তরে বললাম, আল্লাহ যেন আমার সব গোনাহ মাফ করে দেন। রাসূল (ছাঃ) বললেন, আমর! তুমি কি জানো না যে, ইসলাম পূর্বের সকল পাপ মিটিয়ে দেয়। হিজরত পূর্বেকৃত গোনাহসমূহ মিটিয়ে দেয় এবং হজ্জও পূর্বের সকল গোনাহ মিটিয়ে দেয়। আমর (রাঃ) বলেন, এ পর্যায়ে আমার অন্তরে রাসূল (ছাঃ) অপেক্ষা অধিক প্রিয় আর কেউ ছিল না। আমার চোখে তিনি অপেক্ষা মহান আর কেউ ছিল না। অপরিসীম শ্রদ্ধার কারণে আমি তার প্রতি চোখ ভরে তাকাতেও পারতাম না। আজ যদি আমাকে তাঁর দেহ আকৃতির বর্ণনা করতে বলা হয়, তবে আমার পক্ষে তা সম্ভব হয়ে উঠবে না। কারণ চোখভরে আমি কখনোই তাঁর প্রতি তাকাতে পারিনি। ঐ অবস্থায় যদি আমার মৃত্যু হ’ত তবে অবশ্যই আমি জান্নাতী হওয়ার আশাবাদী থাকতাম। পরবর্তীকালে আমরা নানা বিষয়ের সাথে জড়িয়ে পড়েছি, তাই জানি না, এতে আমার অবস্থান কোথায়? সুতরাং আমি যখন মারা যাব, তখন যেন কোন বিলাপকারীরা অথবা আগুন যেন আমার জানাযার সাথে না থাকে। আমাকে যখন দাফন করবে তখন আমার উপর আস্তে আস্তে মাটি ফেলবে এবং দাফন সেরে একটি উট যবাই করে তার গোশত বণ্টন করতে যে সময় লাগে, ততক্ষণ আমার কবরের পাশে অবস্থান করবে। যেন তোমাদের উপস্থিতির কারণে আমি আতঙ্কমুক্ত অবস্থায় চিন্তা করতে পারি যে, আমার প্রতিপালকের দূতের কি জবাব দেব।’ (মুসলিম হা/১২১; ছহীহ আত-তারগীব হা/১০৯৭; মিশকাত হা/২৮)।
◾মৃত্যু সম্পর্কে জ্ঞানী মানুষদের কিছু উক্তি :
_______________________________________
▪️(১).উসমান (রাঃ) যখন কোন কবরের পাশে দাঁড়াতেন তখন এত কাঁদা কঁদতেন যে, চোখের পানিতে তাঁর দাড়ি ভিজে যেত। কেউ তাকে বলল, ‘জান্নাত ও জাহান্নামের আলোচনাকালে আপনি তো কাঁদেন না, আর এই কবর দেখে এত কঁদছেন? উত্তরে তিনি বললেন, যেহেতু আল্লাহর রসূল (ﷺ) বলেছেন, “পরকালের (পথের) মঞ্জিলসমুহের প্রথম মঞ্জিল হল কবর। সুতরাং যে ব্যক্তি এ মঞ্জিলে নিরাপত্তা লাভ করে তার জন্য পরবর্তী মঞ্জিলসমূহ অপেক্ষাকৃত সহজ হয়ে যায়। আর যদি সে এখানে নিরাপত্তা লাভ না করতে পারে তবে তার পরবর্তী মঞ্জিলগুলো আরো কঠিনতর হয়।” আর তিনি একথাও বলেছেন যে, “আমি যত দৃশ্যই দেখেছি, সে সবের চেয়ে অধিক বিভীষিকাময় হল কবর!” (সহীহ তিরমিযী ১৮৭৮, ইবনে মাজাহ ৪২৬৭)
.
▪️(২).ক্বায়েস বিন আবু হাযেম (মৃ. ৯৩ হি.) বনু উমাইয়াদের একজন খলীফার দরবারে গেলে তিনি বলেন, হে আবু হাযেম! আমাদের কি হ’ল যে আমরা মৃত্যুকে অপছন্দ করছি? জওয়াবে তিনি বলেন, এটা এজন্য যে, আপনারা আপনাদের আখেরাতকে নষ্ট করেছেন ও দুনিয়াকে আবাদ করেছেন। সেকারণে আপনারা আবাদী স্থান থেকে অনাবাদী স্থানে যেতে চান না’।(ইবনু ‘আসাকির, তারীখু দিমাশ্ক্ব ২২/৩০।)
.
▪️(৩).হাসান বাছরী (২১-১১০ হি.) বলেন, হে আদম সন্তান! মুমিন ব্যক্তি সর্বদা ভীত অবস্থায় সকাল করে, যদিও সে সৎকর্মশীল হয়। কেননা সে সর্বদা দু’টি ভয়ের মধ্যে থাকে। (ক) বিগত পাপ সমূহের ব্যাপারে। সে জানেনা আল্লাহ সেগুলির বিষয়ে কি করবেন। (খ) মৃত্যুর ভয়, যা এখনো সামনে আছে। সে জানেনা আল্লাহ তাকে তখন কোন পরীক্ষায় ফেলবেন। অতএব আল্লাহ রহম করুন ঐ ব্যক্তির উপরে, যে এগুলি বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে ও জ্ঞান হাছিল করে। দূরদর্শিতা লাভ করে এবং নিজেকে প্রবৃত্তি পরায়ণতা থেকে বিরত রাখে’।(ইবনুল জাওযী, আদাবুল হাসান বাছরী, ১২৩ পৃ.)
.
তিনি বলতেন, দুনিয়া তিনদিনের জন্য। গতকাল, যে তার আমল নিয়ে চলে গেছে। আগামীকাল, সেটা তুমি নাও পেতে পার। আজকের দিন, এটি তোমার জন্য। অতএব তুমি এর মধ্যে আমল কর’ (পৃ. ৩৩)।[ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আয-যুহদ, ১৯৭ পৃ.)
.
▪️(৪).ছাহাবী আবুদ্দারদা (রাঃ) বলেন, তিনজন লোককে দেখলে আমার হাসি পায়। (ক) দুনিয়ার আকাংখী। অথচ মৃত্যু তাকে খুঁজছে (খ) উদাসীন ব্যক্তি। অথচ আল্লাহ তার থেকে উদাসীন নন (গ) গাল ভরে হাস্যকারী ব্যক্তি। অথচ সে জানেনা আল্লাহ তার উপর খুশী না নাখোশ’ (পৃ. ২২)।(ইবনুল মুবারক, আয-যুহুদ (বৈরূত) ৮৪ পৃ.)
.
▪️(৫).আবু সুলায়মান দারানী (মৃ. ২১৫ হি.) স্বীয় উস্তায উম্মে হারূণকে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কেমন আছেন? উত্তরে তিনি বলেন, ঐ ব্যক্তি কেমন থাকবে যার রূহ অন্যের হাতে’? (উক্তি ৪৫, পৃ. ৩৭)।(ইবনু ‘আসাকির, তারীখু দিমাশ্ক্ব ৭০/২৬৬)
.
▪️(৬).আব্দুল্লাহ (মৃ. ৯৫ হি.) বলেন, মৃত্যু স্বচ্ছল ব্যক্তির সুখ-সম্ভারকে কালিমালিপ্ত করে দেয়। অতএব তুমি এমন সুখের সন্ধান কর, যেখানে কোন মৃত্যু নেই’।[এহইয়াউ উলূমিদ্দীন ৭/১৩৯)
.
▪️(৭) ইব্রাহীম তায়মী (মৃ. ১২০ হি.) বলেন, দু’টি বস্ত্ত আমার দুনিয়ার স্বাদ বিনষ্ট করেছে। মৃত্যুর স্মরণ ও আল্লাহর সম্মুখে দন্ডায়মান হওয়ার ভয়’।(এহইয়াউ উলূমিদ্দীন ৭/১৩৮)
▪️(৮) কা‘ব বলতেন, যে ব্যক্তি মৃত্যুকে উপলব্ধি করে, দুনিয়ার বিপদাপদ ও দুশ্চিন্তা সমূহ তার নিকট হীন বস্ত্ত হয়ে যায়’।(এহইয়াউ উলূমিদ্দীন ৭/১৩৯)
পরিশেষে, জ্ঞানী মাত্রই বিপদ স্মরণ করে তার হাত থেকে মুক্তির উপায় ও অস্ত্র সংগ্রহ করতে উঠে পড়ে লাগে। পক্ষান্তরে উদাসীন খালি হাতে থেকে বিপদের পঞ্জায় নিজেকে সঁপে দেয়।। প্রিয় নবী (ﷺ) বলেন, সর্বসুখ-বিনাশী মৃত্যুকে তোমরা অধিকাধিক স্মরণ কর। কারণ, যে ব্যক্তি কোন সঙ্কটে তা স্মরণ করবে সে ব্যক্তির জন্য সে সঙ্কট সহজ হয়ে যাবে এবং যে ব্যক্তি তা কোন সুখের সময়ে স্মরণ করবে সে ব্যক্তির জন্য সুখ তিক্ত হয়ে উঠবে।” (বাইহাকী,সহীহুল জামে ১২১০- ১২১১)
মৃত্যুর ভয় মানুষকে সকল অন্যায় থেকে বাঁচাতে পারে। এজন্য আমাদেরকে বেশী বেশী মৃত্যুকে ভয় করতে হবে। আল্লাহ আমাদের মৃত্যুর ভয়ে সকল পাপ থেকে রক্ষা করুন-আমীন! (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)
_____________________________
উপস্থাপনায়,
জুয়েল মাহমুদ সালাফি
Share On Social Media